অশ্রুভেজা পাসপোর্ট এবং একটি জীবন্ত লাশের গল্প১
. ঘরে ফেরার আনন্দহযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের দেয়ালটা পার হতেই করিম মিয়ার বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস হালকা হয়ে এলো। দীর্ঘ দশটি বছর। এই দশ বছরে মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমির তপ্ত বালি আর নির্মম রোদ ছাড়া করিম মিয়া আর কিছুই দেখেনি। বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে প্রতিটা মাস শেষে বুকভরে টাকা পাঠিয়েছে দেশে। সেই টাকায় আজ গ্রামে মাথা গোঁজার মতো পাকা বাড়ি হয়েছে, ছোট ভাইদের পড়াশোনা আর ব্যবসার পুঁজি হয়েছে, বোনের বিয়ে হয়েছে ধুমধাম করে। নিজের স্ত্রী আর দুই সন্তানের মুখে ফুটেছে সচ্ছলতার হাসি।সংসারের বড় ছেলে হিসেবে করিম মিয়া নিজের দায়িত্ব শতভাগ পালন করেছে। এবার সে চিরতরে দেশে ফিরে এসেছে। প্লেন থেকে নামার সময় তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বুঝি সে-ই। বিমানবন্দরের বাইরে আসতেই তাকে জড়িয়ে ধরল তার ছোট ভাই আর তেরো বছরের ছেলেটা। করিমের চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।বাড়িতে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মতো কাটল। মা নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াচ্ছেন, বাবা চশমা জোড়া চোখে দিয়ে করিমের মুখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছেন। স্ত্রী জমিলা নতুন শাড়ি পরে করিমের সেবা-যত্নে ব্যস্ত, আর ছেলে-মেয়ে দুটো বাবার চারপাশ থেকে সরতেই চায় না। করিম মিয়া ভাবল, জীবনের বাকি সময়টা এবার নিজের দেশে, নিজের পরিবারের সাথে শান্তিতে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।২. মোহভঙ্গ ও নির্মম বাস্তবতাছুটির আমেজ কেটে যেতেই করিম মিয়া একদিন রাতে খাবার টেবিলে সবার উদ্দেশ্যে নিজের মনের কথাটা প্রকাশ করল। সে বলল, "দশটা বছর তো কম খাটলাম না। শরীরটাও আর আগের মতো নাই। কোমরের ব্যথাটা ইদানীং খুব ভোগায়। লেবারের কাজ করার মতো শক্তি আর শরীরে কুলায় না। যা টাকা পাঠাইছি, তা দিয়ে তো বাড়ি-জমি সবই হইছে। এবার ভাবতাছি আর বিদেশে যামু না। দেশেই ছোটখাটো কোনো ব্যবসা বা চাষবাস করে বাকি জীবনটা তোমাদের সাথে কাটাইয়া দিমু।"কথাটা শেষ হতেই পুরো খাবার টেবিলে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। যেন এক বালতি বরফ জল ঢেলে দেওয়া হলো সবার মাথায়। করিম দেখল, মুহূর্তের মধ্যে মা-বাবা, ভাই আর স্ত্রীর মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। সবার মুখগুলো যেন কালো মেঘে ঢেকে গেল। কেউ আর কোনো কথা বাড়াল না, চুপচাপ খাওয়া শেষ করে যে যার ঘরে চলে গেল।পরের কয়েকটা দিন করিমের কাছে মনে হতে লাগল সে এক অচেনা জগতে বাস করছে। ঘরের পরিবেশটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। ফিসফিসানি, গোপন আলোচনা আর অবহেলার এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হলো তার চারপশে। একদিন দুপুরে করিম ঘরের পেছনে গিয়ে শুনতে পেল ছোট ভাই আর জমিলা কথা বলছে।ছোট ভাই বলছে, "ভাইজান যদি দেশে থাইকা যায়, তবে আমার নতুন ব্যবসার বাকি টাকাটা কে দেবে? তাছাড়া প্রতি মাসে যে মোটা অঙ্কের টাকা আসত, সেটা বন্ধ হইলে তো চলা মুশকিল।"জমিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমিও তো ভাবতাছি। দেশে থাইকা ছোটখাটো ব্যবসা করলে কি আর বিদেশের মতো টাকা আসবে? ছেলেমেয়ের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের খরচ, আমার গয়নাগাটি, সমাজের মানুষের কাছে সম্মান—সব তো ওনার বিদেশের টাকার জন্যই। উনি দেশে বসে থাকলে আমাদের চলবে কেমনে?"কথাগুলো তীরের মতো এসে বিঁধল করিমের বুকে। সে বুঝতে পারল, এই পরিবার তাকে ভালোবাসে না, ভালোবাসে তার পাঠানো রেমিট্যান্সকে। সে আসলে একজন মানুষ নয়, তাদের কাছে সে টাকা কামানোর একটা মেশিন মাত্র। মেশিন বিকল হয়ে দেশে বসে থাকবে, এটা কেউ মেনে নিতে পারছে না।৩. অন্তর্দহন ও চরম সিদ্ধান্তকরিমের মনে হলো তার চারপাশের আকাশটা ভেঙে পড়েছে। রাতে বিছানায় শুয়ে সে এপাশ-ওপাশ করে। যে শরীরের চামড়া পুড়িয়ে সে পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, আজ সেই শরীরটা একটু জিরিয়ে নিতে চাইছে বলে সে সবার কাছে বোঝা হয়ে গেল! নিজের মনেই সে বিড়বিড় করে বলল, "পরিবার যেখানে খুশি নয়, সেখানে আমার আর থেকে কি লাভ? জীবনটা হয়তো এভাবেই আমার শেষ হয়ে যেতে পারে। আমি করিম মিয়া, আমার নিজের বলতে কি কোনো অস্তিত্ব নেই?"পরদিন সকালে করিমের ক্লান্ত ও মলিন মুখ দেখে বৃদ্ধ বাবা-মা খুব কষ্টে বলে উঠলেন, "বাবা করিম, তুই দেশে পারলে কিছু একটা কর। তোর শরীরের দিকে চেয়েই আমরা কইতাছি, বেশি কিছু পারলে কর। শরীর ভালো না থাকলে বিদেশে যাওয়ার দরকার নাই।"মায়ের চোখে জল, বাবার গলায় আকুতি থাকলেও করিম তাদের চোখের পেছনের অসহায়ত্ব এবং আর্থিক অনটনের ভয়টা স্পষ্ট দেখতে পেল। সে জানত, মুখে তারা যা-ই বলুক না কেন, বিদেশের টাকা ছাড়া এই রাজকীয় সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। সবার চোখের এই নীরব দাবি করিমকে আবার এক কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "না মা, দেশে ভালো কিছু করা সম্ভব না। আমি আবার বিদেশেই চলে যামু।"কথাটা শোনার সাথে সাথেই ঘরের থমথমে ভাবটা যেন এক নিমেষে কেটে গেল। স্ত্রীর মুখে স্বস্তির আলো দেখা গেল, ছোট ভাই আনন্দের সাথে তার টিকিট ও পাসপোর্টের খোঁজ নিতে শুরু করল। করিমের বুকের ভেতর তখন একখণ্ড পাথর জমে বরফ হয়ে গেছে।৪. শেষ বিদায় ও বিমানবন্দরের সেই দরজাআবারও সেই চেনা পথ। তবে এবার ফেরার আনন্দ নেই, আছে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এক বুক হাহাকার। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় করিমের মনে হলো, সে যেন তার নিজের জানাজায় নিজেই হেঁটে যাচ্ছে। কেউ তাকে আটকানোর জন্য জোর করল না, শুধু লৌকিকতার কিছু কান্না আর ভালো থাকার উপদেশ।আজ করিম মিয়া আবারও দাঁড়িয়ে আছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তিন নম্বর টার্মিনালের বহির্গমন দ্বারে। হাতে তার পাসপোর্ট, ওপরে লাগেজ আর বুকে এক মহাসমুদ্র কষ্ট। পেছনে তার পরিবার দাঁড়িয়ে আছে বিদায় জানাতে। তারা হাত নাড়ছে, হাসার চেষ্টা করছে। কিন্তু করিমের চোখ আজ অন্ধ হয়ে গেছে।সে যখন কাচের ওই শেষ দরজাটার দিকে তাকাল, যেখানে লেখা "শুধু যাত্রীদের জন্য প্রবেশাধিকার", তখন তার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। তার মনে হতে লাগল, এই দরজাটা কোনো বিমানবন্দরের দরজা নয়, এটা যেন এক জীবন্ত গোরস্তানের প্রবেশপথ।করিম মিয়া মনে মনে ভাবল, "এই দরজা দিয়ে গত ১০ বছর আগে যখন গিয়েছিলাম, তখন মনে আশা ছিল। আজ যখন যাচ্ছি, তখন আমি ভেতর থেকে মরে গেছি। এই দরজা দিয়ে আমি আর কোনোদিন জ্যান্ত অবস্থায় ফিরে নাও আসতে পারি। কফিনবন্দি হয়ে, কাঠের বাক্সে লাশে পরিণত হয়ে হয়তো একদিন ফিরব এই বিমানবন্দরেই। তখন হয়তো আমার এই পরিবারটি আমার লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদবে, কিন্তু সেই কান্না কি আমার এই জীবন্ত মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণার হবে?"একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখের জলটুকু আড়ালে মুছে করিম মিয়া তার পাসপোর্টটা ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে তুলে দিল। কাচের ওপারে হারিয়ে গেল এক রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রাণহীন দেহ, যার আত্মাটা অনেক আগেই নিজের দেশে, নিজের পরিবারের কাছে খুন হয়ে গেছে। করিম মিয়ার নিয়া জীবনের গল্প কাহিনী লিখতে গিয়ে আমার জীবনে কষ্টের অনেক কথাই মনে পড়ে গেল। একবার মনে করেছিলাম গল্পটি আর লিখব না তারপরও লিখে নিলাম যে মানুষের জীবনে হয়তো এগুলো থেকে পরিবর্তন হয়ে আসতে পারে। ধন্যবাদ