Story

সুমনের বেকার জীবনের পঞ্চম খন্ড।

September 10, 2026

28
View

সুমনের বেকার জীবনের পঞ্চম খন্ড:

 মেঘ কাটার গানবিগত চারটে পর্ব জুড়ে সুমনের জীবনটা ছিল একটা গোলকধাঁধার মতো। কখনো টিউশনি খোঁজার ক্লান্তি, কখনো তীব্র বেকারত্বের বাজারে মাথা কুটে মরা, আবার কখনো ইউটিউবের ছোট পর্দায় নিজের মেধা ঢেলে দিয়ে একটুখানি পরিচিতি পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু সুমন এবার বুঝতে পারল, শুধু একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকলে তার ভেতরের আসল মেধাটার অপচয় হবে। ইউটিউবের ভিউ, সাবস্ক্রাইবার আর অ্যালগরিদমের খাঁচায় বন্দি থেকে সে ক্লান্ত। তার মনে হলো, মনের গভীরে যে বড় বড় গল্পগুলো জমা হয়ে আছে, সেগুলোকে জীবন্ত করতে হলে একটা বড় ক্যানভাস দরকার। সে চিন্তা করল, "না, এ থেকেও আমার মেধাকে আরো বেশি খাটাতে হবে।"এই এক লাইনের জেদটাই সুমনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সে এক ঝটকায় ইউটিউবের চেনা, আরামদায়ক জগৎটা ছেড়ে দিল। তার লক্ষ্য এখন অনেক উঁচুতে—টেলিভিশনের মেগা নাটক পরিচালনা করা। যে নাটকের মাধ্যমে সে শুধু দেশের মানুষের ড্রয়িংরুমে নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম ছড়িয়ে দিতে চায়।১. নতুন আঙিনায় প্রথম কদমইউটিউব ছেড়ে যখন সুমন প্রথম টিভির নামকরা এক প্রোডাকশন হাউজে পা রাখল, তখন তার পকেটে ছিল মাত্র কয়েকটা স্ক্রিপ্ট আর চোখে ছিল রাতজাগা স্বপ্ন। টিভির জগৎটা ইউটিউবের মতো নয়। এখানে স্পন্সরদের চাপ, অভিজ্ঞ অভিনেতাদের ডেট পাওয়ার ঝামেলা আর প্রতি মুহূর্তে বাজেটের হিসাব মেলাতে হয়।প্রথম প্রথম অনেকেই তাকে বাঁকা চোখে দেখল। একজন সিনিয়র ডিরেক্টর বলেই বসলেন, "ইউটিউবের সস্তা কন্টেন্ট বানানো আর টেলিভিশনের নিটোল নাটক বানানো এক জিনিস নয়, হে ছোকরা!"কথাটা সুমনের বুকে তীরের মতো বিঁধল। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে মনে মনে বলল, "আমার মেধা কোনো সস্তা জিনিস নয়। আমি দেখাব, গল্প কীভাবে বলতে হয়।" সে দিনরাত এক করে স্ক্রিপ্ট নিয়ে বসলো। চরিত্রের সংলাপ, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, লাইটিংয়ের খুঁটিনাটি—সবকিছু সে নিজে একা একা স্টাডি করতে লাগল।২. অক্লান্ত পরিশ্রমের দিন ও রাতশুরু হলো সুমনের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। টেলিভিশনে নিজের প্রথম নাটকটি অন-এয়ার করার জন্য সে আক্ষরিক অর্থেই দিনরাত ভুলে গেল। সকাল ছয়টায় যখন পুরো শহর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, সুমন তখন শুটিং স্পটে ট্রলি আর লাইটের তদারকি করে। আবার রাত দুটোয় যখন সবাই ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয়, সুমন তখন এডিটিং প্যানেলে বসে প্রতিটা ফ্রেম নিখুঁত করার জন্য এডিটরকে নিয়ে মগ্ন থাকে।তার দুপুরের খাবারের ঠিক থাকত না, রাতের ঘুম উবে গিয়েছিল। কড়া লিকারের চা আর কফিই হয়ে উঠেছিল তার একমাত্র সঙ্গী। সুমনের মা মাঝেমধ্যে তার চোখের নিচের কালো দাগ দেখে কেঁদে ফেলতেন, বলতেন, "বাবা, এত খাটনি শরীর সইবে তো?" সুমন মায়ের হাত ধরে হাসত, বলত, "মা, এই খাটনিটুকুই তো আমার পুজি। এই মেঘ কাটবেই।"৩. অনিশ্চয়তার দোলাচলনাটক তৈরি তো হচ্ছে একের পর এক, কিন্তু সুমন ভেতরে ভেতরে এখনো এক বিরাট অনিশ্চয়তায় ভুগছে। সে আসলে কতটুকু সফলতা পাবে, তা সে এখন পর্যন্ত জানে না। টিভির দর্শক এই নতুন পরিচালকের কাজ কীভাবে নেবে? চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তার কাজকে মূল্যায়ন করবে তো? নাকি ইউটিউব ছাড়ার এই সিদ্ধান্তটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হবে?এইসব প্রশ্ন যখনই তাকে গ্রাস করতে আসত, সে তার চেয়েও দ্বিগুণ শক্তিতে কাজে ডুবে যেত। সে বুঝতে পেরেছিল, ফলের আশা করে বসে থাকার সময় এটা নয়। এখন শুধু বীজ বোনার সময়। বিশ্বমঞ্চে বাংলা নাটককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন সে দেখেছে, তা সফল করতে হলে এই অনিশ্চয়তাকেই সঙ্গী করে নিতে হবে।৪. বিশ্বজয়ের স্বপ্নসুমনের এবারের নাটকগুলোর কন্টেন্ট একদমই আলাদা। সে শুধু সস্তা প্রেম বা হাসির নাটক বানাচ্ছে না। সে তুলে ধরছে মধ্যবিত্তের চিরায়ত লড়াই, তরুণ প্রজন্মের মানসিক টানাপোড়েন আর আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ের গল্প। সে তার নাটকে এমন এক সিনেমাটিক ভাষা ব্যবহার করছে, যা শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয়, সাবটাইটেল দিয়ে দেখলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ রিলেট করতে পারবে।সে এখন একের পর এক নাটক তৈরি করে যাচ্ছে। সে জানে না তার ভাগ্য তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, কিন্তু সে এটা জানে—তার সততা আর এই অক্লান্ত পরিশ্রম কখনো বৃথা যাবে না। সুমনের বেকার জীবনের এই পঞ্চম খণ্ডটি আসলে কোনো হাহাকারের গল্প নয়, এটি হলো একজন তরুণের নিজের মেধাকে সর্বোচ্চ স্তরে খাটিয়ে বিশ্বজয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার এক জ্বলন্ত মহাকাব্য। সুমনের বেকার জীবনের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। আরো খন্ড বাকি আছে দেখতে চোখ রাখুন। পরবর্তী খন্ড আশার আগ পর্যন্ত।

Comments

    Please login to post comment. Login