রাত তখন গভীর। ঘড়ির কাঁটায় কয়টা বাজে দেখার মতো মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। চারপাশ নিঝুম, শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। হঠাৎ একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঝরঝর করে পানি পড়ার শব্দ। মনে হচ্ছে কেউ বাথরুমে খুব নিশ্চিন্তে গোসল করছে।আমি বিছানায় উঠে বসলাম। মাথার ভেতর এক তীব্র কৌতূহল আর হালকা ভয়ের মিশ্রণ। এই বাড়িতে আমি একাই থাকি। চাকরি সূত্রে এই পুরোনো জমিদার আমলের বাড়িটি ভাড়া নিয়েছি। ছিমছাম, শান্ত পরিবেশ দেখে বেশ পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু ইদানীং কিছু অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা ঘটছে। প্রায় প্রতি রাতেই আমি বাথরুমে গোসলের শব্দ পাই। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম হয়তো পানির কল নষ্ট, বা পাইপ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছে। কিন্তু কৌতূহল সামলাতে না পেরে যখনই উঠে বাথরুমে গিয়েছি, কোনো মানুষ দেখতে পাইনি। শুধু দেখতাম বালতি উপচে পানি পড়ছে আর মেঝে দিয়ে পানি নেমে যাচ্ছে ড্রেন দিয়ে। কলটা বন্ধ করে দিয়ে চলে আসতাম, কিন্তু মনে খটকা রয়েই যেত।আজকের রাতটা অন্যরকম। পানির শব্দের সাথে সাথে আরেকটি অদ্ভুত জিনিস যোগ হয়েছে। কেউ একজন গুনগুন করে গান গাইছে। মিষ্টি, সুরলা একটা কণ্ঠ। কণ্ঠটা নিশ্চিত কোনো মেয়ের। কিন্তু এই জনমানবহীন বাড়িতে, যেখানে কোনো মেয়েমানুষ নেই, সেখানে এমন কণ্ঠ কোথা থেকে আসবে? গানের সুরটা খুব চেনা নয়, তবে কেমন যেন একটা সম্মোহনী শক্তি আছে তাতে। সুরের টানে আমি বিছানা থেকে নামলাম।ধীরে ধীরে বাথরুমের দরজার দিকে এগোতে লাগলাম। প্রতিটি পদক্ষেপে বুকের ভেতর দপ দপ শব্দ হচ্ছিল। বাথরুমের দরজার কাছে আসতেই গানের শব্দ আর পানির আওয়াজ আরও স্পষ্ট হলো। তার সাথে যোগ হলো কাঁচের চুরির রিনরিন আওয়াজ। হ্যাঁ, কেউ একজন হাত নেড়ে গোসল করছে আর তার হাতের চুরিগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। হাত-পা যেন জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। মনে প্রশ্ন জাগল—তবে কি আসলেই কোনো ভূত মাঝরাতে আমার বাথরুমে গোসল করছে? নাকি আমার মনের ভুল?আমি আর ইতস্তত না করে বাথরুমের দরজার হাতলে হাত দিলাম। দরজাটা ভেজানো ছিল। আলতো করে ধাক্কা দিতেই একটা অদ্ভুত সুগন্ধ আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। এটা কোনো সাধারণ সাবান বা শ্যাম্পুর গন্ধ নয়। তীব্র তীব্র এক পারিজাত ফুলের সুবাস, যা পুরো বাথরুমের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।ভেতরে যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।বাথরুমের ভেতরের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে এক অপার্থিব দৃশ্য। সেখানে কোনো কঙ্কালসার বা কুৎসিত ভূত নেই। ঝরনার পানির নিচে দাঁড়িয়ে আছে এক অলৌকিক সুন্দরী নারী। তার গায়ের চামড়া যেন চাঁদের আলো দিয়ে তৈরি, এতই উজ্জ্বল। দীর্ঘ কালো চুলগুলো পিঠ বেয়ে মেঝে ছুঁয়েছে। পানির ছিটায় তার শরীরের চারপাশে এক ধরণের কুয়াশা তৈরি হয়েছে। তার দুই হাতে কাঁচের সবুজ আর সোনালী রঙের চুরি। সে পরম তৃপ্তিতে গোসল করছে আর সেই অদ্ভুত সুন্দর সুর তুলে গুনগুন করে গান গাইছে।আমি ভয়ে এবং বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম। এক পা নড়ার শক্তিও আমার ছিল না। হঠাৎ করেই সেই নারী গান থামিয়ে দিল। ঝরনার পানি পড়ার শব্দটা ছাড়া আর কোনো শব্দ রইল না। সে ধীরে ধীরে আমার দিকে মুখ ফেরাল। তার চোখ দুটো ছিল সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বড় এবং অসম্ভব মায়াবী, কিন্তু সেই চোখের মণি দুটো জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করছিল।সে আমার দিকে তাকিয়ে হালকা একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল এক গভীর প্রশান্তি। সে ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে আমাকে চুপ থাকার ইশারা করল। ঠিক তখনই আমার মনে হলো, এরা ভূত নয়। লোকগাথায় পড়া সেই জিন-পরীদের একজন। কোনো এক অজানা কারণে এই পুরোনো বাড়ির বাথরুমটিকে তারা তাদের রাতের অবসরের জায়গা বানিয়ে নিয়েছে।আমি সম্মোহিতের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর এক ঝটকায় যেন আমার চেতনা ফিরে এল। আমি উল্টো ঘুরে ড্রয়িংরুমের দিকে দৌড় দিলাম এবং সোফায় এসে বসে কাঁপতে লাগলাম। ভোরের আলো ফোটার আগে আর আমার চোখে ঘুম আসেনি।পরদিন সকালে সূর্যের আলো যখন পুরো ঘরকে ভরিয়ে দিল, তখন রাতের ঘটনাটিকে একটা স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু বাথরুমে ঢুকতেই সেই পারিজাত ফুলের হালকা সুবাস এবং মেঝেতে পড়ে থাকা একটি নিখুঁত কাঁচের সবুজ চুরি আমাকে মনে করিয়ে দিল—যা দেখেছি তা কোনো স্বপ্ন ছিল না। তারা ক্ষতিকর নয়, হয়তো এই প্রকৃতিরই অন্য এক জগতের বাসিন্দা, যারা মানুষের অলক্ষ্যে নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকে।গল্পটি আপনার কেমন লেগেছে তা জানাতে পারেন। ধন্যবাদ।