নবদম্পতি মধু এবং বকুল-এর জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত, আবেগঘন এবং রোমান্টিক বাসর রাতের গল্প।
নীল জোছনার বাসর: মধু ও বকুলের এক নতুন ভোর
প্রথম পরিচ্ছেদ: লজ্জাবতী বকুল ও অস্থির মধু
সারা বাড়ি জুড়ে তখনো সানাইয়ের শেষ সুরটা হালকা হয়ে ভাসছিল। আত্মীয়-স্বজনদের কোলাহল ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে। বিয়ের সব নিয়মকানুন, ছবি তোলা আর গুরুজনদের প্রণাম পর্ব শেষ করে বকুল যখন বাসর ঘরে এসে বসল, তখন ঘড়িতে রাত বারোটা পার হয়ে গেছে।
ঘরটি সাজানো হয়েছে বকুলের পছন্দের শ্বেতশুভ্র রজনীগন্ধা এবং লাল গোলাপ দিয়ে। খাটের চারপাশ থেকে ঝুলে থাকা ফুলের মালাগুলোর সুবাসে পুরো ঘরের বাতাস এক মাদকতায় ভরে আছে। খাটের ঠিক মাঝখানে লাল বেনারসি শাড়ি, গা ভর্তি গহনা আর মাথায় ওড়না টেনে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে বকুল। তার বুকের ভেতর তখন যেন এক হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তার সোনার নেকলেসটি হিরের আলোর মতো চকচক করে উঠছে। সে অবগুন্ঠনের আড়াল থেকে ঘরের মেঝেটার দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের আঙুলগুলো মোচড়াচ্ছিল।
ঠিক তখনই দরজার ছিটকিনি খোলার মৃদু আওয়াজ হলো। বকুলের বুকটা ধক করে উঠল। মধু ঘরে প্রবেশ করেছে।
মধু দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার পরনে হালকা ক্রিম রঙের সিল্কের পাঞ্জাবি আর ধুতি। বকুলের দিকে তাকিয়ে মধুর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। দীর্ঘ তিন বছরের প্রেম, কত লুকিয়ে দেখা করা, কত মান-অভিমান—সব পার হয়ে আজ বকুল তার ঘরের বউ, তার অর্ধাঙ্গিনী।
মধু ধীর পায়ে খাটের দিকে এগিয়ে এলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে বকুলের হৃৎস্পন্দন যেন দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছিল। খাটের পাশে এসে মধু যখন বসল, তখন খাটের তোষকটা একটু দেবে গেল। বকুল লজ্জায় আরও একটু গুটিয়ে গেল।
মধু পরম মমতায় বকুলের ডান হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। বকুলের হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। মধু মৃদু হেসে বলল, "কী ব্যাপার বকুল? এত কাঁপছ কেন? আমি কি কোনো বাঘ-ভাল্লুক যে তোমাকে খেয়ে ফেলব?"
মধুর গলার চেনা সুর শুনে বকুল ওড়নার নিচ থেকেই আলতো করে মাথা নাড়ল, কিন্তু কোনো কথা বলতে পারল না।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ঘোমটা উন্মোচন ও প্রথম স্পর্শ
মধু আর দেরি করল না। দুই হাত বাড়িয়ে বকুলের মাথার সিল্কের ওড়নাটি আলতো করে পেছনে সরিয়ে দিল। ওড়না সরতেই প্রদীপের আলোয় ফুটে উঠল বকুলের অপরূপ মুখশ্রী। কপালে চন্দনের ফোঁটা, চোখে কাজল, আর ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক। লজ্জায় বকুলের গাল দুটো তখন জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠেছে। সে চোখ তুলে মধুর দিকে তাকাতেই পারছে না, চোখের পাতা দুটো নিচু করে রেখেছে।
মধু মন্ত্রমুগ্ধের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বকুলের থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে মুখটা একটু ওপরে তুলল।
"আজ তোমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রাজকন্যা লাগছে, বকুল," মধুর কণ্ঠস্বর আবেগে বুজে এলো।
বকুল এবার মধুর চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো চপলতা নেই, আছে অতল ভালোবাসা আর পরম নির্ভরতা। বকুল আলতো স্বরে বলল, "তুমি শুধু আমার দিকে এভাবেই তাকিয়ে থাকবে? আমার খুব লজ্জা করছে কিন্তু।"
মধু হেসে ফেলে বকুলের কপালের অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। তার উষ্ণ আঙুলের ছোঁয়া বকুলের কপালে লাগতেই বকুলের সারা শরীরে একটা চেনা শিহরন বয়ে গেল। মধু বকুলের কপালে নিজের ঠোঁট দুটি চেপে ধরল। এক দীর্ঘ, পবিত্র চুম্বনে দুজনের বাসর রাতের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো। বকুল চোখ বন্ধ করে সেই উষ্ণতা নিজের ভেতরে শুষে নিল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: খুনসুটি এবং উপহার
বাসর রাতের গাম্ভীর্য কাটাতে মধু এবার একটু দুষ্টুমি করার কথা ভাবল। সে খাট থেকে উঠে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি ছোট মখমলের বাক্স নিয়ে এলো। আবার বকুলের পাশে বসে বাক্সটি তার হাতে দিল।
"এটা কী?" বকুল চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল।
"খুলে দেখোই না," মধুর চোখে রহস্য।
বকুল বাক্সটি খুলতেই দেখল ভেতরে একটি চমৎকার, সূক্ষ্ম ডিজাইনের সোনার চেইন, যার লকেটে ছোট করে খোদাই করা আছে তাদের দুজনের নামের প্রথম অক্ষর—'M & B'।
বকুলের চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। "এটা এত সুন্দর! কখন বানাতে দিলে?"
"যেদিন আমাদের বিয়ের দিন ঠিক হয়েছিল, সেদিনই," মধু হাসল। "দাঁড়াও, আমি পরিয়ে দিই।"
বকুল ঘুরে বসল। মধু তার পিঠের ওপর থেকে ভারী বেনারসির আঁচলটা একটু সরিয়ে দিতেই বকুলের ফর্সা পিঠের ত্বক উন্মুক্ত হলো। মধুর হাতের আঙুলগুলো যখন বকুলের ঘাড়ের চামড়া ছুঁয়ে চেইনটা পরাচ্ছিল, তখন বকুল শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। মধু চেইনটা পরিয়ে দিয়ে বকুলের ঘাড়ে আলতো করে একটা কামড় দিল।
"আহ্! কী করছ, লাগবে তো!" বকুল কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে ঘুরে বসল।
"বাসর রাতে বউকে আদর না করলে পাপ হয়, জানো না?" মধু চোখ টিপে বলল।
বকুল এবার মুচকি হেসে মধুর পাঞ্জাবির বোতাম ধরে টানতে টানতে বলল, "তাই বুঝি? তা মহাশয়ের আর কী কী নিয়ম জানা আছে বাসর রাতের?"
মধুর বুকটা ধক করে উঠল বকুলের এই আকস্মিক চপলতায়। সে বকুলকে কোমরে হাত দিয়ে এক ঝটকায় নিজের আরও কাছে টেনে নিল। দুজনের দূরত্ব এখন শূন্য। বকুলের বুকের দ্রুত ওঠানামা মধুর বুকে অনুভূত হচ্ছিল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: প্রেমের গভীরতা ও নিবিড় আসক্তি
রাত যত গভীর হতে লাগল, ঘরের ভেতরের রোমান্টিকতা ততটাই ঘন হতে শুরু করল। জানালার বাইরে বাতাস বইছিল, আর রজনীগন্ধার সুবাস ঘরের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ছিল।
মধু বকুলের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এবার লজ্জার চেয়েও বেশি ছিল সমর্পণ। মধু বকুলের ভারী কানের দুল, গলার নেকলেস আর হাতের চুরির একে একে খুলে ড্রেসিং টেবিলে রেখে দিল। গহনাগুলো খোলার সময় বকুল যেন হালকা হয়ে উঠছিল।
"এই ভারী শাড়ি আর গহনা পরে তোমার কষ্ট হচ্ছে না?" মধু জিজ্ঞেস করল।
"একটু হচ্ছে," বকুল মাথা নিচু করে বলল।
"তাহলে এটা বদলে নাও। আমি ওপাশে তাকাচ্ছি," মধু ভদ্র ছেলের মতো বলতে চাইল।
কিন্তু বকুল মধুর হাতটা চেপে ধরল। "না, তাকাতে হবে না। তুমিই আমাকে সাহায্য করো।"
বকুলের এই কথায় মধুর ভেতরের সব নিয়ন্ত্রণ ভেঙে গেল। সে বকুলের বেনারসি শাড়ির আঁচলটা আলতো করে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল। লাল ব্লাউজের ফিতাটা খুলতেই বকুলের মসৃণ পিঠ প্রদীপের আলোয় ঠিকরে উঠল। মধু পরম আবেশে বকুলের পিঠে, ঘাড়ে এবং কাঁধে চুম্বনের বৃষ্টি নামাল। বকুল মধুর কাঁধ দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, তার মুখ থেকে একটি মৃদু তৃপ্তির আওয়াজ বের হয়ে এলো।
মধু বকুলকে বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দিল। ফুলের পাপড়িগুলো তাদের শরীরের নিচে পিষ্ট হয়ে আরও তীব্র সুবাস ছড়াতে লাগল। মধু বকুলের ওপরে ঝুঁকে এসে তার ওষ্ঠাধরে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এটি আর কোনো সাধারণ চুম্বন ছিল না; এটি ছিল দুটি আত্মার এক হয়ে যাওয়ার আদিম এবং পবিত্র আকুলতা। বকুলও তার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে মধুকে ফিরিয়ে দিল না, বরং তার গলা জড়িয়ে ধরে চুম্বনকে আরও গভীর করে তুলল।
ঘরের আলোটা মৃদু হতে হতে একসময় আবছা অন্ধকারে রূপ নিল। সেই অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল দুটি শরীরের ব্যাকুলতা, ফিসফিসানি, ভালোবাসার সোহাগ আর এক অপরূপ রোমান্টিক মিলন। রাত জেগে সাক্ষী রইল এক নতুন দম্পতির পুণ্যময় বাসর যাপনের।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ: প্রথম সকালের নতুন আলো
রাত কেটে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। জানালার পর্দা ভেদ করে ভোরের প্রথম সোনালি রোদ এসে পড়েছে বাসর ঘরের বিছানায়।
বকুল চোখ খুলল। তার সারা শরীরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি, কিন্তু মনে অপার্থিব আনন্দ। সে দেখল সে মধুর বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। মধুর একটি হাত তার কোমরে শক্ত করে জড়ানো, যেন ঘুমের মধ্যেও সে বকুলকে হারাতে চায় না। বকুল মধুর ঘুমন্ত, শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার মনে হলো, এই মানুষটির বুকে পৃথিবীর সব সুখ লুকিয়ে আছে।
বকুল আলতো করে মধুর গালে হাত বোলাল। মধুর মুখে তখনো ভোরের স্নিগ্ধতা। হাতের ছোঁয়া পেয়ে মধুর চোখ দুটো আস্তে আস্তে খুলল। বকুলকে নিজের বুকে এভাবে আবিষ্কার করে মধুর ঠোঁটে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল।
"শুভ সকাল, আমার বউ," মধু বকুলের কপালে আবার একটি আলতো চুমু খেল।
"শুভ সকাল, আমার স্বামী," বকুল লজ্জায় মধুর বুকে মুখ লুকাল।
বাইরে তখন পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে। বাসর ঘরের রজনীগন্ধাগুলো তখনো সুবাস ছড়াচ্ছে, তবে এখন আর তাতে রাতের উন্মাদনা নেই, আছে এক শান্ত, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের নিশ্চয়তা। মধু আর বকুল একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নতুন জীবনের প্রথম সূর্যোদয়কে স্বাগত জানাল। তাদের জীবনের নতুন খাতাটার প্রথম পাতা আজ এক অপূর্ব ভালোবাসার গল্পে লেখা হয়ে গেল।
গল্পটি আপনাদের কেমন লেগেছে জানাবেন।