Story

সুমনের বেকার জীবনের তৃতীয় খন্ড।

September 10, 2026

25
View

সুমনের ডায়েরির পাতাগুলো উল্টালে দেখা যাবে ব্যর্থতার এক দীর্ঘ তালিকা। গুগলের অ্যালগরিদম যখন তার সাধের ব্লগ সাইট আর এসইও প্রজেক্টগুলোকে এক নিমেষে সার্চ রেজাল্টের পাতালপুরীতে পাঠিয়ে দিয়েছিল, অনেকেই ভেবেছিল সুমন এবার চিরতরে দমে যাবে। চেনা-পরিচিত মানুষেরা আড়ালে হাসাহাসি করত, বলত গুগলের মতো বিশাল প্ল্যাটফর্ম যাকে ছুঁড়ে ফেলেছে, তার আর ডিজিটাল দুনিয়ায় কী করার আছে! কিন্তু সুমন অন্য ধাতুতে গড়া। সে জানত, গুগলে সফল হতে না পারা মানে জীবনের শেষ নয়। প্ল্যাটফর্ম বদলাতে পারে, কিন্তু তার ভেতরের জেদ আর পরিশ্রম করার মানসিকতা তো একই আছে। তাই গুগলের অধ্যায় চুকিয়ে সুমন এবার পা রাখল সম্পূর্ণ এক নতুন এবং অচেনা দুনিয়ায়—টিকটক।শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। ব্লগিংয়ের দুনিয়ায় সুমন অভ্যস্ত ছিল কিবোর্ডের বোতাম টিপে শব্দের পর শব্দ সাজাতে, ক্যামেরার সামনে আসার কোনো তাগিদ সেখানে ছিল না। কিন্তু টিকটক মানেই চোখের পলকে মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার খেলা। মাত্র পনেরো থেকে তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে দর্শককে আটকে রাখতে না পারলে স্ক্রিনের এক আঙুলের টোকাতেই ভিডিও হাওয়া। প্রথম দিন সুমন যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াল, তার হাত-পা কাঁপছিল। স্ক্রিপ্ট তৈরি থাকলেও মুখের ভাষা গুলিয়ে যাচ্ছিল বারবার। একটা পনেরো সেকেন্ডের ভিডিও রেকর্ড করতে তার পুরো একটা দিন লেগে গেল। এডিটিংয়ের সফটওয়্যারগুলো তার কাছে মনে হচ্ছিল এক গোলকধাঁধা। তবুও সে হাল ছাড়ল না। রাত জেগে ইউটিউব দেখে দেখে শিখল কীভাবে ট্রানজিশন দিতে হয়, কীভাবে কালার গ্রেডিং করতে হয় আর কোন সময়ে কোন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা মানানসই।প্রথম সপ্তাহে সুমন পর পর সাতটি ভিডিও আপলোড করল। প্রতিটা ভিডিওর পেছনে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটুনি। কিন্তু টিকটকের নিষ্ঠুর অ্যালগরিদম তাকে স্বাগত জানাল মাত্র দুইশো-আড়াইশো ভিউ দিয়ে। একে টিকটকের ভাষায় বলে ‘ভিউ জেল’। সুমন দেখল, তার চেনা কয়েকজন সেই ভিডিও দেখে উপহাস করে কমেন্ট করেছে, "গুগল থেকে শেষমেশ টিকটকার হলে নাকি?" সুমন সেই কমেন্টগুলো ডিলিট করল না, বরং সেগুলোকে স্ক্রিনশট নিয়ে নিজের ঘরের দেয়ালে সেঁটে রাখল। এটা তার জন্য প্রতিদিন সকালের জ্বালানি। সে বুঝতে পারল, শুধু ভালো ভিডিও বানালেই হবে না, বুঝতে হবে এই প্ল্যাটফর্মের ভাষা। সে দিনের পর দিন ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস করতে লাগল, দেখতে লাগল কেন একটা সাধারণ ভিডিও মিলিয়ন ভিউ পেয়ে যায়, আর কেন একটা তথ্যবহুল ভিডিও লোকে স্ক্রোল করে চলে যায়।সুমনের এই লড়াইয়ের তৃতীয় খণ্ডে এসে একটা বড় পরিবর্তন ঘটল তার ভাবনায়। সে চটকদার নাচ বা সস্তা কমেডির পেছনে না ছুটে নিজের আসল শক্তিকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিল। সে সিদ্ধান্ত নিল, সে টিকটকে শেয়ার করবে তার ব্যর্থতার গল্প। সে একটি সিরিজ শুরু করল যার নাম দিল "গুগল আমাকে যেভাবে হারিয়েছে এবং আমি যেভাবে ফিরে আসছি"। প্রথম ভিডিওতে সে কোনো ভণিতা না করে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি একজন ব্যর্থ ফ্রিল্যান্সার, গুগলে তিন বছর খেটে আমি শূন্য হাতে ফিরেছি। আজ থেকে আমি টিকটকে শূন্য থেকে শুরু করছি। দেখি এই অ্যালগরিদম আমাকে কতটা হারাতে পারে।" সুমনের গলার সেই সততা আর চোখের ভেতরের জেদ দর্শকদের মন ছুঁয়ে গেল। মানুষেরা স্ক্রোল করা থামিয়ে তার কথা শুনতে লাগল।ভিডিওটি আপলোড করার পর সুমন ফোনটা টেবিলে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার নোটিফিকেশন প্যানেল যেন পাগল হয়ে গেছে। একের পর এক লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের বন্যা ভেসে আসছে। সেই সিঙ্গেল ভিডিওটি রাতারাতি এক লাখ ভিউ পার করে ফেলেছে এবং তার অ্যাকাউন্টে যোগ হয়েছে হাজারো নতুন ফলোয়ার। কমেন্ট সেকশনে শত শত মানুষ তাকে উৎসাহ দিচ্ছে, অনেকেই লিখছে যে তারা নিজেরাও জীবনে এমন ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সুমনের গল্প তাদের নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দিচ্ছে। সুমন বুঝতে পারল, সে সঠিক পথটি খুঁজে পেয়েছে। মানুষ নিখুঁত জিনিস খোঁজে না, মানুষ খোঁজে সততা আর নিজের জীবনের সাথে মিল।তবে একটা ভিডিও ভাইরাল হওয়াই যে শেষ কথা নয়, তা সুমনের চেয়ে ভালো আর কে জানে! গুগলের দিনগুলোতে সে দেখেছে কীভাবে এক নিমেষে সব হারিয়ে যায়। তাই সে অহংকারী না হয়ে নিজের কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিল। সে প্রতিদিন নিয়ম করে ঠিক একই সময়ে ভিডিও দিতে লাগল। স্ক্রিপ্ট রাইটিং, লাইটিং আর ভয়েস ওভারের মান দিন দিন উন্নত করতে লাগল। কখনো কখনো ভিউ আবার কমে যেত, কখনো হয়তো একটা ভিডিওতে আশানুরূপ সাড়া মিলত না, কিন্তু সুমনের মন খারাপ হতো না। সে এখন আর ভিউয়ের সংখ্যার দিকে তাকায় না, সে তাকায় তার তৈরি হওয়া কমিউনিটির দিকে। যারা প্রতিদিন তার ভিডিওর নিচে এসে লেখে, "সুমন ভাই, আপনার আজকের ভিডিওটা দেখে নতুন করে কাজ শুরু করার শক্তি পেলাম।"আজ সুমন শুধু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর নয়, সে হাজারো হতাশ তরুণের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে সে হয়তো জায়গা করে নিতে পারেনি, কিন্তু মানুষের মনের সার্চ ইঞ্জিনে সে নিজের নামটা ঠিকই খোদাই করে নিয়েছে। টিকটকের এই রঙিন দুনিয়ায় সে হারিয়ে যায়নি, বরং নিজের সততা আর জেদকে টিকিয়ে রেখে প্রমাণ করেছে যে, চেষ্টা চালিয়ে গেলে কোনো প্ল্যাটফর্মই কাউকে আটকে রাখতে পারে না। সুমনের এই তৃতীয় খণ্ডের গল্পটি আসলে সফলতার গল্প নয়, এটি হলো পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর, ধুলোবালি ঝেড়ে নতুন করে লড়াইয়ের ময়দানে টিকে থাকার এক অনন্ত মহাকাব্য।

Comments

    Please login to post comment. Login