অধ্যায় ১: পুরনো ডায়েরি
ঢাকার আকাশটা সেদিন সকাল থেকেই অস্বাভাবিক রকমের ধূসর ছিল। বর্ষার শেষভাগের মেঘ যেন শহরের ওপর ঝুলে আছে—নামবে কি নামবে না, এমন এক অদ্ভুত দ্বিধায়। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, দূরে কোথাও সাইরেনের শব্দ, আর ব্যস্ত মানুষের ছুটে চলা—সবকিছু মিলিয়ে শহরটা যেন নিজের ভেতরে কোনো গোপন অস্থিরতা লুকিয়ে রেখেছে।
সেই শহরেরই এক কোণে, পুরোনো কিন্তু পরিচ্ছন্ন একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ গেঁথে রেখেছিল আরিব রহমান।
বয়স বত্রিশ। পেশায় অনুসন্ধানী সাংবাদিক। সত্য উদ্ঘাটনের নেশা তার রক্তে মিশে গেছে। ক্ষমতাবানদের হুমকি, রাতভর নজরদারি, গোপন ক্যামেরা—এসব তার কাছে নতুন কিছু নয়।
তার সহকর্মীরা মজা করে বলত—
"আরিব ভাই, আপনি মানুষ না, সমস্যা খুঁজে বের করার মেশিন!"
আরিব শুধু হেসে উত্তর দিত,
— "সমস্যা খুঁজি না... সত্য খুঁজি।"
নিউজরুম
"বাংলা ইনসাইট" পত্রিকার নিউজরুম তখন কর্মচাঞ্চল্যে ভরা।
ফোন বেজে চলেছে। কীবোর্ডের টিকটিক শব্দ। কেউ ভিডিও এডিট করছে। কেউ লাইভ আপডেট লিখছে।
এমন সময় সম্পাদক সাজিদ কবির কাচঘেরা কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন।
— "আরিব, একটু আসবে?"
আরিব ল্যাপটপ বন্ধ করে কেবিনে ঢুকল।
সাজিদ চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।
— "নতুন একটা অ্যাসাইনমেন্ট আছে।"
— "কী নিয়ে?"
— "পুরান ঢাকার একটা বাড়ি।"
— "বাড়ি?"
— "হ্যাঁ। গত বিশ বছরে বাড়িটার চারজন মালিক হয়েছে।"
— "তারপর?"
— "চারজনই মারা গেছে।"
আরিব একটু হেসে বলল,
— "ভূতের গল্প?"
সাজিদ গম্ভীর।
— "আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।"
— "আমিও না।"
— "তাহলে খুঁজে বের করো কেন সবাই মরছে।"
আরিব চুপ করে রইল।
সাজিদ ধীরে বললেন,
— "আরেকটা বিষয় আছে।"
— "কী?"
— "পুলিশও কেসটা বন্ধ করে দিয়েছে।"
— "কারণ?"
— "প্রমাণ নেই।"
আরিবের চোখে সেই পরিচিত আগ্রহ জ্বলে উঠল।
পথে
বিকেল চারটা।
আরিব মোটরবাইক চালিয়ে ঢুকে পড়ল পুরান ঢাকার সরু গলিতে। বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। পুরোনো লাল ইটের বাড়ি। জং ধরা বারান্দা। মসজিদের আজানের ধ্বনি। রাস্তার পাশে চায়ের দোকান। লোকজন ফিসফিস করছে। এক বৃদ্ধ চা খেতে খেতে তাকিয়ে রইলেন। আরিব এগিয়ে গেল।
— "চাচা, এই বাড়িটার কথা জানতে চাই।"
বৃদ্ধ ধীরে কাপ নামালেন।
— "আপনি সাংবাদিক?"
— "জি।"
— "ভিতরে যাবেন না।"
— "কেন?"
বৃদ্ধ কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন,
— "ওই বাড়ি মানুষকে ডাকে।"
আরিব হেসে ফেলল।
— "বাড়ি ডাকতে পারে?"
— "আপনি হাসছেন।"
— "কারণ আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।"
বৃদ্ধ চোখ সরু করলেন।
— "যারা বিশ্বাস করত না... তারা কেউ আর বেঁচে নেই।"
বাতাসটা যেন হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
পুরোনো বাড়ি
বাড়িটার বিশাল লোহার গেট অর্ধেক খোলা। জং ধরা। লতাপাতায় ঢাকা দেয়াল। দোতলার ভাঙা জানালা বাতাসে কাঁপছে। ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধ। মেঝেতে শুকনো পাতা। কোথাও কেউ নেই।
কিন্তু...
মনে হচ্ছে যেন কেউ তাকিয়ে আছে।
আরিব নিজের মোবাইলের ভিডিও রেকর্ডিং চালু করল।
— "লোকেশন—পুরান ঢাকা। সময় বিকেল চারটা বেয়াল্লিশ। বাড়িটি পরিত্যক্ত।"
ঠিক তখনই...
উপরতলা থেকে—
ঠক... ঠক... ঠক...
পায়ের শব্দ।
আরিব থেমে গেল।
— "কে?"
কোনো উত্তর নেই।
আবার—
ঠক... ঠক...
সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। প্রতিটি ধাপে ধুলো। মাকড়সা জাল। ভাঙা কাঠ। হঠাৎ একটা দরজা নিজে থেকেই কঁকিয়ে খুলে গেল।
ঘর
ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল। টেবিলের ওপর ধুলোমাখা কাপড়। এক কোণে কাঠের আলমারি। জানালার কাচ ভাঙা। বাতাস ঢুকছে।
আরিব কাপড়টা সরাতেই...
একটি কালো চামড়ার ডায়েরি। খুব পুরোনো। চামড়া ফেটে গেছে। কোনো নাম নেই। কোনো শিরোনাম নেই।
শুধু সামনে অদ্ভুত একটি প্রতীক—
একটি বৃত্তের ভেতরে উল্টো দিকমুখী তিনটি ত্রিভুজ।
আরিব ফিসফিস করল,
— "অদ্ভুত..."
সে ডায়েরিটি হাতে নিল।
ঠিক তখনই—
বাড়ির নিচতলা থেকে বিকট শব্দ।
ধাম!
মনে হলো যেন প্রধান দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে। আরিব দ্রুত নিচে নেমে এল।
সত্যিই...
লোহার গেট পুরোপুরি বন্ধ। সে ঠেলে দেখল। খুলছে না।
অদ্ভুত ঘটনা
হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। চারপাশে নিস্তব্ধতা। এতটাই নিস্তব্ধ যে নিজের হৃদস্পন্দনও শোনা যাচ্ছে।
তারপর...
খুব ক্ষীণ একটা কণ্ঠস্বর।
মনে হলো কারও ফিসফিসানি।
"খুলে দেখো..."
আরিব ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই।
আবার—
"খুলে... দেখো..."
সে নিজের মনে বলল,
— "এটা হয়তো বাতাসের শব্দ।"
কিন্তু বাতাস তো নেই। তার হাতের তালু ঘেমে উঠল। কিছুক্ষণ পর গেটটি নিজে থেকেই আস্তে আস্তে খুলে গেল। কোনো মানুষ নেই। কেউ ধাক্কাও দেয়নি। আরিব কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দ্রুত বেরিয়ে এল।
রাত
রাত সাড়ে দশটা।
নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসেছে আরিব। এক কাপ কফি বানিয়ে টেবিলে বসেছে। ডায়েরিটা সামনে। সে মোবাইল ক্যামেরা অন করল।
— "প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু করছি।"
ডায়েরির প্রথম পাতা খুলতেই দেখা গেল একটি বাক্য—
"যে এই বই খুলবে, সে আর আগের মানুষ থাকবে না।"
আরিব মৃদু হেসে বলল,
— "নাটকীয়।"
পরের পাতায় লেখা—
তারিখ: ১২ আগস্ট
রাত ৯:১৭ মিনিট
স্থান: লালবাগ।
একজন মানুষ মারা যাবে।
তার গলায় থাকবে গভীর কাটা দাগ।
খুনি পালিয়ে যাবে উত্তর দিকের গলি দিয়ে।
কেউ তাকে থামাতে পারবে না।
আরিব ভ্রু কুঁচকাল।
— "উপন্যাস?"
সে আরও পাতা উল্টাল। সব ফাঁকা। একেবারে সাদা। সে আবার প্রথম লেখাটার দিকে তাকাল। কালিটা যেন একেবারে নতুন। মনে হচ্ছে এইমাত্র লেখা হয়েছে।
ঠিক তখনই...
তার মোবাইল বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
নিশাত কলিং...
নিশাত—আরিবের সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
— "হ্যালো?"
ওপাশ থেকে নিশাতের কাঁপা গলা।
— "আরিব... তুমি কোথায়?"
— "বাসায়।"
— "একটা ব্রেকিং নিউজ এসেছে।"
— "কী হয়েছে?"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর নিশাত বলল,
— "লালবাগে একজনকে খুন করা হয়েছে।"
আরিবের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
— "...কখন?"
— "রাত ঠিক ৯টা ১৭।"
আরিবের হাত থেকে কফির কাপ পড়ে ভেঙে গেল।
নিশাত বলেই চলেছে—
— "লোকটার গলা কাটা..."
— "..."
— "খুনি উত্তর দিকের গলি দিয়ে পালিয়েছে..."
আরিব কথা বলতে পারছে না। তার চোখ ধীরে ধীরে নেমে এল টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরির দিকে। পাতাটা এখনও খোলা। লেখাগুলো যেন আগের চেয়ে আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ...
পাতার নিচে, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগেও কিছু লেখা ছিল না, সেখানে কালো কালি ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে শুরু করল।
অক্ষরগুলো যেন অদৃশ্য কোনো হাত লিখছে—
"তুমি প্রথম ঘটনাটি দেখলে। এখন দ্বিতীয়টির জন্য প্রস্তুত হও, আরিব রহমান..."
আরিবের নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে তো নিজের নাম কখনও এই ডায়েরিতে লেখেনি।
তাহলে...
তার নাম জানল কে?
ঘরের বাতি হঠাৎ একবার দপ করে নিভে আবার জ্বলে উঠল।
আর সেই মুহূর্তে আরিবের মনে হলো—
ঘরের একেবারে অন্ধকার কোণে, জানালার পাশে...
কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল। সে তাকাতেই ছায়ামূর্তিটি মিলিয়ে গেল।
অধ্যায় ২: প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী
রাত ১০টা ১২ মিনিট।
ঢাকার আকাশে তখন মুষলধারে বৃষ্টি নামছে। জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। দূরে বজ্রপাতের আলো মাঝে মাঝে পুরো ঘরটাকে সাদা করে দিচ্ছে।
আরিব রহমান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিজের ড্রয়িংরুমে।
টেবিলের ওপর রাখা কালো চামড়ার ডায়েরির দিকে তার দৃষ্টি স্থির।
পাতার নিচে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—
"তুমি প্রথম ঘটনাটি দেখলে। এখন দ্বিতীয়টির জন্য প্রস্তুত হও, আরিব রহমান..."
তার গলা শুকিয়ে গেছে। সে নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল,
— "অসম্ভব... এটা অসম্ভব।"
ঠিক তখনই ফোনের ওপাশ থেকে নিশাতের কণ্ঠ ভেসে এল।
— "আরিব? হ্যালো? তুমি আছো?"
আরিব যেন বাস্তবে ফিরে এল।
— "হ্যাঁ... বলো।"
— "তোমার গলা কাঁপছে কেন?"
— "কিছু না..."
— "আমি ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। তুমি আসবে?"
আরিব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— "আমি এখনই বের হচ্ছি।"
লালবাগের রক্তাক্ত রাত
রাত ১০টা ৪০ মিনিট।
পুলিশের নীল-লাল ফ্ল্যাশলাইট পুরো গলিটা আলোকিত করছে। হলুদ টেপ দিয়ে এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছে। লোকজন ফিসফিস করছে।
একজন বৃদ্ধ বলছেন,
— "আমার জীবনে এমন দৃশ্য দেখিনি..."
আরেকজন বলল,
— "খুনি নাকি চোখের পলকে উধাও হয়ে গেছে।"
আরিব প্রেস কার্ড দেখিয়ে ভেতরে ঢুকল।
নিশাত এগিয়ে এল।
— "এইদিকে।"
মাটিতে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি লাশ। কাপড়ের নিচ থেকে রক্ত ধীরে ধীরে গড়িয়ে ড্রেনের দিকে যাচ্ছে। পুলিশের ফরেনসিক কর্মকর্তা ছবি তুলছেন।
নিশাত নিচু স্বরে বলল,
— "ভিকটিমের নাম রফিকুল ইসলাম।"
— "কীভাবে মারা গেছে?"
নিশাত কাপড়টা সামান্য সরাল। আরিবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। গলায় গভীর কাটা দাগ। ঠিক যেমনটা ডায়েরিতে লেখা ছিল।
একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন।
— "আপনি সাংবাদিক?"
— "জি।"
— "ছবি তুলতে পারবেন, কিন্তু তদন্তে বাধা দেবেন না।"
আরিব মাথা নাড়ল। তার চোখ ঘুরে গেল গলির উত্তর দিকের সরু রাস্তায়।
ডায়েরিতে লেখা ছিল— "খুনি পালিয়ে যাবে উত্তর দিকের গলি দিয়ে।"
সে হাঁটতে শুরু করল। মাটিতে কাদার ওপর স্পষ্ট জুতোর ছাপ।
হঠাৎ তার নজরে এল—
একটি কালো পালক।
অদ্ভুত! চারপাশে কোথাও কোনো পাখি নেই। সে পালকটা তুলে নিল।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি কণ্ঠ—
— "ওটা ছুঁবেন না।"
আরিব ঘুরে তাকাল। একজন বয়স্ক পুলিশ কর্মকর্তা। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
তিনি বললেন,
— "আমি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরুল হাসান।"
— "জি।"
কামরুল পালকটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "গত তিনটি অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডেও ঠিক এমন পালক পাওয়া গিয়েছিল।"
আরিব বিস্মিত।
— "তাহলে এগুলো কি একই খুনির কাজ?"
কামরুল ধীরে বললেন,
— "প্রমাণ পাইনি।"
ফিরে আসা
রাত ১টা।
আরিব বাসায় ফিরেছে।
সে বারবার ডায়েরির প্রথম পাতাটা পড়ছে।
হঠাৎ সে লক্ষ্য করল—
আগে যে পাতাগুলো ফাঁকা ছিল...
তার একটি পাতায় হালকা ধূসর দাগ দেখা যাচ্ছে।
সে টেবিল ল্যাম্পটা কাছে টানল।
ধীরে ধীরে অক্ষর ফুটে উঠছে।
তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো লেখাটি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণী
তারিখ : ১৪ আগস্ট
সময় : বিকেল ৫টা ৩২ মিনিট
স্থান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি।
একজন নারী মারা যাবে।
মৃত্যুর আগে সে মাত্র একটি শব্দ বলবে—
"দরজা..."
হত্যাকারী তার মুখ দেখতে পাবে না কেউ। একজন মানুষ তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু সে ব্যর্থ হবে।
পাতার নিচে আরেকটি বাক্য ধীরে ধীরে ফুটে উঠল—
"তুমি যদি চাও, এবার তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারো..."
দ্বিধা
আরিব চেয়ারে বসে পড়ল। সে কি পুলিশকে বলবে?
কিন্তু কী বলবে?
"একটা ডায়েরি আমাকে ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছে"?
পুলিশ কি বিশ্বাস করবে?
বরং তাকে পাগল ভাববে।
সে নিশাতকে ফোন দিল।
— "আগামীকাল দেখা করতে পারবে?"
— "অবশ্যই। কী হয়েছে?"
— "গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।"
— "তোমার গলাটা কেন এমন শোনাচ্ছে?"
— "কাল বলব।"
পরদিন সকাল
নিশাত ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছিল। আরিব এসে ডায়েরিটা টেবিলে রাখল।
— "এটা পড়ো।"
নিশাত প্রথম পাতা পড়ে হেসে উঠল।
— "হরর উপন্যাস লিখতে শুরু করেছ নাকি?"
আরিব গম্ভীর।
— "শেষের পাতাটা পড়ো।"
নিশাত পড়ল।
তারপর বলল,
— "এর সঙ্গে গত রাতের ঘটনার মিল আছে ঠিকই..."
— "মিল না। হুবহু একই।"
— "কাকতালীয় হতে পারে।"
— "আমার নাম?"
নিশাত থেমে গেল।
— "তোমার নামটা কীভাবে লেখা হলো?"
— "আমি জানি না।"
— "তুমি লিখোনি?"
— "না।"
নিশাত ডায়েরির কাগজ পরীক্ষা করল। কালি ঘষে দেখল। কিছুই উঠল না।
সে ধীরে বলল,
— "আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।"
— "আমিও না।"
— "তাহলে?"
— "কেউ আমাদের সঙ্গে খেলা খেলছে।"
অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ
সেদিন বিকেলে আরিব আবার ডায়েরিটা খুলল।
এবার সে খেয়াল করল—
প্রতিটি পাতার নিচে ক্ষুদ্র অক্ষরে কিছু সংখ্যা লেখা।
১৯-০৭-৮৯
০৩-১১-৯৭
১২-০৮-০৪
এগুলো কী?
তারিখ?
কোড?
নাকি...
জন্মদিন?
সে মোবাইলে ছবি তুলে জুম করল। হঠাৎ তার চোখ বড় হয়ে গেল।
সংখ্যাগুলোর মাঝখানে খুব ক্ষুদ্র করে আরেকটি শব্দ লেখা—
"কক্ষ-১৭"
রহস্যময় ফোনকল
রাত ১১টা।
অজানা নম্বর থেকে ফোন। আরিব রিসিভ করল। কেউ কথা বলছে না। শুধু শ্বাসের শব্দ।
তারপর কর্কশ কণ্ঠ—
"ডায়েরিটা ফেরত দাও..."
আরিব চমকে উঠল।
— "কে আপনি?"
কোনো উত্তর নেই।
কয়েক সেকেন্ড পর—
"ওটা তোমার জন্য নয়..."
— "আপনি কোথায়?"
"যাকে বাঁচাতে চাও... তাকে বাঁচাতে পারবে না।"
কল কেটে গেল।
আরিব সঙ্গে সঙ্গে নম্বরে কলব্যাক করল।
উত্তর এলো—
"The number you are trying to call does not exist."
আরিব অবাক হয়ে গেল। নম্বর exist না থাকলে ফোন কিভাবে এলো।
অদৃশ্য দর্শক
রাত তখন প্রায় বারোটা। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আরিব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ রাস্তার ওপারে একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে সে একজন মানুষকে দেখতে পেল। কালো লম্বা কোট। মাথায় টুপি। মুখ দেখা যাচ্ছে না। লোকটি একদৃষ্টিতে আরিবের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
আরিব তাড়াতাড়ি ক্যামেরা হাতে নিল। ছবি তুললো। ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল।
এক সেকেন্ডের জন্য লোকটিকে স্পষ্ট দেখা গেল।
তারপর...
সে নেই। একেবারে নেই।
রাস্তা ফাঁকা।
আরিব দৌড়ে নিচে নেমে গেল। চারদিকে খুঁজল। কেউ নেই।
শুধু ভেজা রাস্তার ওপর পড়ে আছে—
আরেকটি কালো পালক।
অধ্যায়ের শেষ
রাত ১২টা ১৭ মিনিট।
ঘরে ফিরে এসে আরিব ক্যামেরার ছবিগুলো দেখতে লাগল।
প্রথম ছবি। ফাঁকা রাস্তা।
দ্বিতীয় ছবি। ল্যাম্পপোস্ট।
তৃতীয় ছবি...
সে জমে গেল।
ছবিতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—
লোকটির মুখ নেই।
মুখের জায়গায় শুধু গভীর কালো অন্ধকার।
আর তার ঠিক পিছনে, জানালার ভেতরে—
আরিব নিজেই দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সে জানে, ছবি তোলার সময় সে জানালার ভেতরে ছিল না; সে ছিল ক্যামেরার পেছনে।
কাঁপা হাতে সে ছবিটি আবার জুম করল।
জানালার ভেতরে থাকা "আরিব" ধীরে ধীরে একটি বাক্য লিখছে কাঁচের ওপর—
"সময় শেষ হয়ে আসছে..."
অধ্যায় ৩: অদৃশ্য লেখক
রাত ১২টা ২৫ মিনিট
আরিবের হাত কাঁপছে। ক্যামেরার ডিসপ্লেতে সেই ছবিটা এখনও জ্বলছে।
ছবিতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো মুখহীন মানুষ...
আর জানালার ভেতরে আরেকজন "আরিব"।
সে ধীরে ধীরে ছবিটি জুম করল। তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। ছবির প্রতিটি পিক্সেল পরিষ্কার হতে লাগল।
কিন্তু...
জানালার ভেতরে দাঁড়ানো মানুষটি আর স্থির নেই।
সে যেন ছবির ভেতরেই একটু একটু করে মাথা ঘুরিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছে।
আরিব হঠাৎ ক্যামেরাটা হাত থেকে ফেলে দিল।
— "না... এটা হতে পারে না..."
নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল,
"হয়তো ডিজিটাল গ্লিচ।"
কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে সে জানে—এ ধরনের গ্লিচে মানুষের ভঙ্গি বদলে যায় না।
রাত ১টা
আরিব আবার ক্যামেরা তুলে নিল। ছবিটি আরেকবার খুলল।
এবার...
জানালার ভেতরে কেউ নেই। ছবিতে শুধু খালি ঘর।
সে হতভম্ব।
— "আমি কি বিভ্রম দেখলাম?"
ঠিক তখনই...
পেছন থেকে একটা শব্দ।
খস... খস... খস...
ডায়েরির পাতা যেন নিজে নিজেই উল্টে যাচ্ছে। ঘরের সব জানালা বন্ধ। ফ্যানও বন্ধ। তবুও পাতাগুলো দ্রুত উল্টাচ্ছে। আরিব ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
তার চোখের সামনে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। একটি ফাঁকা পাতায় কালো কালি ফুটে উঠছে।
কেউ নেই। কোনো কলম নেই। তবুও অক্ষর তৈরি হচ্ছে। যেন অদৃশ্য কোনো হাত লিখছে।
নতুন লেখা
"তুমি ছবির দিকে তাকিয়েছিলে।"
আরেকটি লাইন।
"এটা করা উচিত হয়নি।"
আরেকটি।
"এখন সেও তোমাকে দেখতে পাচ্ছে।"
আরিব এক পা পিছিয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। সে কাঁপা গলায় বলল,
— "কে তুমি?"
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
তারপর...
ডায়েরিতে নতুন একটি বাক্য।
"আমি লিখি না। আমি শুধু যা ঘটবে, তা লিখে রাখি।"
আরিব ফিসফিস করে বলল,
— "তাহলে... কে ঘটায় এসব?"
ডায়েরি এবার আর কিছু লিখল না।
পরদিন সকাল
সকাল ৮টা।
আরিব সোজা চলে গেল "বাংলা ইনসাইট" অফিসে।
নিশাত আগেই এসেছে।
তার মুখে ক্লান্তির ছাপ।
— "তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি সারারাত ঘুমাওনি।"
— "ঘুমানোর সুযোগ পাইনি।"
— "কী হয়েছে?"
আরিব সব বলল।
ডায়েরি।
ছবি।
নতুন লেখা।
অদৃশ্য হাত।
সব।
নিশাত কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর বলল,
— "আমি তোমার কথা বিশ্বাস করতে চাই..."
— "কিন্তু?"
— "প্রমাণ দরকার।"
— "আজ রাতে আমার বাসায় থাকবে?"
— "কেন?"
— "তুমি নিজের চোখে দেখবে।"
নিশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "ঠিক আছে।"
পুলিশের সঙ্গে দেখা
দুপুরে আরিব গেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরুল হাসানের অফিসে। কামরুল ফাইল দেখছিলেন।
— "আসুন, সাংবাদিক সাহেব।"
আরিব সরাসরি বলল,
— "আমি লালবাগ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানি।"
কামরুল ভ্রু তুললেন।
— "কী জানেন?"
— "আরও একটা খুন হবে।"
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
কামরুল ধীরে বললেন,
— "আপনি কীভাবে জানলেন?"
আরিব থেমে গেল।
সে কি ডায়েরির কথা বলবে?
কামরুল চোখ সরু করলেন।
— "আপনি কি কিছু লুকাচ্ছেন?"
— "আমি... নিশ্চিত নই।"
— "সাংবাদিক হিসেবে আপনি অনেক কিছু শুনতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন—তথ্য গোপন করলে সেটা অপরাধও হতে পারে।"
আরিব চুপচাপ উঠে চলে এল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিট।
ডায়েরিতে লেখা—
৫টা ৩২ মিনিট।
আরিব ও নিশাত পৌঁছে গেল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে। চারপাশে ছাত্রছাত্রী। কেউ বই পড়ছে। কেউ আলোচনা করছে। সবকিছুই স্বাভাবিক।
নিশাত হাসল।
— "দেখলে?"
— "কী?"
— "কিছুই হবে না।"
আরিব ঘড়ির দিকে তাকাল।
৫টা ০৮।
তার বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়ছে।
রহস্যময় নারী
ঠিক তখনই একটি মেয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এল। বয়স আনুমানিক ছাব্বিশ। হাতে কয়েকটি পুরোনো বই।
হঠাৎ...
সে থেমে গেল। চারদিকে তাকাল। মনে হচ্ছে কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
আরিব লক্ষ্য করল—
একজন কালো কোট পরা লোক দূর থেকে তাকিয়ে আছে।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
— "নিশাত!"
— "কী?"
— "ওই লোকটাকে দেখছ?"
নিশাত তাকাল।
— "কোথায়?"
— "ওই যে..."
লোকটি নেই।
যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
৫টা ৩১ মিনিট
মেয়েটি লাইব্রেরির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে।
আরিব দ্রুত এগিয়ে গেল।
— "এক্সকিউজ মি!"
মেয়েটি থামল।
— "জি?"
— "আপনার নাম?"
— "মেহরীন।"
— "আপনি কি ঠিক আছেন?"
— "জি... কেন?"
আরিব উত্তর দেওয়ার আগেই...
একটা বিকট শব্দ।
ধাম!
উপরের পুরোনো বারান্দার একটি বিশাল পাথরের কার্নিশ ভেঙে নিচে পড়লো।
আরিব চিৎকার করল,
— "সাবধান!"
সে মেহরীনকে জোরে ধাক্কা দিল। দুজনেই মাটিতে পড়ে গেল। কার্নিশটা ঠিক তাদের পাশেই আছড়ে পড়ল। চারদিকে চিৎকার। মানুষ দৌড়াচ্ছে। ধুলোয় ঢেকে গেছে চারপাশ।
নিশাত দৌড়ে এল।
— "তোমরা ঠিক আছ?"
আরিব হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— "মেহরীন কোথায়?"
মেয়েটি ধীরে উঠে বসল।
তার কপাল কেটে রক্ত বের হচ্ছে।
কিন্তু...
সে বেঁচে গেছে।
আরিব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই...
মেহরীন তার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল—
"দরজা..."
এই একটি শব্দ বলেই সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
আরিবের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। ডায়েরিতে ঠিক এই শব্দটাই লেখা ছিল।
কিন্তু...
ডায়েরিতে তো লেখা ছিল—
"সে মারা যাবে।"
মেহরীন তো বেঁচে আছে! তাহলে কি ভবিষ্যৎ বদলে গেছে?
রাত
রাত ৯টা।
আরিব বাসায় ফিরেছে।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
সে কি ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করেছে?
উত্তেজিত হয়ে সে ডায়েরি খুলল। পাতাটি বদলে গেছে। আগের লেখাগুলো নেই। নতুন লেখা ফুটে উঠছে।
"তুমি নিয়ম ভেঙেছ।"
আরেকটি লাইন।
"যাকে আজ মরার কথা ছিল, সে বেঁচে গেছে।"
আরিবের চোখে আশার ঝিলিক।
— "তাহলে সব বদলানো সম্ভব!"
কিন্তু ঠিক পরের লাইনটি পড়ে তার মুখের রঙ উধাও হয়ে গেল।
"ভাগ্য ঋণ রেখে দেয় না।"
আরও একটি লাইন ধীরে ধীরে লেখা হলো—
"একটি জীবন বেঁচেছে..."
"তাই আরেকটি জীবন নেওয়া হবে।"
ঠিক তখনই—
নিশাতের ফোন। স্ক্রিনে নাম জ্বলছে। আরিব দ্রুত রিসিভ করল।
— "হ্যালো?"
কোনো উত্তর নেই। শুধু ভারী নিঃশ্বাস।
তারপর...
একটি মৃদু কণ্ঠ। কিন্তু সেটা নিশাতের নয়।
"তোমার বন্ধুকে বাঁচাতে চাইলে... পুরান ঢাকার বাড়িতে ফিরে এসো।"
কল কেটে গেল। আরিব সঙ্গে সঙ্গে নিশাতকে কলব্যাক করল।
ফোন বন্ধ। এক মিনিট পর তার ফোনে একটি ছবি এল।
অজানা নম্বর থেকে।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
নিশাত একটি কাঠের চেয়ারে বাঁধা। মুখে রক্ত। চোখে আতঙ্ক।
আর তার পেছনের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে রক্ত দিয়ে লেখা—
"অদৃশ্য লেখক অপেক্ষা করছে..."
চলবে…………