জানালার কাচ বেয়ে বৃষ্টির জলধারা নেমে আসছে। বাইরের আকাশটা মেঘে মেঘে অন্ধকার, ঠিক যেন এক টুকরো স্মৃতির ক্যানভাস। ১০ তলার এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিশাল কাচের জানালার পাশে আরামকেদারায় বসে আছেন ৮২ বছর বয়সী জসিম মিয়া। আজ তিনি জীবনের আশি দশক পেরিয়ে বিরাশি বছরে পা দিলেন। বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দে আজ তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে ফেলে আসা এক দীর্ঘ, বৈচিত্র্যময় জীবনের গল্প। জীবনের হিসাব-নিকাশ মেলাতে মেলাতে আজ তাঁর মনে কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো আফসোস নেই। নিচে তাঁর জীবনের সেই ধারাবাহিক মহাকাব্যিক গল্পটি তুলে ধরা হলো:প্রথম অধ্যায়: শৈশবের স্মৃতি ও হঠাৎ বদলে যাওয়া জীবন১০ তলার এই উঁচুতলা থেকে নিচের রাস্তাঘাটে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে জসিম মিয়ার মনে হলো, এই তো সেদিন তিনি খাতা-কলম বগলে নিয়ে গ্রামের কাদা-মাটি মাখা রাস্তা দিয়ে স্কুলে যাচ্ছিলেন। শৈশব আর কৈশোরের সেই সোনালী দিনগুলো যেন পলকেই কেটে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল তাঁর তরুণ বয়সের সেই দিনটি, যখন তিনি কঠোর পরিশ্রম করে বিএ পাস করলেন।পড়ালেখার প্রতি জসিম মিয়ার ছিল প্রচণ্ড অনুরাগ। বিএ পাস করার পর পরই তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করবেন। উচ্চশিক্ষার সেই রঙিন স্বপ্ন চোখে নিয়ে তিনি মাস্টার্সে ভর্তিও হয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। ঠিক সেই সময়েই সরকারি এক অফিসের প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি পদে তাঁর চাকরি হয়ে যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে চাকরির সুযোগটি হাতছাড়া করার উপায় ছিল না।চাকরি পাওয়ার আনন্দ কাটতে না কাটতেই জীবনের আরেকটি বড় মোড় চলে আসে। রক্ষণশীল ও দূরদর্শী বাবা জসিম মিয়াকে ডেকে বললেন, "সংসারের হাল যেহেতু ধরেছিস, এবার সংসারী হ।" জসিম মিয়া আরও পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন, মাস্টার্স পরীক্ষাটা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবার জোর আর পারিবারিক কর্তব্যের চাপে পড়ে তাঁকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো। ফলে, মাস্টার্স পরীক্ষাটা আর দেওয়া হলো না। চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুয়ার, আর কাঁধে চেপে বসল এক বিশাল সংসারের দায়িত্ব। শুরু হলো জীবনের কঠিন ঘানি টানা।দ্বিতীয় অধ্যায়: সংসারের ঘানি ও এক বুক স্বপ্নবিয়ের পর জীবনটা যেন এক এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো ছুটতে লাগল। সরকারি অফিসের সাধারণ বেতনের চাকরি, বৃদ্ধা মা, ভাই-বোন এবং নতুন স্ত্রী—সবাইকে নিয়ে টেনেটুনে সংসার চালাতে হতো জসিম মিয়াকে। নিজের পড়াশোনার স্বপ্ন অধরা থেকে গেলেও, তিনি মনের গভীরে একটি নতুন প্রতিজ্ঞা বুনেছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবতেন, "আমি নিজে উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পারিনি তো কী হয়েছে? আমার সন্তানদের আমি পৃথিবীর সেরা শিক্ষায় শিক্ষিত করব।"সংসারের হাজারো টানাপোড়েনের মধ্যেও জসিম মিয়ার ঘরে একে একে জন্ম নিল দুটি পুত্রসন্তান—রহিম এবং করিম। ছেলেদের জন্মের পর জসিম মিয়ার জীবনের লক্ষ্য আরও সুনির্দিষ্ট হয়ে গেল। তিনি নিজের আরাম-আয়েশ, শখ-আহ্লাদ সবকিছু বিসর্জন দিলেন। দিন-রাত এক করে অফিসের কাজ, ওভারটাইম আর সততার সাথে উপার্জনের চেষ্টা করে চললেন শুধু সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য। তাঁর মনে একটাই জেদ ছিল, ছেলেদের বিশ্বের বড় বড় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করাতে হবে।তৃতীয় অধ্যায়: অবসরের ক্রান্তিকাল ও জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তসময় কারও জন্য থমকে থাকে না। জসিম মিয়ার বিয়ে করতে কিছুটা দেরি হয়েছিল, যার কারণে সন্তানেরা যখন বড় হয়ে উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাল, ঠিক সেই সময়েই জসিম মিয়ার বয়স ষাট বছর পূর্ণ হলো। একদিন সকালে অফিসে গিয়ে তিনি দেখলেন, তাঁর টেবিলে রাখা সরকারি রিটায়ারমেন্টের (অবসর) কাগজ।চাকরি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর জসিম মিয়ার হাতে এককালীন কিছু পেনশনের টাকা এল। মধ্যবিত্ত জীবনের দীর্ঘদিনের একটা লালিত স্বপ্ন ছিল—এই অবসরের টাকাটা দিয়ে নিজের একটা স্থায়ী বাড়ি তৈরি করবেন। যেখানে তিনি তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তান, ভাই-বোন এবং বৃদ্ধা মাকে নিয়ে একসাথে সুখে-শান্তিতে শেষ জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। ইট-পাথরের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই, যা হবে তাঁদের নিজেদের।কিন্তু ঠিক সেই সময়েই এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়াল তাঁর জীবন। রহিম এবং করিম অত্যন্ত মেধাবী ছিল। তারা দুজনেই বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য আংশিক স্কলারশিপ (বৃত্তি) পেল। কিন্তু আংশিক বৃত্তি পেলেও বাকি খরচ, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং পড়াশোনার অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের জন্য এক বিশাল অঙ্কের টাকার প্রয়োজন ছিল।জসিম মিয়া এক চরম ধর্মসংকটে পড়লেন। একদিকে তাঁর জীবনের শেষ সম্বল, অবসরের টাকা দিয়ে মাথা গোঁজার স্বপ্ন—একটি নিশ্চিত নিরাপদ বাড়ি। অন্যদিকে দুই ছেলের বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ানোর অবারিত সুযোগ। সেদিন রাতে জসিম মিয়া ঘুমাতে পারেননি। নিজের স্বপ্নের বাড়ি নাকি ছেলেদের ভবিষ্যৎ?অবশেষে জসিম মিয়ার ভেতরের দূরদর্শী পিতা জয়ী হলেন। তিনি নিজের সর্বস্ব, সেই অবসরের কানাকড়ি পর্যন্ত বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাড়ি বানানোর স্বপ্ন চিরতরে কোরবানি দিয়ে, সমস্ত টাকা ছেলেদের হাতে তুলে দিলেন এবং রহিম ও করিমকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। অনেকে তখন তাঁকে বোকা বলেছিল, মাথা গোঁজার ছাদ না বানিয়ে টাকা বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমালোচনা করেছিল। কিন্তু জসিম মিয়া তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।চতুর্থ অধ্যায়: চাকার আবর্তন ও সাফল্যের জোয়ারবিদেশে গিয়ে বাবার ত্যাগের মর্যাদা রাখতে ভুলেনি রহিম আর করিম। তারা জানত, তাদের বাবা নিজের শেষ সম্বলটুকু বাজি রেখে তাদের পাঠিয়েছেন। দিন-রাত এক করে পড়াশোনা শেষ করে তারা দুজনেই উচ্চশিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করল।শিক্ষা শেষ করে রহিম ও করিম দেশপ্রেমের টানে আবার বাংলাদেশে ফিরে এল। তারা শুধু চাকরিজীবী হয়ে থাকল না, বরং নিজেদের মেধা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা ও বাণিজ্যে হাত দিল। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা আর আধুনিক শিক্ষার মেলবন্ধনে ব্যবসা অল্প দিনেই ফুলে-ফেঁপে উঠল।আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জসিম মিয়ার সেই দুই সন্তান দেশের সফল শিল্পপতিদের অন্যতম। আজ তাদের গাড়ি, বাড়ি, ধন-সম্পদ ও প্রতিপত্তির কোনো অভাব নেই। জসিম মিয়াকে আর ভাঙা ঘরে থাকতে হয় না, আজ তিনি ১০ তলার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিশাল জানালার পাশে বসে রাজকীয় জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর ভাই-বোন, পরিবার সবাই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত।পঞ্চম অধ্যায়: হিসাবের খাতা ও চিরশান্তির বিদায়বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। কাচের গায়ে জলবিন্দুগুলো একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে। জসিম মিয়া একমুখ তৃপ্তির হাসি নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। আজ তিনি জীবনের গভীর এক সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছেন।তিনি মনে মনে ভাবলেন, "সেদিন যদি আমি অবসরের টাকাটা দিয়ে একটা ইটের বাড়ি তৈরি করতাম, তবে আজ হয়তো এই ১০ তলার রাজপ্রাসাদে বসা হতো না। সন্তানরা হয়তো দেশের সাধারণ কোনো চাকরিতেই আটকে থাকত। বাড়ি তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শিক্ষা এমন একটি জিনিস যা জীবনে একবার খাঁটি উপায়ে করিয়ে দিলে, উন্নতির চাকা চিরকালের জন্য ঘুরতেই থাকে। সেই চাকা আজ আমার পরিবারকে সমাজের শীর্ষস্থানে নিয়ে এসেছে।"৮২ বছর বয়সে এসে আজ জসিম মিয়ার মনে হচ্ছে, তাঁর জীবনের সব দায়িত্ব পূর্ণ হয়েছে। একজন মানুষ হিসেবে, একজন বাবা হিসেবে তিনি শতভাগ সফল। তাঁর শরীর আজ ক্লান্ত, চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে আসছে। বৃষ্টির এই মধুর শব্দ শুনতে শুনতে তাঁর মনে হলো, আজ যদি তাঁর মৃত্যুও হয়, জসিম মিয়ার মনে বিন্দুমাত্র কোনো আফসোস বা আক্ষেপ থাকবে না। তিনি এক বুক শান্তি আর সাশা পৃথিবীর বুকে রেখে গেলেন শিক্ষার এক চিরন্তন ও অমোঘ সত্যের গল্প।জীবনের ঘূর্ণিপাক: জসিম মিয়ার এক সার্থক জীবনের মহাকাব্য। ধন্যবাদ।