অচেনা সুতোয় বোনা গল্প
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা কেমন যেন মেঘলা ছিল। চিটচিটে গরম আর হালকা গুমোট ভাব—ঠিক যে আবহাওয়াটা আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি। অফিস থেকে বের হতে হতে বিকেল সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। প্রচণ্ড ক্লান্ত শরীরটা টেনে কোনোমতে একটা লোকাল বাসে উঠে বসলাম। বাসে উপচে পড়া ভিড় ছিল না, তবে বসার মতো সিটও খুব একটা খালি ছিল না। জানালার ধারের একটা ডাবল সিটে একজন তরুণী বসে ছিল। তার পাশের জায়গাটা খালি দেখে আমি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সেখানে গিয়ে বসলাম।মেয়েটির পরনে ছিল সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার-কামিজ। চোখে চশমা, চুলে একটা সাধারণ ক্লিপ আটকানো। জানালার বাইরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে, যেন গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন। আমি বসার পর সে একবার শুধু আমার দিকে তাকাল, মৃদু একটু ভদ্রতার হাসি দিল, তারপর আবার জানালার বাইরের ধূসর শহরের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার কোলের ওপর রাখা ছিল একটা ভারী, মেরুন রঙের কাপড়ের সাইড ব্যাগ।বাস চলছে। জ্যাম, হর্ন আর কন্ডাক্টরের চিল্লাচিল্লির মাঝে আমি কখন যে একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে বাসটা ব্রেক কষল। আমার তন্দ্রা ছুটে গেল। তাকিয়ে দেখি, বাসটা সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের কাছাকাছি একটা স্টপেজে এসে থেমেছে। পাশের দিকে তাকাতেই দেখলাম সিটটা খালি। মেয়েটি নেই। সে হয়তো এই স্টপেজেই তাড়াহুড়ো করে নেমে গেছে।কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল সিটের কোণায়। মেয়েটি যেখানে বসেছিল, ঠিক সেখানে তার সেই মেরুন রঙের ব্যাগটা পড়ে আছে।আমি চমকে উঠলাম। জানালা দিয়ে বাইরে মাথা গলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম মেয়েটিকে চেনা যায় কি না। কিন্তু ততক্ষণে বাসের বাইরে মানুষের ঢল, তার ওপর টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ওই ভিড়ের মধ্যে চশমা পরা সেই মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।আমি ব্যাগটা হাতে তুলে নিলাম। বেশ ভারী। চেইনটা টেনে বন্ধ করা। বাসের কন্ডাক্টর তখন পেছনের দিকে ভাড়া কাটছিল। আমার মাথায় প্রথম বুদ্ধি এল ব্যাগটা কন্ডাক্টরের হাতে দিয়ে দেওয়ার। কিন্তু পরক্ষণেই বিবেক বাধা দিল। লোকাল বাসের কন্ডাক্টরের কাছে এই ব্যাগ দিলে তা আদেও মেয়েটির কাছে পৌঁছাবে, নাকি মাঝপথে গায়েব হয়ে যাবে—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।ব্যাগটা কোলের ওপর নিয়ে আমি চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। এখন আমি কী করব?বাস থেকে নেমে থানায় যাব? কিন্তু বাংলাদেশের থানায় একটা সাধারণ ব্যাগ নিয়ে গেলে পুলিশ কি আদেও কোনো গুরুত্ব দেবে? নাকি উল্টো আমাকেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে?বাস তখন আবার চলতে শুরু করেছে। আমার গন্তব্য চলে এল। আমি ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লাম।বাসা পর্যন্ত পুরোটা পথ আমার মনে হচ্ছিল, সবাই যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছিল আমি কোনো অপরাধ করে পালাচ্ছি। বাসায় ফিরে দরজা লক করে সোফায় ধপাস করে বসে পড়লাম। ব্যাগটা সামনে টেবিলের ওপর রাখলাম।ভেতরে কী আছে তা দেখার একটা তীব্র কৌতূহল হচ্ছিল, আবার একই সাথে একটা অপরাধবোধও কাজ করছিল। অন্যের ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু ভেতরে যদি এমন কোনো আইডি কার্ড বা ফোন নম্বর থাকে, যা দিয়ে মেয়েটির খোঁজ পাওয়া সম্ভব? এই যুক্তিতে আমি ব্যাগটার চেইন খুললাম।ব্যাগের ভেতরের জিনিসগুলো দেখে আমার চোখ কপালে উঠল। কোনো মেকআপের জিনিস বা সাধারণ খাতা-পত্র নয়। ব্যাগের ভেতর গোটা চারেক মোটা ডায়েরি, একটা পুরনো মডেলের ল্যাপটপ, আর একটা খামের ভেতর বেশ কিছু টাকা। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটা ছিল ডায়েরিগুলোর ওপরে রাখা একটা ছোট্ট চিরকুট।চিরকুটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা:"যিনি এই ব্যাগটি পাবেন, দয়া করে এর ভেতরের ডায়েরিগুলো নষ্ট করবেন না। এগুলো আমার বাবার জীবনের শেষ স্মৃতি। যদি পারেন, ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় দেওয়া নম্বরে একটা ফোন করবেন। আমি আপনার আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।"আমি দ্রুত প্রথম ডায়েরিটা খুললাম। সত্যিই, প্রথম পাতার ওপর একটা নাম লেখা—'আহসান হাবিব', আর তার নিচে একটা মোবাইল নম্বর।বুকটা ধক করে উঠল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ওই নম্বরে ডায়াল করলাম। দুবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে একটা দুর্বল, মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল, "হ্যালো?""হ্যালো, আপনি কি আজ বিকেলে বাসে কোনো ব্যাগ হারিয়েছেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ এল না। তারপর একটা কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতেই বলল, "হ্যাঁ! হ্যাঁ! আমার বাবার ডায়েরিগুলো... ওগুলো কি আপনার কাছে আছে? প্লিজ বলুন ওগুলো ঠিক আছে?"আমি তাকে শান্ত হতে বললাম এবং জানালাম যে ব্যাগটি সম্পূর্ণ নিরাপদ আছে। মেয়েটির নাম তানহা। সে জানাল, ওই ডায়েরিগুলো তার প্রয়াত বাবার লেখা কিছু অপ্রকাশিত উপন্যাস আর স্মৃতিকথা, যা সে প্রকাশকের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে সে বাসে ওটা ফেলে যায়।আমরা ঠিক করলাম পরের দিন সকালে একটা পরিচিত কফি শপে দেখা করব, যেখানে আমি তার ব্যাগটা ফিরিয়ে দেব।পরদিন সকালে যখন তানহার হাতে ব্যাগটা তুলে দিলাম, তার চোখের কৃতজ্ঞতা দেখার মতো ছিল। সে বারবার আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল। কফি খেতে খেতে সে তার বাবার গল্প শোনাল, কীভাবে তার বাবা সারাজীবন সাহিত্য সাধনা করেও জীবদ্দশায় কিছু প্রকাশ করে যেতে পারেননি।বাসের সেই একটিমাত্র ভুল আর আমার একটুখানি সততা—আমাদের দুজনকে এক অদ্ভুত সুতোয় বেঁধে দিল। ব্যাগটা ফিরিয়ে দেওয়ার পর আমাদের যোগাযোগটা আর শেষ হয়ে যায়নি। তানহার বাবার বই প্রকাশের দিন আমিই ছিলাম তার প্রধান অতিথি। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন ভাবি—সেদিন বাসের সিটে ফেলে যাওয়া ব্যাগটা আসলে কোনো সাধারণ ব্যাগ ছিল না, ওটা ছিল একটা নতুন সম্পর্কের শুরু।