Posts

গল্প

রমনা বটমূলের সেই মেয়ে টি।

July 23, 2026

Shafin pro

2
View

. গ্রীষ্মের দাবদাহ: সেই প্রথম দেখা ও হারিয়ে যাওয়াবৈশাখ মাসের তপ্ত দুপুরের সূর্য মাথার ওপর। ঢাকার রমনা বটমূলের চারপাশটা তখনো চৈত্রসংক্রান্তি আর পহেলা বৈশাখের আমেজে মাতোয়ারা। চারদিকে মানুষের কোলাহল, রঙিন শাড়ি আর পাঞ্জাবির মেলা। বাতাসে ভেসে আসছে মাটির সোঁদা গন্ধ আর ঢাকের আওয়াজ। আমি আকাশ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়িয়েছিলাম।বটবৃক্ষের বিশাল ছায়ার নিচে একটা লাল-সাদা শাড়ি পরা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে এক অদ্ভুত মায়া, চুলে জড়ানো বেলি ফুলের মালা। সে যখন হাসছিল, মনে হচ্ছিল চারপাশের তপ্ত রোদ নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে। মেয়েটি তার বান্ধবীদের সাথে ছবি তুলছিল। হঠাৎ আমাদের চোখাচোখি হলো। সে আমার দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। সেই হাসিতে কী যেন একটা জাদু ছিল! আমি সম্মোহিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু ঠিক তখনই একদল মানুষের ভিড় আমাদের মাঝখানে চলে এলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার দৃষ্টি ফোকাস হারাল। ভিড় ঠেলে যখন ওপাশে গেলাম, সেখানে আর কেউ নেই। লাল-সাদা শাড়ির সেই মায়াবী রূপটা ভিড়ের মধ্যে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।আমি সেদিন বিকেল পর্যন্ত পুরো রমনা পার্ক চষে বেড়ালাম। কোথাও তার দেখা নেই। বন্ধুদের বললাম, "দোস্ত, একটা মেয়েকে দেখলাম। জাস্ট হারিয়ে গেল।" বন্ধুরা হাহা করে হেসে উঠল, "আরে আকাশ, মেলায় এমন কত মেয়ে আসে-যায়। বাদ দে তো!" কিন্তু আমি পারলাম না। আমার মনের ভেতর তখন গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ শুরু হয়ে গেছে। এক অজানা তৃষ্ণায় বুক চিরে যাচ্ছিল। আমি জানতাম না তার নাম, জানতাম না তার ঠিকানা। শুধু মনের ক্যানভাসে রয়ে গেল তার সেই মায়াবী মুখ।২. বর্ষার অন্তহীন হাহাকার: খোঁজাখুঁজির শুরুগ্রীষ্ম কেটে আষাঢ় এলো। ঢাকার আকাশে মেঘের ঘনঘটা। দিন-রাত ঝুম বৃষ্টি। প্রকৃতি যখন শান্ত হচ্ছিল, আমার মনের ভেতরের ঝড় তখন আরও তীব্র হচ্ছিল। আমি প্রতিদিন বিকেলে অফিস শেষ করে কোনো কারণ ছাড়াই রমনা বটমূলে গিয়ে বসে থাকতাম। যদি কোনো অলৌকিক উপায়ে সে আবার সেখানে আসে!ঝুম বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় দিয়ে আমি ধানমন্ডি লেক, টিএসসি, কার্জন হল ঘুরে বেড়াতাম। যেখানেই কোনো মেয়েকে লাল শাড়িতে দেখতাম, বুকটা ধক করে উঠত। মনে হতো, এই বুঝি সে! কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতাম অন্য কেউ। বর্ষার অবিরাম ধারার মতো আমার চোখের কোণেও এক ধরনের ক্লান্তি আর হতাশা জমা হতে লাগল।বন্ধুদের আড্ডায় আমি এখন এক নীরব শ্রোতা। আমার বন্ধু সায়মন একদিন বিরক্ত হয়ে বলল, "আকাশ, তুই একটা কাল্পনিক চরিত্রের পেছনে নিজের জীবনটা নষ্ট করছিস। এক বছর তিন মাস ধরে তুই একটা মেয়ের খোঁজ করছিস যার নাম-ঠিকানা কিছুই জানিস না। এটা পাগলামি!"আমার আরেক বান্ধবী নাবিলা বলল, "আকাশ, প্র্যাক্টিক্যাল হ। মেয়েটা হয়তো বিবাহিত, বা তার বয়ফ্রেন্ড আছে। তুই কেন নিজের ক্যারিয়ার আর মানসিক শান্তি নষ্ট করছিস?"তাদের এই বাস্তববাদী কথাবার্তা আমার ভালো লাগত না। নাবিলা আর সায়মনের সাথে আমার তীব্র মতের পার্থক্য শুরু হলো। আমি চিৎকার করে বলতাম, "তোরা বুঝবি না। প্রেম বা ভালোবাসা কেবল চেনা মানুষকে নিয়ে হয় না। কিছু দেখায় আত্মার একটা টান তৈরি হয়ে যায়।" এই নিয়ে বন্ধুদের সাথে দূরত্ব বাড়তে লাগল। আড্ডাগুলো বিষাদময় হয়ে উঠল।৩. শরতের কাশফুল ও ঘরের ভেতরের মেঘদিন গড়িয়ে আশ্বিন এলো। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর পাড়ে কাশবনের দোলা। প্রকৃতিতে এক অদ্ভুত নীরবতা ও শুভ্রতা। কিন্তু আমার ঘরে তখন কালবৈশাখীর মেঘ।আমার বয়স বাড়ছে, তাই বাসা থেকে বিয়ের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া শুরু হলো। মা প্রতিদিন সকালে নাস্তার টেবিলে বিভিন্ন মেয়ের ছবি নিয়ে বসতেন।মা বলতেন, "বাবা আকাশ, এই মেয়েটা দেখ। কত শান্ত, দেখতেও সুন্দর। তোর বাবা চাচ্ছেন এবার তুই সংসারী হ।"আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলতাম, "মা, আমি এখন বিয়ে করব না। আমার কিছু সময় লাগবে।"বাবা গম্ভীর গলায় ড্রয়িংরুম থেকে বলতেন, "কত সময় লাগবে? এক বছর ধরে তো একই কথা শুনছি। কোনো মেয়ে পছন্দ থাকলে বল, আমরা গিয়ে কথা বলি। আর যদি কেউ না থাকে, তবে আমাদের পছন্দে বিয়ে করতে হবে।"আমি মনে মনে ভাবতাম, যদি আমি সেই রমনা বটমূলের মেয়েটিকে একবার খুঁজে পেতাম! তাকে সোজা গিয়ে বলতাম, "তুমি কি আমার সাথে জীবন কাটাতে রাজি? যদি রাজি হও, তবে চলো আমার হাত ধরে। আমি তোমাকে আমার বাসায় নিয়ে যাব। বাবা-মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলব—এই আমার জীবনের প্রথম ও শেষ পছন্দ।"কিন্তু কোথায় সে? এক বছর তিন মাস ধরে যাকে হন্যে হয়ে খুঁজছি, সে যেন কোনো রূপকথার পরী, যে শুধু এক বিকেলের জন্য ধরা দিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে।বাসার এই রোজকার চাপ আর মানসিক যন্ত্রণায় একদিন মেজাজ হারিয়ে ফেললাম। বাবার সাথে তীব্র তর্কাতর্কি হলো। বাবা বললেন, "যদি নিজের খেয়ালখুশিমতো চলতে চাও, তবে এ বাড়ি থেকে চলে যাও। আমাদের কথা না শুনলে এ ঘরে তোমার জায়গা হবে না।"আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। এক কাপড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। বন্ধুদের ফোন করলাম, কিন্তু সায়মন আর নাবিলাও আমাকে বোঝাতে লাগল যে আমি ভুল করছি। একা এক সস্তা হোটেলে রাত কাটালাম। শরতের সেই জ্যোৎস্না রাতেও আমার জীবনটা ছিল ঘোর অন্ধকারে ঢাকা।৪. হেমন্তের কুয়াশা ও চরম সিদ্ধান্তকার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে মাঠের ধান পেকে সোনালী হয়ে ওঠে। বাতাসে হালকা হিমেল হাওয়া। কিন্তু আমার জীবনে তখন এক অনিশ্চয়তার কুয়াশা। বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মা কেঁদে কেঁদে ফোন করলেন। বাবারও শরীর খারাপ হলো। বন্ধুদের সাথেও সম্পর্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন। নিজের জেদের কারণে চারপাশের সবাইকে কষ্ট দিচ্ছি—এই অপরাধবোধ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।অবশেষে এক বছর তিন মাস, অর্থাৎ দীর্ঘ পনেরো মাস পর আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। ভাবলাম, আমি যার পেছনে ছুটছি সে হয়তো সত্যিই এক মায়া। তার জন্য নিজের বাবা-মাকে এভাবে কষ্ট দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। আমি বাসায় ফিরে এলাম। বাবার পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাইলাম।বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, "আমি তোর কোনো ক্ষতি চাই না বাবা। তোর মার শরীরটা ভালো না। আমাদের একটাই ইচ্ছা, তুই বিয়ে কর। আগামী সপ্তাহে আমরা এক বন্ধুর মেয়ের বাড়িতে যাব মেয়ে দেখতে। তুই কোনো অজুহাত দিবি না।"আমি নিস্তেজ গলায় বললাম, "ঠিক আছে বাবা। তোমরা যেখানে বলবে, আমি সেখানেই বিয়ে করব।"আমার ভেতরের সেই প্রেমিক আকাশটা যেন হেমন্তের ঝরা পাতার মতো ঝরে পড়ে গেল। আমি ধরে নিলাম, রমনার সেই মেয়েটি আমার ভাগ্যে ছিল না।৫. শীতের তীব্রতা ও মেয়ের বাড়িতে যাত্রাপৌষের তীব্র শীত তখন ঢাকাকে গ্রাস করেছে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশ। ঠিক যেন আমার মনের ভেতরের জমাট বাঁধা পাথর। আজ সেই দিন—যেদিন আমাকে মেয়ে দেখতে যেতে হবে।সকাল থেকে মা আমাকে জোর করে নতুন শেরওয়ানি ধাঁচের পাঞ্জাবি পরালেন। আয়নায় নিজেকে দেখছিলাম, কিন্তু নিজের চোখ দুটোতেই কোনো প্রাণ ছিল না। বন্ধুরা ফোন করে শুভকামনা জানাল, যদিও তাদের কণ্ঠে এক ধরনের সান্ত্বনার সুর ছিল।আমরা সবাই মিলে গাড়িতে করে রওনা হলাম মেয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে। ঢাকার বাইরে এক শান্ত স্নিগ্ধ এলাকায় তাদের বাড়ি। চারদিকে সরষে ক্ষেতের হলুদ মেলা আর শীতের আমেজ। গাড়ি যখন মেয়ের বাড়ির সামনে থামল, আমার বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, আমি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক অজানা বন্দিশালায় প্রবেশ করছি।বাবার বন্ধু আমাদের খুব সমাদর করে ড্রয়িংরুমে বসালেন। মিষ্টি, পিঠা আর চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হলো। সবাই হাসিমুখে কথা বলছে, কেবল আমি রোবটের মতো মাথা নিচু করে বসে আছি। বাবা বললেন, "তা আমজাদ সাহেব, আপনার মেয়েকে এবার ডাকুন।"৬. বসন্তের আগমন: অলৌকিক পুনর্মিলনড্রয়িংরুমের ভারী পর্দাটা সরে গেল। হালকা পায়ের আওয়াজ আমার কানের কাছে এসে থামল। মা ফিসফিস করে বললেন, "আকাশ, মাথা তোল। মেয়েকে দেখ।"আমি অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আস্তে আস্তে মাথা তুললাম। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চারপাশের শীতের জড়তা ভেঙে যেন হাজারো ফাগুনের আগুন জ্বলে উঠল! ডমরুর মতো কেঁপে উঠল আমার চর্তুপাশ।আমার চোখের সামনে যে মেয়েটি এক কাপ চায়ের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে, সে কোনো অপরিচিতা নয়। এ তো সেই লাল-সাদা শাড়ি পরা মেয়েটি! যাকে আমি গত এক বছর তিন মাস ধরে প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি ধূলিকণায় খুঁজে বেড়িয়েছি। যার জন্য বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করেছি, যার জন্য ঘর ছেড়েছি। আজ সে কোনো মেলা বা ভিড়ে নেই, সে সরাসরি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেও ঠিক একই রকম বিস্ময় আর চেনা মায়া! তার হাতের চায়ের কাপটা মৃদু কাঁপছিল।মেয়ের বাবা মুচকি হেসে বললেন, "আমার মেয়ের নাম সুমি। ও সাধারণত খুব শান্ত, কিন্তু গত এক বছর ধরে ও কেমন যেন আনমনা থাকে। কোথায় যেন কার সাথে নাকি ওর দেখা হয়েছিল রমনা বটমূলে। তারপর থেকে ও আর কাউকে পছন্দ করতে পারছিল না। আমরাও অনেক জোর করে আজ ওকে এখানে এনে বসিয়েছি।"কথাটা শুনে ড্রয়িংরুমের সবাই অবাক হয়ে গেল। আর আমার চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। আমি সোজা দাঁড়িয়ে গেলাম। সবার সামনে সুমির দিকে তাকিয়ে বললাম, "সুমি! আমি এই দীর্ঘ এক বছর তিন মাস ধরে শুধু তোমাকেই খুঁজেছি। আজ আমার খোঁজাখুঁজি শেষ হলো।"সুমি লাজুক হেসে মাথা নিচু করল। ওর গাল দুটো বসন্তের কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল হয়ে উঠল।আমার বাবা আর সুমির বাবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাহা করে হেসে উঠলেন। বাবা বললেন, "আরে! এতো মেঘ না চাইতেই জল! আমরা তো জানতামই না আমাদের সন্তানদের মনের খবর।"বাসার সবার মুখে তখন চওড়া হাসি। যে বন্ধুদের সাথে আমার মতের অমিল হয়েছিল, তারা এই খবর শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। সায়মন ফোনে বলল, "দোস্ত, তোর ভালোবাসার জয় হয়েছে। তুই সত্যি জাদুকর!"অবশেষে আমাদের চার হাত এক হলো। বসন্তের কোকিলের ডাক আর শিমুল-পলাশের রঙে রাঙানো এক বিকেলে সুমি আমার হাত ধরে আমার ঘরে এলো। রমনা বটমূলের সেই হারিয়ে যাওয়া মায়া আজ আমার জীবনের চিরন্তন সত্য। আমি আকাশ, আর আমার পাশে আমার সুমি—আমাদের ভালোবাসার ছয়টি ঋতুর বৃত্ত আজ পূর্ণ হলো।গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো জানাবেন! ধন্যবাদ।

Comments

    Please login to post comment. Login