বৃষ্টিভেজা রাত
-বেলাল উদ্দিন
রাত তখন এগারোটা। ঢাকার আকাশ ভেঙে নেমেছে মুষলধারে বৃষ্টি। জানালার গ্রিল গলে ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে কয়েক ফোঁটা জল এসে পড়ছিল অয়নের মুখে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা কোডিংয়ের ফাইল খোলা, কিন্তু অয়নের মন সেখানে নেই। সে তাকিয়ে আছে বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে, যেখানে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় বৃষ্টির ধারাগুলোকে রুপোলী সুতোর মতো দেখাচ্ছে।
অয়ন এক কাপ গরম চা হাতে নিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। চায়ের ধোঁয়া আর জানালার বাইরের মেঘলা হাওয়া মিলে এক অদ্ভুত মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছে। ঠিক তখনই তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো নাম নেই, শুধু একটা অচেনা নম্বর।
অয়ন কলটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত কণ্ঠস্বর, অথচ যা শোনার জন্য সে গত তিনটি বছর ধরে অপেক্ষা করছিল।
"এখনও কি বৃষ্টি হলে তুমি বারান্দায় এসে দাঁড়াও, অয়ন?"
অয়নের হাত থেকে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল। কিছুটা চা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ওপাশের কণ্ঠটি নীলিমার। তিন বছর আগে কোনো এক ঝড়ের রাতে যে অয়নকে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না জানিয়েই বিদায় নিয়েছিল।
"নীলিমা? তুমি..." অয়নের গলা ধরে এলো।
"হ্যাঁ আমি। জানি খুব অন্যায় করেছি এভাবে ফোন করে। কিন্তু আজকের এই বৃষ্টি ভেজা রাতটা আমাকে কিছুতেই ঘুমাতে দিল না। ভীষণ একা লাগছে, অয়ন," নীলিমার কণ্ঠে এক অদ্ভুত একাকীত্ব আর অনুশোচনার সুর।
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাইরের বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। বজ্রপাতের শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠছে বারবার। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "এতগুলো বছর কোথায় ছিলে? একটা বারও মনে পড়েনি?"
"পড়েছে। প্রতিটা মেঘলা দিনে, প্রতিটা বৃষ্টির রাতে মনে পড়েছে। অভিমান করে চলে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু নিজের মনটাকে তো বেঁধে রাখতে পারিনি। আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তুমি কি এখনও আমাকে আগের মতোই ঘৃণা করো?" নীলিমার গলা কাঁপছিল, হয়তো সে কাঁদছে।
অয়ন জানালার কাচে হাত রাখল। কাচটা বাইরের বৃষ্টির ছোঁয়ায় একদম ঠাণ্ডা হয়ে আছে। সে মৃদু হেসে বলল, "ঘৃণা করার মতো শক্তি বোধহয় ভালোবাসায় থাকে না, নীলিমা। থাকলে হয়তো পারতাম। আমি আজও বৃষ্টি নামলে ভাবি, তুমি বুঝি ছাতা না নিয়ে কোথাও ভিজে যাচ্ছো।"
ওপাশ থেকে নীলিমার ফোঁপানির শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল। সে বলল, "আমি এখন তোমার বাড়ির ঠিক নিচের ল্যাম্পপোস্টটার নিচে দাঁড়িয়ে আছি। ছাতা আনিনি। দেখবে এসে?"
অয়ন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে দ্রুত জানালার বাইরে নিচে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের সেই আবছা হলুদ আলোয় সত্যি একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিজে একাকার।
অয়ন আর এক মুহূর্তও ভাবল না। ল্যাপটপ খোলা রেখেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। লিফটের তোয়াক্কা না করে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এলো। মেইন গেট খুলে যখন সে রাস্তায় পা রাখল, বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা তার পুরো শরীরকে ভিজিয়ে দিল নিমেষেই।
ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে নীলিমা কাঁপছিল। অয়ন গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। দুুজনের চোখেই জল, তবে বৃষ্টির তীব্রতায় তা চেনা যাচ্ছিল না।
"তুমি সত্যি এসেছ?" নীলিমা ফিসফিস করে বলল।
"বৃষ্টির রাতে কেউ একা ভিজলে তাকে টেনে নেওয়ার দায়িত্ব তো আমারই ছিল, তাই না?" অয়ন নীলিমার ভেজা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
সেই বৃষ্টি ভেজা রাতে, মেঘের গর্জন আর জলের শব্দের মাঝে দুটো হারিয়ে যাওয়া মন আবার এক হয়ে গেল। তিন বছরের জমে থাকা সব অভিমান আর দূরত্ব ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিল শ্রাবণের সেই অবিরাম ধারা।