Posts

গল্প

মধ্যবিত্তের যুদ্ধজয়প্রথম ধাপ।

July 21, 2026

Shafin pro

6
View

ইটের খাঁচায় স্বপ্নের বুনন: একটি মধ্যবিত্তের যুদ্ধজয়প্রথম ধাপ: স্বপ্নের বীজ ও তিন কাঠার ক্যানভাসবুকের ভেতর বছরের পর বছর ধরে একটা পাথর চেপে বসে ছিল। পাথরটার নাম—'ভাড়াটিয়া'। ঢাকার বুকে প্রতি মাসের এক তারিখ মানেই ছিল একটা আতঙ্কের নাম। বাড়িওয়ালার খিটখিটে মেজাজ, পানির বিল, গ্যাসের বিল নিয়ে খোঁচাখোঁজি আর কথায় কথায় "ঘর ছেড়ে দিন" বলে হুমকি দেওয়া। কম আয়ের চাকুরিজীবী আসিফ সাহেবের জীবনে এর চেয়ে বড় কোনো অভিশাপ ছিল না। নিজের বলতে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকলে যে সমাজে কোনো সম্মান থাকে না, সেটা তিনি হাড়েমাহাড়েই টের পেয়েছিলেন। বহু কষ্টে, জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, প্রফেশনাল লাইফের গ্র্যাচুইটির টাকা আর গ্রামের সামান্য জমি বিক্রি করে অবশেষে ঢাকার এক কোণে তিন কাঠার একটা নিরেট মাটির টুকরো কিনতে পেরেছিলেন।জমিটার একটা বড় সুবিধা ছিল—সামনে বেশ প্রশস্ত রাস্তা। আসিফ সাহেব যখন প্রথমবার জমিটির সামনে দাঁড়ালেন, বুকভরে শ্বাস নিলেন। মনে মনে ভাবলেন, "যাক, বড় রাস্তা যেহেতু আছে, ইট-বালু-রডের ট্রাক সরাসরি এসে নামবে। ক্যারিং বা লেবারদের মাথায় করে বহুদূর মালামাল টানার খরচটা অন্তত বাঁচবে।" এই ভেবে তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। প্ল্যান করলেন—আপাতত পাঁচতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে একটি দুই ইউনিটের আরসিসি (RCC) ফ্রেম স্ট্রাকচারের বাড়ি করবেন। নিচতলায় থাকবে গাড়ি পার্কিং আর ওপরের তলাগুলোয় থাকবে ফ্ল্যাট। নিজেরা একটা ইউনিটে থাকবেন, বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে ঋণের বোঝা টানবেন। কিন্তু তিনি তখনো জানতেন না, এই প্রশস্ত রাস্তার সুবিধাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় মানসিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।দ্বিতীয় ধাপ: মাস্তানদের থাবা ও প্রশস্ত রাস্তার অভিশাপবিল্ডিংয়ের নকশা পাস করিয়ে যেদিন আসিফ সাহেব পাইলিং এবং ফাউন্ডেশনের ঢালাইয়ের কাজ শুরু করতে গেলেন, সেদিন থেকেই নাটকের শুরু। প্রশস্ত রাস্তা দেখে এলাকার মাস্তান ও তথাকথিত 'ভাই'দের নজর পড়ল তার ওপর। বড় রাস্তা মানেই বড় শিকার। কাজের প্রথম দিন সকালেই কয়েকজন যুবক এসে সাইটে দাঁড়াল। তাদের মুখে পানের দাগ, চোখে হিংস্র চাউনি।"চাচা, এলাকায় নতুন বাড়ি তুলতেছেন, আমাদের সাথে তো যোগাযোগ করেন নাই?"—দলের লিডার সোহেল ঠান্ডা গলায় বলল।আসিফ সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, "বাবা, আমি তো সরকারি ছোট চাকরি করতাম। জমানো টাকা দিয়ে কোনোমতে শুরু করছি...""ঐসব কান্নাকাটি অন্য জায়গায় করবেন। পাঁচতলা ফাউন্ডেশন দিচ্ছেন, মোটা টাকা লাগবে। পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে এখানে এক বস্তা সিমেন্টও আনলোড হবে না।"আসিফ সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এত টাকা তিনি কোথায় পাবেন? তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেন। ব্যস, শুরু হলো গ্যাঞ্জাম। পরদিন রাতে যখন রড আর সিমেন্টের বড় ট্রাক এল, মাস্তানেরা রাস্তার মোড়ে ট্রাক আটকে দিল। চালককে মারধর করে বলা হলো, "এই রাস্তায় ট্রাক ঢুকানো যাবে না। জ্যাম লাগবে।" অথচ রাস্তাটি ছিল যথেষ্ট চওড়া। শুরু হলো চরম হট্টগোল। এলাকার মানুষের ঘুম ভেঙে গেল। আসিফ সাহেব মাঝরাতে পায়ে ধরে মাস্তানদের অনুনয়-বিনয় করলেন। সেই রাতে পুলিশ ডাকলেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। উল্টো দিনের পর দিন মালামাল রাস্তায় পড়ে থেকে নষ্ট হতে লাগল, অথচ তিনি সাইটে নিতে পারছিলেন না। অবশেষে বাধ্য হয়ে, নিজের স্ত্রীর গলার একমাত্র সোনার চেইনটি গোপনে বিক্রি করে সেই মাস্তানদের প্রথম কিস্তির চাঁদা দিতে হয়েছিল। প্রশস্ত রাস্তার যে সুবিধা তিনি আশা করেছিলেন, তা মাস্তানদের চাঁদাবাজির সহজ শিকারে পরিণত হলো।তৃতীয় ধাপ: লেবার পেমেন্টের হাহাকার ও অনাহারের দিনগুলোফাউন্ডেশনের ঢালাইয়ের কাজ শুরু হওয়ার পর খরচের গতি আসিফ সাহেবের ধারণার বাইরে চলে গেল। রড, সিমেন্ট, আর লেবারদের মজুরি প্রতিদিন দিতে হতো। মধ্যবিত্তের পুঁজি যে কত দ্রুত শেষ হয়ে যায়, তা তিনি টের পেলেন। রাজমিস্ত্রি আর জোগালিদের পেমেন্ট দেওয়ার দিনগুলো ছিল আসিফ সাহেবের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিন।শনিবার মানেই ছিল লেবারদের সপ্তাহের বিল মেটানোর দিন। অনেক সময় দেখা যেত, পকেটে একটা টাকাও নেই। কিন্তু লেবাররা টাকা না পেলে কাজ বন্ধ করে দেবে, আবার অনেকে গালিগালাজও করত। এমনও বহু শনিবার গেছে, যখন আসিফ সাহেব লেবারদের পেমেন্ট নিশ্চিত করতে নিজের দুপুরের খাবার খাননি। টিফিন ক্যারিয়ারে করে অফিস থেকে আনা শুকনো রুটি খেয়ে দিন পার করেছেন। শুধু তিনি নিজে নন, তার এই স্বপ্নের খেসারত দিতে হয়েছে তার পরিবারকে।কয়েকটি দিন এমনও গেছে, যখন ঘরে চাল-ডাল কেনার মতো টাকা ছিল না। আসিফ সাহেব সাইটে দাঁড়িয়ে লেবারদের টাকা চুকিয়ে দিয়ে রাতে যখন শূন্য পকেটে বাড়ি ফিরতেন, স্ত্রী রেহানা বেগম শুধু এক বাটি আলু সেদ্ধ আর ভাত টেবিলে দিতেন। কোনো অভিযোগ করতেন না তিনি, কিন্তু তার চোখের কোণের জল আসিফ সাহেবকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। একবেলা না খেয়ে, আধপেটা খেয়ে তারা দিন পার করেছেন, শুধু যেন রাজমিস্ত্রিরা কাজ ফেলে চলে না যায়।চতুর্থ ধাপ: সন্তানদের চোখের জল ও শিক্ষার বিসর্জনএই বাড়িটি করতে গিয়ে আসিফ সাহেব সবচেয়ে বড় অপরাধ বোধে ভুগেছেন তার সন্তানদের প্রতি। তার বড় ছেলে অনিক তখন কলেজে পড়ে আর ছোট মেয়ে মিম স্কুলে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, কোচিংয়ের ফি, নতুন বই কেনার টাকা—সবকিছুই আস্তে আস্তে কমতে কমতে শূন্যে ঠেকেছিল।একদিন অনিক এসে বলল, "বাবা, কলেজের ফর্ম ফিলাপের শেষ তারিখ পরশু। তিন হাজার টাকা লাগবে।"আসিফ সাহেব তখন খাটের ওপর বসে হিসাব করছিলেন ছাদ ঢালাইয়ের জন্য আর কত বস্তা সিমেন্ট লাগবে। ছেলের কথা শুনে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার ড্রয়ারে তখন মাত্র দুই হাজার টাকা ছিল, যা পরদিন সকালে বালু ব্যবসায়ীকে দিতে হবে।তিনি অনিকের দিকে তাকাতে পারলেন না। নিচু গলায় বললেন, "বাবা, আর দুটো দিন সময় নেওয়া যায় না?"অনিক রাগ আর অভিমানে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। মিমের স্কুলের বেতনের জন্য স্কুল থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। এই কষ্ট আসিফ সাহেবকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছিল। সন্তানদের মুখের গ্রাস, তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং পড়াশোনার খরচ কেড়ে নিয়ে তিনি ইটের দেয়াল তুলছিলেন। অনেক সময় আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার-দেনা করতে হয়েছে শুধু সন্তানদের পড়ার খরচ আর বাড়ির রডের টাকা মেলাতে। ঋণের জালে পিষ্ট হতে হতে আসিফ সাহেবের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল।পঞ্চম ধাপ: স্বপ্নের সমাপ্তি ও ভাড়াটিয়া জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তিদীর্ঘ কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অনাহার, অপমান আর চোখের জলের পর অবশেষে সেই দিনটি এল। তিন কাঠা জমির ওপর পাঁচতলা আরসিসি ফ্রেমের দুই ইউনিটের বাড়িটি পুরোপুরি কমপ্লিট হলো। নিচতলার কার পার্কিংয়ের জায়গাটা পরিষ্কার করা হয়েছে। দেয়ালে লেগেছে নতুন রঙের প্রলেপ। রোদ পড়লে বাড়িটা চকচক করে ওঠে।আজ আসিফ সাহেব নিজের তৈরি করা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। আজ আর তাকে এক তারিখে পকেট খালি করে বাড়িওয়ালার দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে না। আজ আর কেউ এসে বলবে না, "পানির অপচয় করবেন না, রাত এগারোটার পর মেইন গেট বন্ধ হয়ে যাবে, আত্মীয়স্বজন বেশি আসতে পারবে না।"আসিফ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীতের কথা ভাবলেন। যারা ধনী, যাদের অনেক টাকা আছে, তাদের জন্য বাড়ি করা হয়তো একটা শখ বা সাধারণ বিনিয়োগ। কিন্তু তার মতো যাদের অল্প আয়, অল্প পুঁজি, তাদের জন্য বাড়ি করা মানে নিজের চামড়া বিক্রি করার মতো কষ্ট। ভাড়া থাকার অভিশাপ যে কত বড়, তা যে ভাড়া থাকে শুধু সেই জানে। বাড়িওয়ালাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য, কথায় কথায় অপমান আর ধাক্কা খেতে খেতে কত মানুষের জীবন যে শেষ হয়ে যায়, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কত মধ্যবিত্ত পরিবার তিলে তিলে শেষ হয়ে যায় এই একটি মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের খোঁজে।আসিফ সাহেব আকাশের দিকে হাত তুলে মোনাজাত করলেন। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দের জল। তিনি মনে মনে বললেন, "হে আল্লাহ, যে কষ্ট আমি আর আমার পরিবার সহ্য করেছি, তা যেন আর কোনো মধ্যবিত্তকে করতে না হয়। এই পৃথিবীর বুকে প্রতিটি মানুষকে তুমি নিজের একটা স্থায়ী ঠিকানা দাও। বাড়িওয়ালার সেই নির্মম অভিশাপ আর ধাক্কা খাওয়া থেকে আমাদের দেশের প্রতিটি অল্প আয়ের মানুষকে তুমি মুক্ত করো।"আজ থেকে আমরা নিজেদের বাড়িতে ঘুমানোর অধিকার পেলাম।। এই মুক্তি, এই শান্তি যেন চারপাশের সব দেয়ালে এক নতুন জীবনের গান গাইছে। সকলকে ধন্যবাদ।

Comments

    Please login to post comment. Login