ডায়েট কন্ট্রোলের ড্যাশিং কুস্তিগীর এবং লঞ্চের হাহাকার১. ফিটনেস যখন ফার্স্ট ক্লাসআমাদের বড় চাচ্চুর আসল নাম যা-ই হোক, কুস্তির দুনিয়ায় এবং আমাদের পরিবারে তিনি পরিচিত ‘বুলডোজার জাফর’ নামে। ১২০ কেজি ওজনের এই মানুষটির দিকে তাকালে মনে হবে আস্ত একটি জীবন্ত পাহাড় হেঁটে চলে যাচ্ছে। চওড়া ছাতি, লোহার মতো শক্ত বাইসেপ আর সার্বক্ষণিক একটা মারকুটে ভাব। দেশে-বিদেশে যত কুস্তি প্রতিযোগিতা হয়, জাফর চাচ্চুর সেখানে যাওয়া চাই-ই চাই। মেডেল আসুক আর না আসুক, প্রতিপক্ষকে স্রেফ ওজনের চোটে কুপোকাত করায় ওনার জুড়ি মেলা ভার।তবে কুস্তির চেয়েও জাফর চাচ্চুর বড় পরিচিতি ওনার ‘কঠোর’ ডায়েট কন্ট্রোলের কারণে। শরীর সচেতনতায় তিনি এতটাই কঠোর যে, ওনার সামনে ভাতের নাম নেওয়াও পাপ। চাচ্চুর স্পষ্ট কথা, "ভাত হলো অলসদের খাবার। ভাতে কার্বোহাইড্রেট থাকে, ভাতে শরীর মোটা হয়! আমি কুস্তিগীর মানুষ, মেদ জমতে দেওয়া যাবে না।"চাচ্চুর এই ডায়েট কন্ট্রোল দেখতে প্রতিদিন পাড়ার মানুষ আমাদের বাসায় ভিড় করত। সকালবেলা ওনার হালকা নাস্তা শুরু হতো ভুট্টা আর ছোলা দিয়ে। তবে সেটা বাটি মেপে নয়, আস্ত একটা বালতি ভরে। চাচ্চু যখন জাবর কাটার মতো করে মুঠো মুঠো কাঁচা ছোলা আর সেদ্ধ ভুট্টা চিবাতেন, তখন মনে হতো কোনো শক্তিশালী এশীয় হাতি বনের মধ্যে মনের সুখে খাচ্ছে।দুপুরের দিকে শুরু হতো ওনার আসল ডায়েট। ডায়েট কন্ট্রোলের অংশ হিসেবে তিনি কোনোদিন পাতেও ভাত নেন না। তবে ভাতের পরিবর্তে তিনি যখন রুটি খেতে বসতেন, তখন রুটি বানাতে বানাতে আম্মা আর চাচীর হাতের চামড়া উঠে যাওয়ার অবস্থা হতো। ২০-৩০টা আটার মোটা মোটা রুটি তিনি ছিঁড়ে এক এক মুখে সাবাড় করে দিতেন।মাংসের প্রতি ওনার ভালোবাসা ছিল দেখার মতো। ডায়েট চার্ট মেনে তিনি চর্বি ছাড়া গরুর মাংস খেতেন। তবে পরিমাণটা একটু বেশি—এক বসায় দুই থেকে তিন কেজি! চাচ্চু বলতেন, "মাংস হলো প্রোটিন, কুস্তিগীরের পেশি বানাতে প্রোটিন লাগে।" মাংসের পর আসত সবজির পালা। শরীরের ভিটামিনের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে তিনি এক-দুই কেজি সেদ্ধ সবজি মসলা ছাড়া চিবিয়ে খেয়ে ফেলতেন।সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া দৃশ্য হতো যখন তিনি ডিম খেতেন। সকালের ওয়ার্কআউটের পর চাচ্চুর প্রোটিনের অভাব মেটাতে একসাথে ৫০টা সেদ্ধ ডিমের অর্ডার হতো। আমাদের কাজ ছিল সেই ৫০টি ডিমের খোসা ছাড়ানো। চাচ্চু ডিমের সাদা অংশটা টপাটপ মুখে পুরতেন, আর কুসুমগুলো বিড়ালদের দিকে ছুড়ে মারতেন। ওনার এক বেলার ডিম খাওয়া দেখে পাড়ার মুরগিরা পর্যন্ত ভয়ে ডিম পাড়া বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম করত।আর ভাতের বিকল্প হিসেবে ওনার ফল খাওয়ার অভ্যাস তো রূপকথার মতো। বিকেলবেলা ডায়েট কন্ট্রোলের অংশ হিসেবে তিনি যখন ফল খেতে বসতেন, তখন ঝুড়ি ভরে চার-পাঁচ কেজি আপেল, মালটা আর কলা সাবাড় করে দিতেন। এত কিছুর পরও ওনার ওজন কোনোদিন ১২০ কেজির নিচে নামেনি। চাচ্চুর ধারণা, এই ওজন নাকি ওনার হাড়ের ওজন, চর্বির নয়!২. স্টিমার যাত্রা এবং ভাতের ক্রাইসিসসেবার এক শীতের শুরুতে বরিশালে এক মস্ত বড় কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। জাফর চাচ্চুর ডাক পড়েছে সেখানে। আমরা সপরিবারে রওনা হলাম লঞ্চে (স্টিমারে)। বিশাল স্টিমার, মেঘনা নদী বেয়ে দুলতে দুলতে চলছে। নদীর ঠাণ্ডা বাতাস আর লঞ্চের ভোঁ-ভোঁ শব্দে সবার পেটে তখন ছুঁচো ডলছে।রাত তখন সাড়ে নয়টা। জাফর চাচ্চু ওনার বিশাল শরীরটা দোলাতে দোলাতে আমাদের বললেন, "চল, ক্যান্টিনে গিয়ে রাতের ডায়েটটা সেরে আসি। আজ রুটি আর ফলই খাব।"আমরা সবাই মিলে স্টিমারের দোতলার জমকালো ক্যান্টিনে গিয়ে বসলাম। ক্যান্টিনের ভেতরে চমৎকার আলো, টেবিল-চেয়ার পাতা। এক কোণায় বড় বড় ডেকে খাবার ধোঁয়া ছাড়ছে। আমরা টেবিলে বসার পর ক্যান্টিনের ম্যানেজার বা বয় এসে মেনু কার্ড ধরিয়ে দিল।চাচ্চু গম্ভীর গলায় বললেন, "বয়, আমার জন্য ৩০টা লাল আটার রুটি নিয়ে আসো। সাথে তিন কেজি চর্বি ছাড়া গরুর মাংস।"বয়টা চোখ কপালে তুলে বলল, "স্যার, এত রাতে রুটি তো পাওয়া যাবে না। আমাদের এখানে তো আটা মাখাই নেই। রাতে শুধু ভাত, ডাল আর মাংসের তরকারি।"রুটি না পাওয়ার কথা শুনে জাফর চাচ্চুর মুখটা মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো কালো হয়ে গেল। তিনি রেগে গিয়ে বললেন, "বলিস কী? রুটি নেই! আমি কুস্তিগীর মানুষ, ডায়েট কন্ট্রোল করি। ভাত খেলে আমার শরীর মোটা হয়ে যাবে! আমি ভাত ছুঁয়েও দেখি না।"ক্যান্টিনের ক্যাশ কাউন্টারে বসে থাকা মোটা সোটা মালিক রসিকতা করে দূর থেকে বলল, "ভাইসাব, রাগ কইরেন না। আমাদের এখানে নিয়ম হইলো ভাত যত পারেন খান, কোনো লিমিট নাই। আনলিমিটেড ভাত আর ডাল ফ্রি! শুধু মাংসের বাটি মেপে দাম নেওয়া হবে। এক বাটি মাংসের সাথে যত খুশি ভাত চিবান, কেউ নিষেধ করবে না।"ম্যানেজারের এই ‘আনলিমিটেড ভাত ফ্রি’র অফার শুনে জাফর চাচ্চু একটু থমকে গেলেন। ওনার পেটের ভেতর তখন প্রোটিন আর কার্বোহাইড্রেটের যুদ্ধ চলছে। খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে। শেষমেশ নিরুপায় হয়ে চাচ্চু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আজকে কপালটাই খারাপ। ডায়েট কন্ট্রোলের বারোটা বাজল। বাধ্য হয়েই এই বিষ (ভাত) আমার পেটে ঢোকাতে হচ্ছে। আল্লাহ তুমি আমায় মাফ করো!"তিনি বয়কে ডেকে বললেন, "ঠিক আছে, ডায়েট ভাঙলাম আজকে। নিয়ে আয় তোর ভাত। সাথে চার বাটি গরুর মাংস দে।"৩. মহাকাব্যিক খাওয়া এবং ক্যান্টিনওয়ালার উধাও হাসিটেবিলে খাবার এল। নিয়ম অনুযায়ী চাচ্চুকে একটি মাঝারি বাটিতে গরুর মাংস দেওয়া হলো, আর সামনে রাখা হলো একটা বড় গামলা ভর্তি ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। জাফর চাচ্চু ওনার বিশাল হাত দিয়ে ভাতের গামলাটা নিজের দিকে টেনে নিলেন।আমরা আমাদের মতো অল্প করে ভাত-মাংস নিয়ে খাচ্ছি। কিন্তু আমাদের সবার নজর তখন জাফর চাচ্চুর দিকে। চাচ্চু প্রথম গামলার ভাতগুলো মাংসের সামান্য ঝোল দিয়ে মাখলেন। ওনার হাতের এক একটি লোকমা ছিল আমাদের হাতের অন্তত দশটা লোকমার সমান। তিন চার টানে প্রথম গামলার ভাত হাওয়া!চাচ্চু বয়কে ডেকে বললেন, "এই পিচ্চি, গামলাটা খালি কেন? ভাত দে!"বয় এসে আবার গামলা ভর্তি করে ভাত দিয়ে গেল। ক্যান্টিনের মালিক তখন দূর থেকে মুচকি হাসছে আর ভাবছে, "খাক খাক, কত খেতে পারে! মাংসের বাটি তো চারটা নিয়েছে, বিল তো ওখানেই উঠে যাবে।" মালিক তখনো জানত না, সে আসলে একটি আস্ত সুনামীকে ক্যান্টিনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।দেখতে দেখতে চাচ্চু পাঁচ গামলা ভাত শেষ করে ফেললেন। ওনার খাওয়ার স্পিড কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং বাড়ছে। মাংসের বাটি অনেক আগেই সাফ হয়ে গেছে, এখন তিনি ডাল দিয়ে ভাত মাখছেন। স্টিমারের ক্যান্টিনের ফ্রি ডাল ছিল বেশ পাতলা। চাচ্চু ডালের বাটি উপুড় করে ভাতের ওপর ঢেলে দিচ্ছেন আর স্যুপ খাওয়ার মতো করে ভাত গিলছেন।সপ্তম গামলা ভাতের সময় ক্যান্টিনের বয়ের কপাল দিয়ে ঘাম ছুটতে শুরু করল। সে রান্নাঘরে গিয়ে বাবুর্চিকে বলল, "ওস্তাদ, জলদি বড় ডেকের চাল চড়াও! ডাইনিংয়ে এক দানব আইছে, ভাত গামলাসহ গিলে খাচ্ছে!"বাবুর্চি খেঁকিয়ে উঠে বলল, "আরে দূর! এক মানুষ কত খাবে? আমাদের দুই শ লোকের ভাত রান্না করা আছে। তুই পরিবেশন কর।"এদিকে চাচ্চুর ডায়েট কন্ট্রোলের বাঁধ ভেঙে গেছে। তিনি আফসোস করছেন আর খাচ্ছেন, "হায় হায়! ভাতে শরীরটা আজ শেষ হয়ে গেল! এত কার্বোহাইড্রেট আমি কোথায় রাখব? বয়, আরেক গামলা ভাত আন!"দশম গামলা পার হওয়ার পর ক্যান্টিনের মালিকের মুখের হাসি পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেল। সে ক্যাশ কাউন্টার ছেড়ে উঠে এসে জাফর চাচ্চুর টেবিলের সামনে দাঁড়াল। ওনার খাওয়ার দৃশ্য দেখে মালিকের চোখ চড়কগাছ। চাচ্চু ততক্ষণে ফ্রি ডালের পুরো বড় গামলাটাই নিজের সামনে নিয়ে এসেছেন। বড় চামচ দিয়ে ডাল তুলে ভাতে ঢালছেন আর গপাগপ খাচ্ছেন।মালিক হিসাব কষে দেখল, এই লোক মাংসের বাটি বাবদ যে টাকা বিল দেবে, তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি টাকার চাল আর ডাল সে একাই সাবাড় করে দিয়েছে! এটা ব্যবসা নয়, এটা নির্ভেজাল দেউলিয়া হওয়ার পথ।৪. হাত-পায়ে ধরা এবং ডালের শেষ বিন্দুরাত তখন এগারোটা। ক্যান্টিনের ভেতরে আর কোনো কাস্টমার নেই। সবাই খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে চাচ্চুর খাওয়া দেখছে। পুরো ক্যান্টিন জুড়ে এক পিনপতন নীরবতা, শুধু শোনা যাচ্ছে চাচ্চুর মুখ চালানোর "চপ চপ" শব্দ।হঠাৎ রান্নাঘর থেকে বাবুর্চি হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তার পরনের লুঙ্গি ওপরে উঠানো, কপালে হাত। সে মালিককে ফিসফিস করে বলল, "ওস্তাদ, সর্বনাশ হয়ে গেছে! আমাদের বড় ডেক, মেজ ডেক সব খালি। ক্যান্টিনে আর এক দানাও ভাত অবশিষ্ট নাই।"মালিক চিৎকার দিয়ে বলল, "বলিস কী? দুই শ লোকের ভাত শেষ?"বাবুর্চি কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, "জি ওস্তাদ। আর ওই যে ফ্রি ডাল দিচ্ছিলাম, ডালের গামলার নিচে এখন শুধু পানি পড়ে আছে। ডালের বাউলের পানি পর্যন্ত এই লোক ভাত দিয়ে চুষে খেয়ে ফেলেছে!"ক্যান্টিন মালিক এবার বুঝতে পারল, অবিলম্বে এই কুস্তিগীরকে না থামালে আগামীকাল সকালে স্টিমারের স্টাফদের উপোস থাকতে হবে। সে অত্যন্ত বিনয়ী ও ভয়ার্ত মুখে জাফর চাচ্চুর পাশে এসে দাঁড়াল। ওনার বিশাল চওড়া পিঠে একটা আলতো হাত রাখল।চাচ্চু তখনো ডালের গামলা উপুড় করে শেষ বিন্দুটা ভাতের ওপর ফেলার চেষ্টা করছেন আর বলছেন, "বয়, ডালটা এত পাতলা কেন? আর ভাত কই? গামলাটা খালি কেন?"ক্যান্টিন মালিক এবার আক্ষরিক অর্থেই চাচ্চুর হাত দুটো চেপে ধরল। প্রায় কেঁদে ফেলার মতো ভঙ্গিতে, হাত-পায়ে ধরে বলল, "ভাই সাহেব! ও কুস্তিগীর ভাই! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি আমাদের বাঁচান। আপনার পায়ে পড়ি, আর ভাত চাবেন না!"জাফর চাচ্চু অবাক হয়ে বললেন, "কেন? আপনাদের নিয়মে তো লেখা আছে আনলিমিটেড ভাত আর ডাল ফ্রি! আমি তো মাত্র একটু খাওয়া শুরু করলাম।"মালিক দুই হাত জোড় করে বলল, "ভাই, আপনার ওই ‘একটু’ খাওয়াতেই আমাদের পুরো ক্যান্টিন সাফ হয়ে গেছে! আপনি যদি আর এক গামলা ভাতও খান, তাহলে আগামীকাল সকালে স্টিমারের কাপ্তান সাহেব থেকে শুরু করে অন্য কোনো যাত্রী এক লোকমাও মুখে দিতে পারবে না। আমরা ফকির হয়ে যাব ভাই! আপনার বিল দেওয়া লাগবে না, মাংসের দামও দেওয়া লাগবে না। দয়া করে আপনি হাতটা ধুয়ে ফেলেন!"চাচ্চু তখন ওনার পেটে হাত বুলিয়ে বেশ অসন্তুষ্ট মুখে বললেন, "ধুর! মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। লঞ্চের ক্যান্টিনে এসে একটু শান্তিমতো ডায়েট কন্ট্রোলও করতে পারলাম না। পেটটাই ভরল না ঠিকমতো!"আমরা সবাই তখন হাসতে হাসতে টেবিলের নিচে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। ক্যান্টিনের অন্য যাত্রীরা হাততালি দিয়ে উঠল। আর ক্যান্টিন মালিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাবুর্চীকে বলল, "তাড়াতাড়ি ক্যান্টিনের মেইন গেটে তালা লাগাও! আর বোর্ডে লিখে দাও—কুস্তিগীরদের প্রবেশ নিষেধ!"পরদিন সকালে বরিশাল ঘাটে যখন লঞ্চ ভিড়ল, জাফর চাচ্চু তখনো বিড়বিড় করছিলেন, "ভাতের দোকানে আর কোনোদিন যাব না। শরীরটা আজ কেজিখানেক বেড়েই গেল মনে হয়। আজ দুপুরে গিয়েই অন্তত চার কেজি কলা আর ৫০টা ডিম খেয়ে ডায়েটটা ব্যালেন্স করতে হবে!"ওনার এই কঠোর ডায়েট কন্ট্রোলের গল্প আজও আমাদের পারিবারিক আড্ডায় হাসির রোল তোলে।গল্পটি কেমন লাগল জানাবেন! ধন্যবাদ।