শ্রাবণ মাসের দুপুরের আকাশটা মেঘে মেঘে আলকাতরার মতো কালো হয়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। আবির ক্যাফের জানালার পাশে বসে একমনে কফির কাপে চামচ নাড়ছিল। ঠিক সাত বছর আগে ঠিক এমনই একটা বৃষ্টিভেজা দিনে অবন্তীর সাথে তার শেষ দেখা হয়েছিল। সেদিনের পর আজ আবার অবন্তী তাকে দেখা করতে বলেছে।
হঠাৎ ক্যাফের দরজার বেলটা বেজে উঠল। আবির তাকিয়ে দেখল—নীল শাড়ি পরে অবন্তী ভেতরে ঢুকছে। কাঁধের ওপর ভেজা চুলগুলো লেপ্টে আছে। অবন্তী এসে আবিরের মুখোমুখি বসল। দুজনের মাঝখানে তখন এক দীর্ঘ সাত বছরের নীরবতা।
আবির শান্ত গলায় বলল, "কেমন আছ অবন্তী?"
অবন্তী জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা মেঘগুলোর দিকে চোখ রেখে বলল, "যেমনটা রেখে গিয়েছিলে, ঠিক তেমন। মেঘেদের তো কোনো ঘর থাকে না আবির, তারা কেবলই ভেসে বেড়ায়।"
আবির অবন্তীর চোখের দিকে তাকাল। সেই চেনা চোখ, যাতে একসময় শুধু অভিমান জমে থাকত, আজ সেখানে এক অদ্ভুত শান্ত দীপ্তি। আবির বলল, "তখন আমাদের বয়স কম ছিল অবন্তী। পারিবারিক দায়িত্ব, ক্যারিয়ারের চাপ আর চারপাশের ভুল বোঝাবুঝিগুলো আমাদের আলাদা করে দিয়েছিল। কিন্তু আমার মনের ভেতর 'মেঘমল্লার' রাগিণীর মতো তোমার স্মৃতিটা সবসময় বাজত।"
অবন্তী আলতো করে হাসল। তার হাতটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল। আবির আর দ্বিধা না করে অবন্তীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। অবন্তী এবার আর হাতটা সরিয়ে নিল না।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। জানালার কাচ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অবন্তী আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "মানুষ ভাবে ভালোবাসার পূর্ণতা মানেই বুঝি সারাজীবন একসাথে থাকা। কিন্তু আমি বুঝেছি, ভালোবাসার আসল পূর্ণতা হলো সমস্ত দূরত্বের পরও একে অপরের প্রতি বিশ্বাস আর টানটা বাঁচিয়ে রাখা। আজ আমাদের সেই বিশ্বাসের জয় হলো।"
ক্যাফের ভেতরে হালকা সুরে গান বাজছিল। সাত বছরের অপূর্ণতা, একাকিত্ব আর দীর্ঘশ্বাস যেন বাইরের বৃষ্টির জলে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। আবির বুঝতে পারল, তাদের জীবনের ডায়েরিতে জমে থাকা মেঘমল্লার অধ্যায়ের শেষ পাতাটিতে আজ সত্যি সত্যি পূর্ণতার গল্প লেখা হয়ে গেছে।