২০২৮ সালের এক শীতের বিকেল।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছটা আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। শুধু গাছটার নিচে বসে থাকা মানুষগুলো বদলে গেছে।
সেজুতি ধীরে ধীরে হাঁটছিল।
হাসপাতালে আসার ইচ্ছে ছিল না। তবু আজ একটা মেডিকেল সেমিনারের আমন্ত্রণ এড়াতে পারেনি।
গেট পেরোতেই চোখ পড়ল সামনের ফুলের বাগানে, প্রজাপতির দিকে।
একটা হলুদ-কালো প্রজাপতি ফুলের ওপর বসে আছে।
অকারণেই তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটল।
ইশতিয়াক বলত,
"প্রজাপতিদের জীবন খুব সুন্দর মনে হয়, তাই না? অথচ ওরা জন্মের পর থেকে শুধু বাঁচার চেষ্টা করে। সুন্দর হওয়াটা বিলাসিতা না, কখনো অভিশাপ।"
সেদিন সেজুতি হেসে বলেছিল,
"তুমি সবকিছুর মধ্যে এত দুঃখ খুঁজে পাও কীভাবে?"
ইশতিয়াক উত্তর দেয়নি।
আজ আট বছর পরে দাঁড়িয়ে সেজুতির মনে হলো, উত্তরটা সে অনেক দেরিতে বুঝেছে।
কিছু মানুষ নিজের জন্য ঘর বানাতে পারে না।
সারাজীবন অন্যের ঘর বানিয়েই কেটে যায়।
ঘরানির নিজের ঘরে চাল নেই
...
এপ্রিল, ২০২০।
করোনার কারণে পুরো শহর অস্বাভাবিক নীরব।
মাস্ক পরা মানুষগুলোও যেন দূরত্ব বজায় রাখার চেয়ে ভয়টাকেই বেশি আঁকড়ে ধরেছে।
ইশতিয়াক আহমেদ মুখে মাস্ক, হাতে একটা বাদামি ফাইল।
ফাইলের ভেতরে তিন মাসের জেগে থাকা রাত।
""ওডেসি: মেডিকেল ভর্তি প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ গাইড।"
একশো ছাপ্পান্ন পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি।
সিঁড়ি বেয়ে উঠে সে ঢুকল "প্রজ্ঞা প্রকাশনী"-তে।
ছোট্ট অফিস।
বইয়ের গন্ধ।
দেয়ালে নতুন বইয়ের পোস্টার।
ডেস্কের ওপাশে বসে থাকা মানুষটা চশমার ওপর দিয়ে পাণ্ডুলিপিটা উল্টেপাল্টে দেখলেন।
খায়রুল আলম।
প্রকাশক।
দশ মিনিট ধরে তিনি একটাও কথা বললেন না।
ইশতিয়াক শুধু অপেক্ষা করছিল।
তার মাথায় বারবার একই হিসাব ঘুরছিল।
অগ্রিম যদি চল্লিশ হাজারও দেয়...
বাবার তিন মাসের ফিজিওথেরাপি।
মায়ের সেলাই মেশিন।
নাবিলার কোচিং।
হয়তো কিছু টাকা বেঁচেও যাবে।
প্রকাশক ফাইলটা বন্ধ করলেন।
শান্ত গলায় বললেন,
— তুমি মেডিকেলের ছাত্র?
— জি।
— কোন ইয়ারে?
— তৃতীয় বর্ষ।
তিনি মাথা নাড়লেন।
— লেখা খারাপ না।
ইশতিয়াকের বুকের ভেতর আশাটা একটু নড়ে উঠল।
— কিন্তু...
বাংলা ভাষায় "কিন্তু" শব্দটার মতো নিষ্ঠুর শব্দ খুব কম আছে।
খায়রুল আলম চেয়ারে হেলান দিলেন।
— বাজারে মেডিকেল ভর্তি গাইডের অভাব নেই। তোমার বই আলাদা কিছু দিচ্ছে না।
ইশতিয়াক চুপ।
— আর একটা কথা বলি?
— জি...
— লেখক হতে চাইলে গাইডবই দিয়ে শুরু করো না। আর গাইডবই লিখতে চাইলে লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিখো না। দুইটার বাজার আলাদা।
কথাগুলো খুব শান্তভাবে বলা।
তবু ইশতিয়াকের কানে সেগুলো হাতুড়ির মতো লাগছিল।
সে শেষবার জিজ্ঞেস করল,
— তাহলে...?
— দুঃখিত।
এই মুহূর্তে আমরা বইটা নিচ্ছি না।
ব্যস।
একটা শব্দও বেশি নয়।
ইশতিয়াক ধীরে ধীরে পাণ্ডুলিপিটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দাঁড়াল।
মুখে হাসি আনার চেষ্টা করল।
হলো না।
— ধন্যবাদ।
বাইরে বেরিয়ে দরজাটা টেনে বন্ধ করতেই মনে হলো, আজ শুধু একটা বই না—আরও কিছু ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রকাশনীর সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মোবাইলটা বেজে উঠল।
মা।
— হ্যালো, মা।
— বাবা, তুই কোথায়?
— বাইরে।
— ডাক্তার বলছে, তোর বাবার ওষুধটা আজই আনতে হবে। পুরোনোটা শেষ।
ইশতিয়াক চোখ বন্ধ করল।
পকেটে হাত দিল।
একটা পাঁচশ টাকার নোট।
আর কিছু খুচরা।
ওষুধের দাম বারোশো।
সে ঠোঁট কামড়ে বলল,
— ঠিক আছে মা... আমি ব্যবস্থা করছি।
ফোনটা কেটে গেল।
কীভাবে ব্যবস্থা করবে, সে জানে না।
তবু বলল।
কারণ মায়েরা সন্তানের অসহায়ত্ব শুনতে পারে না।
...
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল।
করিডোরে ঢুকতেই কেউ পেছন থেকে ডাকল,
— এই যে, মিস্টার হুতুম!
ইশতিয়াক ফিরে তাকাল।
মেয়েটা মুখে মাস্ক পরে আছে।
তবু চোখ দুটো দেখে চিনতে ভুল হলো না।
সেজুতি।
তাদের ব্যাচের সবচেয়ে চঞ্চল মেয়ে।
হাতে দুটো আইসক্রিম।
একটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— নাও।
— কেন?
— কেন ব্যাচমেট একজন আরেকজনকে ট্রিট দিতে পারে না??
— কিসের ট্রিট?
সেজুতি ভ্রু কুচকে গেল, বোঝাই যাচ্ছে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।
ইশতিয়াক হালকা হেসে বলল,
— আমি আইসক্রিম খাই না।
— মিথ্যা।
— কীভাবে বুঝলে?
— যে মানুষ না খেয়ে থাকে, সে "খাই না" বলে। আর যে মানুষ খেতে চায় না, সে বলে "ইচ্ছা করছে না।"
কথাটা বলে সেজুতি নিজের আইসক্রিমে কামড় দিল।
ইশতিয়াক প্রথমবার মেয়েটার দিকে একটু মন দিয়ে তাকাল।
কী আশ্চর্য!
একজন মানুষ এত সহজভাবে অন্যের কষ্ট পড়ে ফেলতে পারে?
সেজুতি আবার বলল,
— শোনো, যদি কোনোদিন খুব খারাপ লাগে... আমাকে বলতে পারো।
ইশতিয়াক উত্তর দিল না।
শুধু দূরে উড়ে যাওয়া একটা হলুদ প্রজাপতির দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রজাপতিটা কয়েক সেকেন্ড উড়ল।
হঠাত একটি কাক ঝাঁপটা দিয়ে পারজাপতিতা ধরে নিয়ে উড়ে গেল।
ইশতিয়াক খুব আস্তে বলল,
— সুন্দর জিনিসগুলোর বাঁচাটাও বড় কঠিন।
সেজুতি শুনেছিল।
কিন্তু তখনও সে বুঝতে পারেনি—
ছেলেটা আসলে কিসের কথা বলছে।