ছোটবেলায় যখন কেউ জিজ্ঞেস করতো, “বড় হয়ে কী হওয়ার ইচ্ছা তোমার?”
তখন সবাই বলতো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, আরও কত কী! কিন্তু বড় হতে হতে সেসব ইচ্ছা যেমন মরে যেতে থাকে, তেমনি এক সময় সেই ছোটবেলার স্বপ্নগুলো যে কী ছিল, তাও আর মাথায় থাকে না। পড়া মুখস্থ করতে করতে বিরক্ত হয়ে তখন আর সেসব ভাবার ফুরসতও মেলে না।
মাঝে মাঝে এমনও মনে হতো, ধুর ছাই! এর চেয়ে রিকশা চালানোও ভালো। দিনশেষে যে নগদ টাকা আসবে, তাতেই চলে যাবে। আমার আর খরচ কী?
খাবো, দাবো, ঘুমাবো... ব্যস!
আবার যখন কোট-টাই পরা কোনো অফিসার গোছের মানুষ নয়তো মোটরসাইকেলে কোনো সমাজকর্মী অথবা ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড লাগানো গাড়িতে কাউকে চড়তে দেখতাম, তখন ঘুমিয়ে পড়া ইচ্ছাটা আবার একটু নাড়া দিয়ে উঠতো। মনে হতো, এমন হতে গেলে তো পড়াশোনা করতে হবে। তবে রেশিওতে হিসেব করলে, পড়াশোনা করার এই ইতিবাচক চিন্তা যদি আসতো বছরের ১০ শতাংশ দিন, বাকি ৯০ শতাংশ সময়ই পড়াশোনা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতাম।
কিন্তু হায়!
সত্যিকার অর্থে বড় হতে হতে শরীরের দৈর্ঘ্য যেমন বাড়ে, তার চেয়েও দ্রুতগতিতে শেষ হয়ে যেতে থাকে পেছনের সেই স্বাধীন ইচ্ছা আর ভাবনাহীন দিনগুলো। বড় হওয়া, রোজগার করা, সংসার সামলানো, পরিবারের দেখভাল, অফিস-বস-ক্লায়েন্ট আর সামাজিকতা মেইনটেইন করতে করতে নতুন কোনো স্বপ্ন দেখার আর অবসর মেলে না।
এখনকার জীবনের শুধু দুটো রুটিনের মিল পাওয়া যায়ঃ ঘুমানো আর ঘুম থেকে ওঠা। আগে স্কুল কিংবা পরীক্ষার জন্য ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠতে হতো, আর এখন উঠতে হয় যাপিত জীবনের তাগিদে।
পার্থক্য জাস্ট এইটুকুই...
নিশ্চয়ই সেই ইংরেজি কবিতাটা মনে আছে?
“Early to bed and early to rise, makes a man healthy, wealthy, and wise.”
এখনকার জীবনে ‘আর্লি টু বেড’ গেলে সারাদিনের ব্যস্ততায় অদেখা থেকে যাওয়া পছন্দের মুভিটা আর দেখা হয় না। আর ‘আর্লি টু রাইজ’ হতে হয় দৌড়ে গিয়ে অফিসের অ্যাটেনডেন্স মেশিনে আঙুল পাঞ্চ করার টার্গেটে। এই দুইয়ের গ্যাড়াকলে পড়ে বড় বেলায় এসে আর হেলদি, ওয়েলদি কিংবা ওয়াইজ হওয়া হয়ে ওঠে না।
একেবারেই যে সম্ভব হয় না, তা-ও অবশ্য নয়। জীবনের এই অন্তহীন দৌড় যখন এক সময় আপনাকে কোনো ডাক্তারের চেম্বারে মুখোমুখি চেয়ারে বসিয়ে দেবে, তখন প্রেসক্রিপশনের কড়া রুটিন মেনে একরকম বাধ্য হয়েই রুটিন জীবনে ফেরার সুযোগ আসে। আর আমরা আসলে করিও তাই!
হাহ হাহ হাহ...
নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল, আরও কঠিন। স্রষ্টার সৃষ্টি এই জীব রোগ পোষার ওস্তাদ। যে ফুটফুটে মেয়েটি ছোটবেলায় একটু হোঁচট খেলে মা-বাবা অস্থির হয়ে পড়তেন, যার সামান্য জ্বরে রাতের পর রাত বাড়ির কারও চোখে ঘুম আসতো না, সেই মেয়েটিই এক সময় সংসারী মহিলা হয়ে ওঠে। কর্মজীবি নারী তো কতো কিছু সামাল দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারে শাইন করা, নিজেকে টিকিয়ে রাখার দৌড়ে ব্যস্ত থাকে।সবার খেয়াল রাখতে রাখতে নিজের দিকে তাকানোর ফুরসতটুকুও তার আর হয় না। ছোটবেলার ইচ্ছা নিশ্চয়ই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একই ছিলো।
কখনো কখনো মাঝরাতে বা ভোরে ঘুম ভেঙে মনে হয় কত কিছু করা বাকি, কত কিছু দেখা বাকি, কত মানুষের সাথে কত কথা বলা বাকি, কত মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া বাকি, কতো প্রিয় মানুষের অভিমান ভাঙানো বাকি, কত আত্মীয়ের আমন্ত্রণ মিস হয়ে গেছে, কতো বন্ধুর সাথে দূরত্ব ঘোচাতে হবে, কতো পরিচিতের সাথে কত কিছুই যে করতে হবে। নাহ, কাল থেকেই লেগে পড়বো ভাবতে ভাবতেই অন্য কোনো বাস্তব তাড়া এসে সব ভুলিয়ে দেয়।
আবার গতকালকে পেছনে ফেলে, আজকের দিনটা পার করে, আগামীকালকে দেখার আশা করতে করতেই দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যায়। আমাদের প্রিয় পরিবারও এক সময় বড় হতে হতে আবার ছোট হতে শুরু করে। এসময় শরীরের দৈর্ঘ্য থেমে যায়, তবুও মানুষ আরেকবার বড় হয়।
হাহ হাহ হাহ... এসব কথা ছোটবেলার ভাবনায় কখনোই আসেনি।
আর এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে চলতে চলতেই মানুষ সত্যি সত্যিই একসময় হারিয়ে ফেলে নিজের সেই না চাওয়া, না পাওয়া জীবন।
7
View