Posts

গল্প

হাড়হাভাইত্যা

July 27, 2026

Tansirul Alam

Original Author তানসীর আলম

7
View

চর ঈশ্বরদিয়া গ্রাম। ব্রহ্মপুত্রের পুরাতন প্রবাহের ঠিক উল্টো দিকের গ্রাম। শহরের আধুনিকতা এখনও একে স্পর্শ করেনি। যদিও মাসকান্দা শহর নিজেই এখনও অতটা আধুনিক নয়। গ্রামীণ সৌন্দর্য্যের প্রায় সবটাই ছেয়ে আছে চর ঈশ্বরদিয়ায়। সবুজ বন, হলুদ মাঠ, তুলো তুলো মেঘ বুকে শরতের নীলাকাশ, ফিঙের লেজ-দুলোনো অভিবাদন; সবই মেখে আছে এ গ্রামে। প্রকৃতি থেকে যাপনে নজর ফিরিয়ে আনলে শোনা যাবে শিশুপুত্রের তারস্বরে কান্না। তার সাথেসাথেই ভেসে আসবে ঝাঁজালো কণ্ঠের গালাগাল, "তুই খালত ডুইবা মরছ না ক্যান হারামজাদা!"
 

চর ঈশ্বরদিয়ায় ডাক্তার মনতাজের বাড়ির পেছনে ঝুপড়ি বেঁধে একমাত্র শিশুপুত্র কলিমুদ্দিনকে নিয়ে বাস করে সখিনা বানু। ডাক্তার মনতাজ মরেছেন সংগ্রামের সময়ে, সে আজ সাড়ে তিন বছর পেরিয়েছে। সখিনার স্বামী, মানে কলিমের বাপ মরেনি। কলিমকে বিয়ানোর তিনদিন আগে কাউকে কিছু না জানিয়ে সখিনা বানুর সঞ্চয়ের চল্লিশটা টাকা লুঙ্গির কোঁচায় পুরে 'দেশান্তরি' হয়েছে। যাওয়ার আগের রাতে অকারণেই 'বিরাট কাইজ্জা' লাগিয়েছিল সখিনার সাথে।

স্বামীর ওপর সে নির্ভরশীল নয়। এখানে-ওখানে কামলা খেটে সংসারবিমুখ স্বামীর ওপর থেকে নির্ভরতা সে কাটিয়েছে বহু আগেই। কলিমুদ্দিন তার একমাত্র পুত্র, তবে একমাত্র সন্তান নয়। পুত্রের আগে তার আরো দু'টি কন্যাসন্তান হয়েছিল। দু'টোই হয়েছিল শেয়ানা। এদের একজনের হয়েছিল কলেরা, সেটাও সংগ্রামের আগের বছর। মরেছে অল্পদিনেই। আরেকজন সংগ্রামের সময় এক 'মুক্তি'র সাথে দোস্তি করে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। এখন জীবিত আছে কি না কে জানে।

এই গ্রামে মিলিটারি বাহিনী তেমন তাণ্ডব চালায়নি, শুধু ডাক্তার মনতাজকে কৃষি ভাসিটির গেইট থেকে কারা যেন তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি কারো সাতে-পাঁচে না থাকা মানুষ। তাকে তুলে নিয়ে যাবার দু'দিন আগে কিছু একটার আঁচ পেয়ে পুরো পরিবারকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন শেরপুরে। এরপর থেকে মনতাজ বাড়ি ফাঁকাই পড়ে আছে। 

বিজয়ের দিন কিছু অস্ত্রধারী চেংড়া এসে লুট করেছিল মন্তাজ বাড়ি। তারা চলে যাওয়ার পর সখিনা সেই বাড়ি থেকে কাপড়ের কিছু বড় টুকরা কুড়িয়ে এনেছিল। ঝুপড়ির চারপাশে ঘেরাও দিয়ে রাখলে দূর থেকে বঝা যায় না, এখানে কারো বাস আছে।

বাড়ির পেছন দিকে পানাপড়া ডোবা, যদিও অগভীর, মাঝেমধ্যে শিয়াল নামে খাবারের সন্ধানে। ডোবার প্রায় সংকীর্ণ পাড়ে সারি বেঁধে দাঁড়ানো গাছের মাঝ দিয়ে পা চালিয়ে চালিয়ে সখিনা বানু চলে যায় মুন্সিবাড়িতে। মুন্সিবাড়িতে মোটামুটি ফুট-ফরমায়েশ খেটে যা জোটে, তা জমিয়ে রাখে সখিনা। ধান পাকার মৌসুমে ধান ভানার রাতভর কাজও করে সে। সেখানে দু-বেলার বাসি খাবার ছাড়া তেমন কিছুই মেলে না। যা মেলে, সবই যক্ষের ধনের মতো পুঁটলিতে জমিয়ে রাখে।

ঝুপড়িতে ফিরে এসে সে নিজে খায়, কলিমকেও খাওয়ায়। এরপর বিছানায় শুয়ে কাঁদে। কত ব্যথাভরা জীবন কাটল তার। সামনের জীবন অনিশ্চিত আঁধারে ডোবা। কীভাবে জীবনের সুতো বুনবে সে? পাশে একঘেয়ে সুরে কাঁদে কলিম।

ইদানিং কলিমের এই একঘেয়ে কান্না মুন্সিবাড়ির সকলের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুন্সিবাড়ির কর্ত্রী মনোয়ারা একদিন বলেই ফেলল, "সখিনা, তোয় পোলারে বাড়িত আনিস না পরের থিকা। এত জ্বালাইলে কী কাম করন যায়! কারো কাছে থুইয়া আহিস।" কার কাছে রেখে আসবে সে? এ জগতে তার অবশিষ্ট কে আছে বেঁচে? মায়ের সান্নিধ্য ছাড়া কি দুধের পুত্র শান্ত থাকে?


কলিমুদ্দিন সমস্যার একটা সমাধান সে করেছে। তাকে নিজের পিঠে-কোমরে বেঁধে মুন্সিবাড়িতে কাজে যায় সে। তাতে কলিম শান্ত থাকে প্রায় সময়জুড়েই। যতটুকু কান্না জুড়ায়, তাতে মনোয়ারা আর রাগ করেন না। 

কিছুদিন গেল, তেমন একটা উত্তাপও যেন নেই মুন্সিবাড়িতে। মনোয়ারার মুখ কেমন থমথমে হয়ে থাকে। সখিনা আগ বাড়িয়ে কিছু জানতে চায় না। কিন্তু ক'দিন বাদে মনোয়ারাই তাকে জানিয়ে দেয়, "সামনের সপ্তাহ থেইকা আর কাজে আসন লাগব না তোর।"


সখিনা হতভম্ব হয়। কাজে তো সে দিব্যি মনোযোগী। তিনজনের কাজ সে একলাই সেরে নেয়। তাছাড়া পুত্রের সমস্যার সমাধানও তো হয়ে গেছে। তাহলে কাজ থেকে বের করে দেয়া কেন?


"আমি ঢাকা চইলা যাব তোর ভাইজানের লগে। আফাতত এইখানকার চাষবাস, কাজকর্ম বন্ধ থাকব। দ্যাখছস না সব গুটায়ে ফেলাইতেছি।" 


মনোয়ারার ছেলেমেয়ে ঢাকায় থাকে। একথা সখিনা জানে। মুখ ফটে এবার বলেই ফেলল,"আমারেও নিয়া যান না বুবু!" 

মনোয়ারা যেন আঁতকে ওঠল, "তোরে ক্যান নিয়া যামুরে মাগী?" সখিনার জবাব যেন তৈরি, "ওইখানে তো কাজের মানুষ লাগলেও লাইগবার পারে।" 


মনোয়ারা সরে যেতে যেতে বলে, "আরে মাগী,, আমিই যাইতাছি পুলামাইয়ার বাড়িতে পোষ্যার লাহান। তরে কে পুষবো ওইহানে? কথা বাডাইস না। শুক্কুরবার আইলে তর হিসাব মিটায়ে দিমুনে।"


দিন কেটে যেতে লাগলো। মুন্সিবাড়িসহ আশপাশের প্রায় সকলেই গ্রাম ছাড়তে লাগল। তাতে সখিনার অন্য কাজগুলোও হাতছাড়া হতে লাগল। মজুরির বাইরে দু-বেলা বাসি খাবারের জোগানও হলো বন্ধ।


কেমন অদ্ভুত খাপছাড়া লাগছিল সবকিছু। এমন তো আগে কখনো হতে দেখেনি সে। আর কিছু না পাওয়া যাক, খানাখাদ্য-তা হোক বাসি- তবু তো জুটত। যেখানে আগে তাকেই বাড়ি বাড়ি ডেকে নিয়ে যেত গৃহস্থেরা, সেখানে আজ দু'দিন পরপরই নতুন কাজের জন্যে নানা জায়গায় ধরনা দিতে হচ্ছে।


কলিমকে কোলে নিয়ে সলিমের চায়ের দোকান পাশ কাটছিল সখিনা। কানে ভেসে এলো কিছু উড়ো কথা। "উত্তরে বন্যা নামছে, সব ভাসায়ালাইছে", "এইবারের চাউলের দাম বেজায় বাড়ন্তি", "দ্যাশে আকাল নামছে!" 


শেষ কথাটি কানে ভো ভো করতে লাগল সখিনার। আকাল। শব্দটি খুব ছোটবেলায় সে শুনেছিল। সখিনার বাপজান বলত তাঁর আকালের অভিজ্ঞতার কথা। তখন বাপজানও ছিলেন জোয়ান। আকাশে উড়ত জাপানী বিমান, আর জমিনজুড়ে বিস্তৃত আকাল। পথেঘাটে পড়ে থাকত ক্ষুধা পেটে মরে থাকা জীর্ণশীর্ণ দেহ। আকালের এসব ভয়াবহ গল্প শুনে গা শিউরে ওঠত সখিনার। তবু দিনশেষে নিশ্চিন্ত থাকত এই ভেবে যে, অন্তত তার জীবনে কখনো আকাল এসে বিকট দাঁত দেখাবে না।


এখন তো তা মনে হচ্ছে না, আকাল কি তবে এসেই পড়ল। সংগ্রামের সময় গ্রামে বেশ অনেকবার গুজব ছড়াত, "মিলিটারি আইতেছে গ্রামে।" কিন্তু কখনোই তারা আসেনি। আকালের কথাটাও কি তাহলে গুজব? 

চর ঈশ্বরদিয়ার জমিনের বাতাসও ক্রমেই ভারী হলো অনাহারী আর্তনাদে। অবস্থাসম্পন্নেরও টান পড়ল ভাতের। গাঁয়ে গাঁয়ে ভীড় বাড়ল বহিরাগত ভিখারীদের। না. এদের আর 'ভিখারী' বলে পৃথক করা ঠিক হচ্ছে না। এরা তো দেখতে-শুনতে সখিনার মতোই। গৃহস্থের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে তারস্বরে তারা চেঁচায়, "এক ফোঁটা ফেন দেও না গো মা!"

ভাত নয়, ফেন। পয়সাও মাগছে না তারা: পয়সা দিয়ে কিছু খরিদ করা গেলে তো পয়সা খুঁজবে। বাজার ওঠে গেছে। দোকানপাটও ওঠে যাবার পথে। চায়ের দোকানের চুলায় আর চা বসে না। ভাত হয়ে গেছে বিলাসী খাদ্য। এখন শুধু কয়েক ফোঁটা ফেনই বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।

সখিনা বানু এখন সত্যিকার অর্থেই কর্মহীন। যেসব বাড়িতে সে কাজ করত, সেখানকার কেউই আর নিজ বাড়ি নেই। যারা আছেও বা, দোর লাগিয়ে রাখে সারাদিন। 

ভাতবিহীন চারদিন কেটে গেল সখিনার। খিদে গিলে রাখা সখিনার পক্ষে নাহয় সম্ভব। কিন্তু দুধের শিশু কলিম কি আর বুঝে খিদে চাপানোর বাস্তবতা? একঘেয়ে সুরে সে খিদের কান্না কাঁদে। কিছু একটা তো সখিনার পেটে যাওয়া লাগেই। নইলে কলিমকে স্তন দেবে কীভাবে?


সদর মাসকান্দার দিকে লঙ্গরখানা বসছে প্রায়ই, এমনটাই সখিনা শুনেছে। কিন্তু অতখানি পথ সে ভালো চেনেও না। গেলে ফেরার পথ ভুলে যাওয়ার ভয়ও থাকে। 

নিরুপায় সখিনা তাই কলিমকে পিঠে বেঁধে আদাইজ্যার বাড়ির পেছনের প্যাঁচপ্যাঁচে ডোবায় নেমে পড়ে। ডোবা থেকে কচুপাতা জোগাড় করে সেগুলো সেদ্ধ করে ঘাঁটার মতো বানাবে। ভাত খাওয়ার মুরোদ নেই। চালের কিলোই এখন ১১ টাকা। তবু সখিনা খিদেয় পাগল হয়ে গেছে। আজ কচুসেদ্ধ চলুক, কাল নাহয় জমানো টাকা ভাঙিয়ে ভাত খাওয়া যাবে। 

ঝুপড়িতে ফিরে সখিনা দেখে তার সবকিছু তছনছ হয়ে আছে। বলবার মতো কোনো ঘর না তার। তবু কারা যেন ঝড় বইয়ে দিয়েছে। হারাবার মতো তার কিছুই নেই। শুধু সঞ্চিত টাকাগুলোই যক্ষের ধন।

তড়িঘড়ি করে ঝুপড়ির ভেতর ঢুকল সে। পুঁটলিতে যা টাকা ছিল, তার এক কানাকড়িও নেই।


সখিনা বানুর আঁধার পৃথিবীতে আরো আঁধার নেমে এলো। হাত খসে পড়ে গেল কুড়িয়ে আনা কচুপাতা। চকিতে ভেসে এলো পলাতক স্বামীর মুখ। এমন সময়েই পরাজয়ের আবহ সঙ্গীতের মতো কান্না জুড়ে দিল কোলের কলিম।


এক জীবনে কম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি সখিনাকে। দাঁতে দাঁত চেপে সব সয়ে নিয়েছে এতদিন। কিন্তু আর পারা যায় না। কলিমের একটানা কান্নার মাঝেই ঝুপড়ির পেছনের ডোবার দিকে ছুটে যায় সখিনা। এক মুহূর্ত না ভেবেই ডোবার পানিতে ছুঁড়ে ফেলে কলিমকে।


মৃদুরূপে এক চোরা শব্দ ভেসে এলো, 'ছপাস'। এরপর শোনা গেল বিগলিত বুদবুদের শব্দ। সখিনার কোনো আক্ষেপ নেই। সে খুশি, দুনিয়ার কোনো কষ্টই এখন তার পুত্রকে ছুঁতে পারবে না।


সখিনার বুকের সমস্ত ক্ষুধা, দুঃখ, হতাশা সবকিছু একাকার হয়ে এক কালো জলের নদীতে পরিণত হলো। সেই কালো নদীর প্রবাহ রাত পোহাবার আগেই চর ঈশ্বরদিয়া ছাড়িয়ে বহ্মপুত্রে গিয়ে চুপচাপ মিশে গেল।

Comments

    Please login to post comment. Login