Posts

গল্প

চোর ( ছোট গল্প )

June 30, 2026

মোঃ বজলুর রশীদ

Original Author মোঃ বজলুর রশীদ

9
View

চোর 
মো : বজলুর রশীদ

……………………………………………………..

উঠোনে উপচে পড়া ভিড়। গ্রামের মানুষের স্বভাব হচ্ছে তারা যেকোনো হট্টগোলে চরম আনন্দ পায়। চোর ধরা পড়ার আনন্দ তো আরও বেশি। জ্যৈষ্ঠ মাসের কড়া রোদ, তার ওপর সবার হট্টগোলের চিৎকার।
চেয়ারম্যান মোতাহার আলী বারান্দার আরামদায়ক চেয়ারে বসে আছেন।বিশ্বস্ত কাজের লোকটা একনাগাড়ে তালপাতার পাখা ঘুরিয়ে চলেছে ।

তিনি মৃদু বাতাসে নিজেকে জুড়াচ্ছেন আর গম্ভীর মুখে তামাক টানছেন। অপরাধীর দিকে তিনি সরাসরি তাকাচ্ছেন না। কারণ তাঁর মতে, অপরাধীকে পাত্তা না দিয়ে উপেক্ষা করলে সে ভেতরে ভেতরে ভয় পাবে। চোখের দিকে না তাকিয়েও যে তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় সেই চেষ্টা করছেন।
 

অপরাধী অর্থাৎ আলতাব মিয়া উঠোনের মাঝখানে রোদ্রে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। তার গায়ের মলিন ফতুয়াটা ঘামে ভিজে গেছে । তার চেয়েও বড় অপরাধী যেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বারো বছরের মেয়ে আলেয়া। সে বাবার লুঙ্গি শক্ত করে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আলেয়া এই অঞ্চলের মধ্যে এক আশ্চর্য মেয়ে।কঠিন অঙ্কের সমাধান সে মুহূর্তের মধ্যে করে ফেলে।

স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব সেদিনও বলেছেন, আলতাব, তোমার ঘরে জহরত জন্মেছে। এই মেয়ে একদিন দেশের নাম উজ্জ্বল করবে।
সেই জহরতের বাবা আজ চোর। অপরাধ সামান্য একটা তরমুজ চুরি।

মোতাহার আলী তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, হুম। তা আলতাব, চুরিটা করলে কেন?

রমজান মিয়ার ক্ষেতের তরমুজ তো এমনিতেই ছোট। চুরির সাইজটাও তো বড় না।
ভিড়ের মধ্য থেকে একজন রসিক মানুষ বলে উঠল, "সাইজ ছোট হইলেও জিনিস লাল টকটকা চেয়ারম্যান সাহেব! খাইতে মধুর।

চারপাশে একটা হাসির রোল উঠল। মোতাহার আলী হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। তারপর আলতাবের দিকে তাকিয়ে বললেন, কী হে আলতাব, কথা বলো না কেন? বোবা হয়ে গেলে?
আলতাব মিয়া কোনোমতে বলল, "চেয়ারম্যান সাহেব, আমার মেয়েটা... আলেয়া... কয়দিন ধইরা একটা তরমুজ খাইতে চাইছিল। জ্বরের ঘোরে খালি তরমুজের কথা কয়। ট্যাকা আছিল না। আমি লোভ সামলাইতে পারি নাই।

লোভ সামলানোই তো ধর্মের মূল কথা রে ব্যাটা! মোতাহার আলী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর নিজের গুদামে এই মুহূর্তে সরকারের দেওয়া ত্রাণের একশো বস্তা চাল লুকিয়ে রাখা আছে, যা তিনি আগামী সপ্তাহে কালোবাজারে বিক্রি করবেন। গত মাসে কালভার্ট তৈরির বাজেট থেকে তিনি একাই পঁচাত্তর পার্সেন্ট পকেটে পুরেছেন। কিন্তু সেইসব বড় বড় চুরির কোনো সাক্ষী থাকে না, কোনো শোরগোল হয় না।


চেয়ারম্যান সাহেব তাঁর চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে এনে বললেন, "চুরি তো চুরিই। সমাজে একটা শাসন থাকা দরকার। শাসন না থাকলে মানুষ পশূ হয়ে যায়। আলতাবকে একটা উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া দরকার। মেম্বার সাহেব, কী দেওয়া যায়?

মেম্বার মোড়ল টাইপের লোক, সে উৎসাহী হয়ে বলল, "পাঁচ ঘা জুতার বাড়ি দিলে কেমন হয়?
"না না," মোতাহার আলী মাথা নাড়লেন, "শারীরিক নির্যাতন আমি পছন্দ করি না। আমরা সভ্য মানুষ। তার চেয়ে বরং... ওর গলায় জুতার মালা পরাও। পুরা গ্রাম ঘুরায়ে নিয়ে আসো। মানুষ দেখুক, চোরের শাস্তি কী।

না! আমার বাবাকে জুতার মালা দিয়েন না! আল্লাহর দোহাই লাগে!আলেয়া চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সে তার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে চেয়ারম্যানের পা জড়িয়ে ধরলো, কিন্তু চৌকিদার তাকে টেনে সরিয়ে দিল।

আলতাব মিয়া মেয়ের দিকে তাকাল। তার নিজের চোখের পানি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে শুধু আস্তে করে বলল, আলেয়া মা, তুই বাড়ি যা। তুই এইখানে থাকিস না।

দুপুরের চড়া রোদে আলতাব মিয়ার গলায় ছেঁড়া স্যান্ডেল আর চামড়ার জুতোর একটা ভারী মালা ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। রোদ লেগে জুতো থেকে একটা কটু গন্ধ বেরোচ্ছে। চৌকিদার কুদ্দুস আলী একটা টিনের কৌটো লাঠি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে আগে আগে যাচ্ছে টিন টিন টিন!

আর পেছন পেছন একদল ছোট ছেলেমেয়ে হাততালি দিয়ে চিৎকার করছে, তরমুজ চোর! তরমুজ চোর!

আলতাব মিয়া মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। তার মনে হচ্ছে সে মাটি ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে না কেন? পৃথিবীটা এত শক্ত কেন?

আলেয়া বাবার সাথে সাথে হাঁটছিল না। সে দূর থেকে, একটা বড় মেহগনি গাছের আড়াল থেকে দেখছিল।

তার হাতে একটা খাতা আর একটা কলম ।সে অঙ্কের খাতার একটা পাতায় শক্ত করে কলম দিয়ে আঁকিবুঁকি করছিল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে, ক্ষোভে একদম নীল হয়ে গেছে।
তার বাবা চোর নয়। তার বাবা তাকে ভালোবাসে, তাই তরমুজ এনেছিল।

সে চোখ তুলে তাকাল দূরের ইউনিয়ন পরিষদের দালানটার দিকে ,যেখানে চেয়ারম্যান মোতাহার আলী বসে আছেন। গ্রামের সবাই জানে ত্রাণের চাল কোথায় যায়, কালভার্টের টাকা কার পকেটে ঢোকে। কিন্তু সেই হিসাব নেওয়ার মতো কেউ নেই। বড় চোরের মাথায় থাকে সম্মানের ছাতা, 
ছোট্ট চোরের গলায় জোটে জুতার মালা।
 

Comments

    Please login to post comment. Login