Posts

প্রবন্ধ

খুলনা বিভাগ নিয়ে প্রবন্ধ।

July 31, 2026

Shafin pro

7
View

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক অঞ্চল হলো খুলনা বিভাগ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন 'সুন্দরবন', দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর 'মোংলা' এবং রূপসা-ভৈরব নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা শিল্পনগরী খুলনাকে ঘিরেই এই বিভাগের পরিচিতি। নিচে চাহিদা অনুযায়ী খুলনা বিভাগের উপর একটি বিস্তারিত এবং তথ্যবহুল প্রবন্ধ বা রচনা আলাদা আলাদা অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করা হলো।খুলনা বিভাগ: ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি ও সমৃদ্ধির চালচিত্র১. খুলনা বিভাগের প্রতিষ্ঠাখুলনা বিভাগ বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগ। তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে ১৮৪২ সালে খুলনাকে প্রথম মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ১৮৮২ সালের ১ জুন এটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে, ১৯৬০ সালে তৎকালীন ৪টি জেলা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে "খুলনা বিভাগ" গঠিত হয়।২. আয়তন ও ভৌগোলিক অবস্থানখুলনা বিভাগের মোট আয়তন ২২,২৮৫ বর্গ কিলোমিটার (৮,৬০৪ বর্গমাইল)। ভৌগোলিকভাবে এই বিভাগের উত্তরে রাজশাহী বিভাগ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য অবস্থিত।৩. লোকসংখ্যা ও ধর্মীয় বিন্যাসসর্বশেষ ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা (প্রাথমিক প্রতিবেদন) অনুযায়ী খুলনা বিভাগের মোট জনসংখ্যা ১,৭৪,১৫,৯২৪ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা বিবেচনায় ২০২৬ সালে এর প্রাক্কলিত জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭৮ লক্ষের কাছাকাছি। ধর্মীয় দিক থেকে এ বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম (প্রায় ৮৬.৮%), এছাড়া বিপুল সংখ্যক হিন্দু (প্রায় ১২.৮%) এবং সামান্য সংখ্যক খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ এখানে সম্প্রীতির সাথে বসবাস করেন।৪. প্রশাসনিক কাঠামো: জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও গ্রামের সংখ্যাখুলনা বিভাগের সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত সুসংগঠিত। নিচে এর বিন্যাস তুলে ধরা হলো:মোট জেলা: এই বিভাগে মোট ১০টি জেলা রয়েছে।উপজেলা ও থানা সংখ্যা: বিভাগে মোট ৫৯টি প্রশাসনিক উপজেলা রয়েছে। তবে সিটি কর্পোরেশন ও মেট্রোপলিটন এলাকার আওতাধীন পুলিশি থানা (যেমন: কেসিসি এলাকার ৮টি মেট্রোপলিটন থানা) সহ মোট থানার সংখ্যা প্রায় ৭০টির কাছাকাছি।ইউনিয়ন সংখ্যা: খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা মিলিয়ে মোট ৫৭৪টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে।গ্রাম সংখ্যা: সরকারি রেকর্ড এবং স্থানীয় তথ্য বাতায়নের হিসাব অনুযায়ী এ বিভাগে মোট গ্রামের সংখ্যা প্রায় ৭,৮৪৫টি (ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত সক্রিয় মৌজাভিত্তিক প্রধান গ্রাম ৫৩৬টি)।সিটি কর্পোরেশন: এই বিভাগে ১টি সিটি কর্পোরেশন রয়েছে, যা হলো খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)। এটি ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট সিটি কর্পোরেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর ওয়ার্ড সংখ্যা ৩১টি।পৌরসভা সংখ্যা: এই বিভাগের ছোট-বড় শহরগুলোর নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে মোট ৩৭টি পৌরসভা রয়েছে।৫. জেলাভিত্তিক জনসংখ্যা ও উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানখুলনা বিভাগের ১০টি জেলার জনসংখ্যা (২০২২ সালের আদমশুমারি ভিত্তিক প্রধান রূপরেখা) এবং তাদের প্রধান প্রধান সরকারি-বেসরকারি বা ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান নিচে আলোচনা করা হলো:ক্রমজেলার নামআনুমানিক জনসংখ্যাউল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা১খুলনা২৩,৭৮,৯৭১ জনখুলনা শিপইয়ার্ড, মংলা বন্দর (কাছাকাছি অবস্থিত), খুলনা টেক্সটাইল মিল, নিউজপ্রিন্ট মিল, বিএল কলেজ।২যশোর২৪,৭১,৫৫৪ জনযশোর সেনানিবাস, এম এম কলেজ, শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, নোয়াপাড়া নদী বন্দর।৩সাতক্ষীরা২২,২৬,৫৮০ জনসুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস, দেবহাটা জমিদার বাড়ি, মোজাফফর গার্ডেন।৪বাগেরহাট১৬,৫৬,৩০০ জনষাট গম্বুজ মসজিদ (ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ), খান জাহান আলীর মাজার, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র।৫ঝিনাইদহ১৫,৭৯,৪৯০ জনক্যাডেট কলেজ, মোবারকগঞ্জ চিনি কল, কেসি কলেজ।৬কুষ্টিয়া২১,৪৯,৬৯২ জনরেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং, কুষ্টিয়া চিনি কল, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি (শিলাইদহ), লালন শাহের মাজার।৭চুয়াডাঙ্গা১০,০৭,১৩০ জনকেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লিমিটেড (দর্শনীয়), দেশের অন্যতম বৃহৎ চিনি ও ডিস্টিলারি কারখানা।৮মাগুরা৯,১৬,৪১৯ জনসৈয়দ আতর আলী পাবলিক লাইব্রেরি, শালিখা শতদল কলেজ।৯নড়াইল৭,২৪,৩২৭ জনএস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা, নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ।১০মেহেরপুর৬,৫৫,৬৯২ জনমুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ও কমপ্লেক্স (ঐতিহাসিক প্রথম রাজধানী), মেহেরপুর সরকারি কলেজ।৬. বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ (সুন্দরবন)খুলনা বিভাগের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ ও একক বন হলো সুন্দরবন। এটি পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ত জলের বন। খুলনা বিভাগের তিনটি উপকূলীয় জেলা—খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জুড়ে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ (প্রায় ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার) বিস্তৃত। সুন্দরবনের প্রধান উদ্ভিদ হলো সুন্দরী ও গেওয়া গাছ। এই বন বিশ্ববিখ্যাত 'রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার', চিত্রা হরিণ, লোনা পানির কুমির এবং শত শত প্রজাতির পাখির প্রধান আবাসস্থল।৭. সড়ক অবকাঠামো ও বড় বড় সেতুযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে খুলনা বিভাগে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতায় প্রায় ৪,৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি পাকা সড়ক ও মহাসড়ক রয়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের ১৬টি প্রধান সড়ক ৪-লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে।বিভাগের উল্লেখযোগ্য ও বড় বড় ব্রিজ:খান জাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু): খুলনা শহরের অদূরে রূপসা নদীর ওপর অবস্থিত এই সেতুটি মংলা বন্দরের সাথে যোগাযোগের মূল মাধ্যম।গড়াই সেতু: কুষ্টিয়া জেলায় গড়াই নদীর ওপর নির্মিত যা উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সংযোগ ঘটিয়েছে।ভৈরব সেতু ও দড়াটানা সেতু: ভৈরব নদীর ওপর নির্মিত সেতুগুলো খুলনা ও যশোর অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সংযোগ সেতু।মধুমতি সেতু (কালনা সেতু): নড়াইল ও গোপালগঞ্জের সীমান্তে মধুমতি নদীর ওপর নির্মিত দেশের প্রথম ছয় লেনের দৃষ্টিনন্দন ধনুকাকৃতির (আর্ক) সেতু, যা ঢাকার সাথে খুলনা বিভাগের দূরত্ব অনেক কমিয়ে দিয়েছে।গল্লামারী ও ময়ূরী সেতু: খুলনা মহানগরের অভ্যন্তরে যাতায়াতের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতু।৮. উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহশিক্ষাদীক্ষায় খুলনা বিভাগ অত্যন্ত অগ্রসর। এই বিভাগে বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য সরকারি ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে:১. খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খেইউ): গল্লামারীতে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র ছাত্ররাজনীতি ও সেশনজটমুক্ত স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়।২. খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট): দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, যা ফুলবাড়ীগেটে অবস্থিত।৩. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (ইবি): কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের সীমানায় অবস্থিত এই বিভাগের অন্যতম বৃহত্তম সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।৪. যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি): বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার জন্য বিখ্যাত।৫. খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (খকৃবি): কৃষি গবেষণার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান।৬. শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা: এই অঞ্চলের চিকিৎসকদের উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার জন্য নবপ্রতিষ্ঠিত প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।৯. অর্থনৈতিক আয়ের প্রধান উৎসসমূহখুলনা বিভাগের অর্থনীতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এর প্রধান আয়ের উৎসগুলো নিচে দেওয়া হলো:সাদা সোনা বা চিংড়ি চাষ: খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর ঘেরে উৎপাদিত গলদা ও বাগদা চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি করে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। এজন্য চিংড়িকে এই অঞ্চলের 'সাদা সোনা' বলা হয়।মোংলা সমুদ্র বন্দর ও মোংলা ইপিজেড: দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মোংলা এই বিভাগের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এর মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক বাবদ সরকারের বিশাল রাজস্ব আয় হয়।কৃষি ও ফল উৎপাদন: যশোর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় উদ্বৃত্ত ধান, সবজি, তামাক ও পাট উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে যশোরের গদখালীর ফুল চাষ এবং সাতক্ষীরার আম ও কুল চাষ দেশজুড়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।শিল্প ও কলকারখানা: খুলনা মহানগরী ও নোয়াপাড়ায় অবস্থিত পাটকল (জুট মিল), টেক্সটাইল মিল, দিয়াশলাই কারখানা এবং ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের অন্যতম উৎস।সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ: সুন্দরবন থেকে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মাছ সংগ্রহ করে হাজার হাজার বাওয়ালী ও মৌয়ালী জীবিকা নির্বাহ করেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।উপসংহারখুলনা বিভাগ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের মানচিত্রে অনন্য স্থান দখল করে আছে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঢাল এবং মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক সুবিধা এই বিভাগের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি করছে। সুপরিকল্পিত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে খুলনা বিভাগ সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। লেখাটি কেমন লাগলো লিখে জানাতে পারেন এবং কমেন্টস করতে পারেন  ধন্যবাদ।

Comments

    Please login to post comment. Login