শেষ ভালোবাসা
বৃষ্টিভেজা এক বিকেলে বহু বছর পর আবার দেখা হলো আরিফ আর মায়ার। শহরের ছোট্ট সেই পুরোনো বইয়ের দোকানটা যেন এখনো তাদের ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় এখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত তারা।
আরিফ মৃদু হেসে বলল, "কেমন আছ?"
মায়া হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে আগের উজ্জ্বলতা ছিল না। "ভালো আছি। তুমি?"
"ভালো থাকার চেষ্টা করছি।"
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল, অথচ দুজনের বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো না-বলা অনুভূতির ভার যেন প্রতিটি শব্দকে আরও গভীর করে তুলছিল।
কলেজ জীবনে তাদের ভালোবাসার গল্পটা ছিল সবার ঈর্ষার কারণ। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা ভালোবাসার চেয়েও কঠিন হয়ে উঠেছিল। আরিফের পরিবারের দায়িত্ব, চাকরির সংগ্রাম আর মায়ার পরিবারের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে একদিন তারা আলাদা পথে হাঁটতে বাধ্য হয়। কেউ কাউকে দোষ দেয়নি, তবুও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
বছরের পর বছর কেটে গেছে। দুজনেই নিজের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবুও কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না।
বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে তারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। আকাশে তখনো হালকা বৃষ্টি পড়ছে।
মায়া হঠাৎ বলল, "জানো, আমি এখনো তোমার দেওয়া সেই নীল ডায়েরিটা রেখে দিয়েছি।"
আরিফ থমকে দাঁড়াল। "সত্যি?"
"হ্যাঁ। যখন খুব কষ্ট হয়, তখন ডায়েরিটার শেষ পাতাটা পড়ি। সেখানে তুমি লিখেছিলে—'যদি কোনো দিন আমরা হারিয়ে যাই, তবুও আমার শেষ ভালোবাসা তুমি হয়েই থাকবে।'"
আরিফের চোখ ভিজে উঠল। এত বছর পরও একটি বাক্য এতটা জীবন্ত থাকতে পারে, সে কখনো ভাবেনি।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মায়া ধীরে বলল, "জীবন আমাদের এক করতে পারেনি। কিন্তু তোমাকে ভুলতেও শেখায়নি।"
দূরে একটি গাড়ি এসে থামল। মায়ার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
বিদায়ের আগে আরিফ বলল, "একটা প্রশ্ন করতে পারি?"
"করো।"
"যদি আবার জীবন শুরু করার সুযোগ পেতে, তাহলে কী আমাকে বেছে নিতে?"
মায়া চোখের জল লুকিয়ে মৃদু হাসল।
"প্রথমবারও তোমাকেই বেছে নিয়েছিলাম, এবারও তোমাকেই বেছে নিতাম। শুধু চাইতাম, ভাগ্যটা যেন আমাদের বিরুদ্ধে না দাঁড়ায়।"
গাড়িটি ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। আরিফ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বৃষ্টির মধ্যে। তার মনে হলো, কিছু ভালোবাসা একসঙ্গে থাকার জন্য জন্মায় না; তারা জন্মায় মানুষকে সারাজীবন ভালোবাসার অর্থ শেখানোর জন্য।
সেদিন রাতে আরিফ বাড়ি ফিরে পুরোনো একটি বাক্স খুলল। সেখানে এখনো যত্ন করে রাখা ছিল মায়ার লেখা একটি চিঠি। শেষ লাইনে লেখা ছিল—
"ভালোবাসার শেষ হয় না। শেষ হয় শুধু একসঙ্গে পথ চলা। যে মানুষটিকে সত্যিকারের ভালোবাসা যায়, সে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটাতেই থেকে যায়।"
আরিফ চিঠিটা বুকে চেপে চোখ বন্ধ করল। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু তার মনে আর কোনো অভিযোগ নেই। কারণ সে বুঝে গেছে, জীবনের শেষ ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না—সে রয়ে যায় স্মৃতিতে, প্রার্থনায়, আর হৃদয়ের গভীরতম কোণে, যেখানে সময়ও কোনোদিন পৌঁছাতে পারে না।