Posts

গল্প

সাহস করে কলা গাছের ভেলা।

July 13, 2026

Shafin pro

28
View

বাড়ি ফেরার চার দিন সাহস করে কলা গাছের ভেলা নিয়ে,:

             একটি অসমাপ্ত যাত্রাগ্রীষ্মের ছুটি আর অফিসের কয়েকদিনের ছুটি মিলিয়ে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই গ্রামে এসেছিলাম। ইট-কাঠের যান্ত্রিক ঢাকা শহর থেকে দূরে, সবুজ-শ্যামল এই চেনা গ্রামে মনটা জুড়িয়ে নেওয়ার তীব্র বাসনা ছিল। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল বোঝা বড় দায়। যখন বাড়ি পৌঁছালাম, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টির কোনো বিরতি নেই। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বর্ষণে দেখতে দেখতে আমাদের পুরো গ্রাম প্লাবিত হয়ে গেল। চারদিকের রাস্তাঘাট, ফসলের মাঠ বিলীন হয়ে গেল পানির নিচে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সব পথ বন্ধ।প্রথম তিন দিন কেটে গেল এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতিতে। একদিকে বন্যার পানির বন্দিদশা, অন্যদিকে অনেকদিন পর মা, ভাই, বোন আর গ্রামের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের এত কাছাকাছি পাওয়ার এক অপার আনন্দ। ঢাকা শহরের ব্যস্ত জীবনে যেখানে মায়ের সাথে দুটো কথা বলার সময় পাওয়া যায় না, সেখানে এই তিন দিন যেন এক স্বর্গীয় উপহার ছিল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মায়ের হাতের গরম ভাত, ভাইবোনের সাথে পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন, আর আড্ডায় এক অদ্ভুত আত্মিক মিলন ঘটেছিল সবার সাথে। কিন্তু আনন্দের আড়ালে একটা গভীর দুশ্চিন্তাও ভর করেছিল আমার মনে। কারণ ঢাকায় আমার অফিস খুলবে, আর এভাবে আটকে থাকলে চাকরি বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।দুই দিন, তিন দিন করে সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল। কোনো নৌকা নেই, ট্রলার নেই। চারদিকে অথই পানি। ঢাকা যাওয়ার কোনো উপায় না পেয়ে অস্থির চিত্তে বাড়ির চারদিকের বারান্দায় আর ঘরের দাওয়ায় কেবল পায়চারি করছিলাম। ছটফটানি বেড়েই চলছিল। উপায়ান্তর না পেয়ে যখন প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার দশা, ঠিক তখনই এলো সেই অভাবনীয় চর্তুথ দিনটি।দুপুরের দিকে ক্লান্ত চোখে বাড়ির পাশের পুকুরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, পাশের বাড়ির একটি ছোট ছেলে একটা গাছের গুঁড়ি নিয়ে পানির ওপর অনায়াসে সাঁতার কাটছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই বুঝলাম, ওটা একটা আস্ত কলা গাছ। ছেলেটি মনের আনন্দে সেই কলা গাছের ওপর ভর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই দৃশ্যটি দেখামাত্রই বিদ্যুৎ চমকের মতো আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আমি ভাবলাম, "আরে! একটা কলা গাছ যদি একটা মানুষকে এভাবে ভাসিয়ে রাখতে পারে, তবে কয়েকটা কলা গাছ একসঙ্গে বাঁধলে তো চমৎকার একটা ভেলা তৈরি হয়ে যায়!" এই ভেলা দিয়ে যদি কোনোমতে আমি গ্রামের ওই প্রধান ভেরিবাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি, তবে সেখান থেকে তো কোনো না কোনো গাড়ি পেয়ে যাব। ভেরিবাঁধের ওপর পানি ওঠেনি, সেখান থেকে ঢাকার বাস চলাচল করার কথা।বুদ্ধি আসামাত্রই আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। গায়ের জামাকাপড় দ্রুত খুলে একপাশে রেখে লুঙ্গিটা কষে বেঁধে নেমে পড়লাম কোমরের সমান পানিতে। আমাদের বাড়ির পেছনেই বেশ কয়েকটা বড় কলার ঝাড় ছিল। ধারালো দা হাতে নিয়ে পানিতে নেমে একে একে তিনটা শক্ত এবং মোটা কলা গাছ কেটে ফেললাম। গাছগুলোকে টেনে এনে পুকুরের ঘাটে জড়ো করলাম। এরপর শক্ত রশি ও বাঁশের কাঠি দিয়ে কলা গাছ তিনটিকে খুব মজবুতভাবে পাশাপাশি গেঁথে ফেললাম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিশ্রমে তৈরি হয়ে গেল আমার স্বপ্নের যান—একটি কলার ভেলা।পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। বিদায়ের ক্ষণটি ছিল বেশ আবেগঘন। মা কপালে হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিলেন, ভাইবোনেরা চোখ মুছল। ব্যাগ আর ল্যাপটপ ভর্তি ব্যাকপ্যাকটা পিঠে শক্ত করে বাঁধলাম, যাতে পানিতে পড়ে না যায়। ভেজা জামাকাপড় বদলে শুকনা এক জোড়া পোশাক পরে নিলাম। এরপর তৈরি করা কলার ভেলায় পা রাখলাম। একটি লম্বা বাঁশের লগি দিয়ে ধাক্কা মেরে ভেলাটি ভাসিয়ে দিলাম বন্যার পানির বুকে।ধীরে ধীরে লগি ঠেলে ভেলাটি এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাম ভেরিবাঁধের দিকে। পানির স্রোত আর বাতাসের প্রতিকূলে ভেলা সামলানো বেশ কঠিন ছিল, কিন্তু মনের ভেতর ঢাকায় ফেরার এবং কর্মস্থলে পৌঁছানোর যে তাগিদ ছিল, তা আমাকে থামতে দেয়নি। প্রায় এক ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে আমি পৌঁছালাম সেই ভেরিবাঁধে। বাঁধের ওপর উঠতেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সেখান থেকে সত্যিই একটা ঢাকা অভিমুখী বাসের দেখা পেয়ে গেলাম।বাসে উঠে যখন জানলা দিয়ে পেছনের প্লাবিত গ্রামের দিকে তাকাচ্ছিলাম, তখন বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। একদিকে দুর্যোগের ভয়াবহতা, আর অন্যদিকে কলার ভেলা বানিয়ে এই দুঃসাহসিক ঢাকা ফেরার গল্প—আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই চার দিনের স্মৃতি, মা-ভাইবোনের সাথে কাটানো সেই মধুর সময় আর নিজের বুদ্ধিতে বিপদ জয়ের আনন্দ আমি কোনোদিন ভুলব না। না সেদিনের সেই স্মৃতিগুলো। গল্পটি কেমন লাগলো লিখে জানাতে পারেন। এবং ভালো কি মন্দ কমেন্ট করে লিখতে পারেন তাতে লেখা হাত আরো মজবুত হবে। ধন্যবাদ।

Comments

    Please login to post comment. Login