একজন বাবা। বুকের ভেতর হাজারো আতঙ্ক। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। ঘর নেই, উঠান নেই, নেই চেনা পথের কোনো চিহ্ন। তবুও তিনি থেমে নেই। গলা-সমান পানিতে দাঁড়িয়ে দুই হাতে শক্ত করে ধরে আছেন তাঁর সন্তানকে। কারণ তিনি জানেন—আজ যদি হাতটা ছুটে যায়, তবে হয়তো হারিয়ে যাবে তাঁর পুরো পৃথিবী।
এই দৃশ্য কোনো সিনেমার গল্প নয়। এটি আমাদের বাংলাদেশের বাস্তবতা। বর্ষা এলেই কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনী, নোয়াখালীসহ দেশের বহু অঞ্চলে এমন অসংখ্য দৃশ্য নীরবে জন্ম নেয়। ক্যামেরায় ধরা পড়ে কয়েকটি ছবি, কিন্তু হাজারো গল্প থেকে যায় অদেখা।
একজন বাবা হয়তো তিন দিন ধরে ঠিকমতো কিছু খাননি। তবুও সন্তানের মুখে এক মুঠো শুকনো খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিজের শরীর ভিজে কাঁপছে, কিন্তু সন্তানের গায়ে একটি শুকনো কাপড় জড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। স্রোত তাঁকে ঠেলে দিচ্ছে, তবুও তিনি হেরে যেতে রাজি নন। কারণ একজন বাবার কাছে নিজের জীবন নয়, সন্তানের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান।
বন্যা শুধু ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায় না। এটি মানুষের স্বপ্ন, সঞ্চয়, শৈশব, স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও কেড়ে নেয়। তারপরও মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। কারণ আশার নাম জীবন, আর সেই আশার সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো পরিবারের জন্য লড়ে যাওয়া মানুষগুলো।
আজ যে বাবা গলা পানিতে সন্তানকে বুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানকে বাঁচাচ্ছেন না—তিনি আমাদের মানবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছেন। তাঁর নীরব সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপদের সময় মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
আসুন, আমরা দুর্যোগকে শুধু খবর হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন হিসেবে দেখি। কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, সিলেট, ফেনী কিংবা বাংলাদেশের যেখানেই মানুষ বিপদে থাকুক, তাদের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করি। কারণ একটি দেশের শক্তি তার উঁচু ভবনে নয়, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসায়।
হয়তো সেই বাবার নাম আমরা কোনো দিন জানব না। ইতিহাসও তাঁকে মনে রাখবে না। কিন্তু তাঁর গলা-সমান পানিতে দাঁড়িয়ে সন্তানের হাত না ছাড়ার দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেবে—একজন বাবার ভালোবাসার গভীরতা কোনো নদীর গভীরতার চেয়েও বেশি।
