Posts

নন ফিকশন

হাজারো মূর্তির মধ্যে কোরআন কেন শুধু এক দেবতার নাম নিল?

July 6, 2026

md jahidul islam

6
View

হাজারো মূর্তির মধ্যে কোরআন কেন শুধু এক দেবতার নাম নিল?

​জাহেলিয়াত আমলের আরবে মূর্তিপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, তা ছিল তাদের সংস্কৃতির এক বিশাল অংশ। কাবা শরিফের ভেতরে ও চারপাশে তখন প্রায় ৩৬০টি মূর্তির পুজো করা হতো। লাত, উজ্জা, মানাত, হুবাল—কত রকমের নাম! কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পবিত্র কোরআনে হাজারো মূর্তির ভিড়ে সুনির্দিষ্ট কিছু দেবতার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি অন্যতম রহস্যময় ও প্রাচীন নাম হলো ‘বাল’ (Baal)

​প্রাচীন আরবের এত এত প্রভাবশালী মূর্তিকে রেখে কোরআন কেন এই নির্দিষ্ট দেবতার নাম নিল? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক রহস্য।

​১. ‘বাল’ দেবতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

​কোরআনের সূরা আস-সাফফাত-এর ১২৫ নম্বর আয়াতে ইলিয়াস (আ.)-এর ঘটনার উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে:

"তোমরা কি 'বাল' (Baal) দেবতার পূজা করছ এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে বর্জন করছ?"


 

​‘বাল’ কোনো সাধারণ স্থানীয় আরব মূর্তি ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন লেভান্ট (বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও জর্ডান অঞ্চল) এবং ফিনিশীয় সভ্যতার প্রধান দেবতা। হিব্রু ও সেমিটিক ভাষায় ‘বাল’ শব্দের অর্থ ‘মালিক’, ‘প্রভু’ বা ‘স্বামী’। ব্রোঞ্জ যুগ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অঞ্চল জুড়ে এই দেবতার উপাসনা করা হতো। তাকে মনে করা হতো বৃষ্টি, ঝড় ও উর্বরতার দেবতা।

​২. কেন এই নির্দিষ্ট দেবতার উল্লেখ?

​প্রাচীন আরবের মক্কার কুরাইশরা মূলত লাত, উজ্জা বা হুবালের উপাসনা করত। তাহলে ইলিয়াস (আ.)-এর কওমের প্রসঙ্গে ‘বাল’ দেবতার নাম কেন কোরআনে এলো?

  • একত্ববাদের চিরন্তন লড়াই: কোরআন কেবল আরবের সমসাময়িক মূর্তিপূজার জবাব দিচ্ছিল না, বরং এটি মানব ইতিহাসের শুরু থেকে চলে আসা শিরকের মনস্তত্ত্বকে উন্মোচন করছিল। বাল দেবতা ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মিথ্যা উপাস্যদের একটি।
  • ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ: আরবের বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চলে যাতায়াত করত। ফলে তারা ‘বাল’ দেবতার ক্ষমতা ও তার পূজারীদের জাঁকজমক সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানত। কোরআন তাদের পরিচিত একটি বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে দেখিয়েছে যে, অতীতেও মানুষ কীভাবে সত্য নবীকে ছেড়ে কাল্পনিক ‘প্রভু’র পেছনে ছুটে ধ্বংস হয়েছিল।
  • ক্ষমতার অপার্থিব মোহ ভাঙা: বাল দেবতাকে মেঘ ও বৃষ্টির নিয়ন্ত্রক মনে করা হতো, যা কৃষিনির্ভর প্রাচীন সমাজের জন্য ছিল জীবন-মরণ সমস্যা। কোরআন এই নামটিকে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বৃষ্টি বা জীবন দেওয়ার মালিক কোনো ‘বাল’ নামক মূর্তি নয়, বরং একমাত্র আল্লাহ।

​৩. মূর্তিপূজার বৈশ্বিক রূপ উন্মোচন

​কোরআন যদি কেবল আরবের স্থানীয় মূর্তির নাম নিত, তবে তা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক বিষয় হয়ে থাকত। কিন্তু ‘বাল’ দেবতার মতো একটি আন্তর্জাতিক ও প্রাচীন মিথলজির উল্লেখ প্রমাণ করে যে, কোরআনের বার্তা সার্বজনীন। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ যেভাবে আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে 'মালিক' বা 'প্রভু'র আসনে অন্য কাউকে বসিয়েছে, কোরআন ঠিক সেই মূল মনস্তত্ত্বে আঘাত করেছে।

আরও পড়ুন: প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের এই রহস্যময় দেবতা ‘বাল’ (Baal) আসলে কে ছিল? আরবের বাইরে ফিনিশীয় ও ক্যানানাইট সভ্যতায় এর প্রভাব কেমন ছিল, তা বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন রহস্যময় বাল দেবতা ও তার ইতিহাস আর্টিকেলটি।


 

​উপসংহার

​হাজারো মূর্তির ভিড়ে কোরআনে ‘বাল’ দেবতার নাম নেওয়া কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এটি ছিল এক মহাসত্যের ঘোষণা—ক্ষমতা, উর্বরতা বা রাজত্বের মালিকানা কোনো মূর্তির হাতে নেই। ইতিহাস সাক্ষী, যে ‘বাল’ দেবতার দাপটে একসময় কাঁপত পুরো লেভান্ট অঞ্চল, আজ তা কেবলই প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। আর কোরআনের এই একটি মাত্র উল্লেখ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের তৈরি করা সমস্ত মিথ্যা ‘প্রভু’ বা ‘বাল’ একসময় ধূলিসাৎ হতে বাধ্য, কেবল টিকে থাকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সত্তা।

Comments

    Please login to post comment. Login