সৃষ্টির আলো ও ফুটপাতের ছায়াপ্রথম অধ্যায়: সৃষ্টির শান্তিময় প্রহর (গল্পের প্রথম দিক)ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের এক কোণে ছোট একটা ঘরে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলে ওঠে। ঘরটি ছোট, আসবাবপত্র সামান্য, কিন্তু চারপাশ বইয়ে ঠাসা। এই ঘরে বাস করেন কবি আনন্দমোহন। তার কাছে লেখালেখি কোনো পেশা নয়, এটি তার জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। যখন পুরো শহর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আনন্দমোহন সাদা কাগজে কলমের আঁচড় কাটেন। তার মনে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করে। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে যখন একটি কবিতা পূর্ণতা পায়, তখন তার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সুখ তার হাতের মুঠোয়। এই সৃষ্টির আনন্দ তাকে জাগিয়ে রাখে, তাকে শান্তি দেয়।একই শহরের অন্য প্রান্তে থাকেন কথাসাহিত্যিক রাশেদ জামান। তার টেবিলটাও উপন্যাসের খসড়ায় ভরপুর। সমাজ, মানুষ, তাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে তিনি গল্প বুনে চলেন। চরিত্রের জন্ম দেওয়া, তাদের হাসানো-কাঁদানো—এর মাঝে রাশেদ বাবু এক পরম মানসিক শান্তি খুঁজে পান। তিনি বিশ্বাস করেন, তার লেখার মাধ্যমে সমাজের কোনো না কোনো মানুষের ভেতরের একাকীত্ব দূর হবে।আর এই দুইজনের সৃষ্টির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ সাংবাদিক নিয়াজ মোর্শেদ। নিয়াজের শান্তি একটু অন্যরকম। সে যখন গভীর রাতে কোনো অবহেলিত মানুষের কষ্টের কথা, সমাজের কোনো দুর্নীতির চিত্র তার ল্যাপটপে টাইপ করে পত্রিকায় পাঠায়, তখন তার মনে হয় সে সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে। সত্যকে তুলে ধরার মাঝে যে শান্তি, তা নিয়াজকে প্রতিদিন নতুন করে লড়ার শক্তি দেয়।এই তিনজনের সকালটা শুরু হয় এক বুক শান্তি নিয়ে। তারা ভাবেন, তাদের লেখা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাবে। মানুষ আলোড়িত হবে। মেলাতে যখন আনন্দমোহনের কবিতার বই ডিসপ্লেতে সাজানো হয়, রাশেদ বাবুর উপন্যাসের প্রচ্ছদ চকচক করে, আর নিয়াজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় করে ছাপা হয়, তখন তাদের মনে হয় জীবন সার্থক। সৃষ্টির এই প্রাথমিক পর্যায়টি ছিল শুধুই শান্তিতে ঘেরা।দ্বিতীয় অধ্যায়: নির্মম বাস্তবতা ও ফুটপাতের ধুলো (গল্পের মধ্যের দিক)কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে জীবনের নির্মম রূপটি সামনে চলে আসে। শুরু হয় মেলা। বইমেলা কিংবা লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। মানুষ আসে, দলে দলে মানুষ আসে। তারা কবি আনন্দমোহনের বইটা হাতে নেয়, পাতা ওল্টায়, খুব আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুই-তিনটা কবিতা পড়েও ফেলে। আনন্দমোহন দূর থেকে বুক ভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকেন—এই বুঝি পাঠক বইটি কিনবে। কিন্তু না! পাঠক বইটি টেবিলে রেখে একটা সেলফি তুলে চলে যায়। মন্তব্য করে যায়, "দারুণ লিখেছেন কবি!" কিন্তু পকেট থেকে টাকা বের করে বইটি আর কেনা হয় না।রাশেদ জামানের উপন্যাসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। মেলায় এসে মানুষ বইয়ের প্রশংসা করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু মেলা শেষে যখন হিসাব করা হয়, তখন দেখা যায় প্রশংসার ঝুলি উপচে পড়লেও বিক্রির খাতা প্রায় শূন্য।সবচেয়ে করুণ দশা সাংবাদিক নিয়াজের। প্রতিদিন সকালে চায়ের দোকানে মানুষ নিয়াজের লেখা প্রতিবেদনটি পড়ে চায়ে চুমুক দেয়। টেবিল চাপড়ে বলে, "কী সাংবাদিক রে ভাই! কাঁপিয়ে দিয়েছে!" কিন্তু চায়ের দোকানদার যখন বলে, "ভাই, পত্রিকাটার দামটা দিন।" তখন অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, অথবা অন্যের কেনা পত্রিকাটা চেয়ে নিয়ে পড়ে টেবিলে ফেলে রেখে চলে যায়।একদিন বিকেলে কবি আনন্দমোহন শহরের সবচেয়ে বড় শপিং মলের সামনে দিয়ে হাঁটছিলেন। তিনি দেখলেন, একটি জুতো বিক্রির বহুজাতিক কোম্পানির ১০ তলা বিশাল শোরুম। কাঁচের দেয়াল, ভেতরে চিলিং এসি চলছে। মানুষ হাজার হাজার টাকা দিয়ে সেখান থেকে জুতো কিনছে কোনো দরদাম ছাড়া। জুতো বিক্রেতারা এসি রুমে টাই-কোট পরে রাজকীয়ভাবে ব্যবসা করছে। আর ঠিক সেই শপিং মলের নিচে, ফুটপাতের ধুলোবালির মধ্যে চট বিছিয়ে বিক্রি হচ্ছে আনন্দমোহনের কবিতার বই আর নিয়াজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেখা পত্রিকা।এই দৃশ্যটি আনন্দমোহনের বুকে তীরের মতো বিঁধল। মানুষের পায়ের জুতো বিক্রি হচ্ছে ১০ তলা এসি মার্কেটে, আর মানুষের মাথা ও মনন সচল রাখার উপাদান, জ্ঞান ও সাহিত্যের বই-পত্রিকা বিক্রি হচ্ছে ফুটপাতে, ধুলোবালি আর লাঞ্ছনায়!বয়স বাড়তে লাগল। রাশেদ বাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার চিকিৎসার জন্য টাকা নেই। ঘরে এক ফোঁটা ভালো খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। অথচ তার লেখা পড়ে কত মানুষ আনন্দ পেয়েছে! বৃদ্ধ বয়সে আনন্দমোহনের চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে এলো, কিন্তু তার জমানো পুঁজি বলতে কিছুই নেই। সাংবাদিক নিয়াজ সৎ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নানা হুমকির মুখে পড়ল, কিন্তু মাস শেষে তার বেতন এতটাই সামান্য যে সে নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের খরচ চালাতে পারছিল না। বৃদ্ধ বয়সে এই গুণী মানুষদের জীবনটা কাটতে লাগল তীব্র অভাব, অনাহার আর চরম কষ্টের ভেতর। সমাজে তাদের কদর কেবল মুখে মুখে, পকেটে তার কোনো প্রতিফলন নেই। তারা ধুঁকে ধুঁকে কষ্টের সাগরে ডুবতে লাগলেন।তৃতীয় অধ্যায়: জাগরণ ও সুখের সুবাতাস (গল্পের শেষের দিক)বহু বছর কষ্টের পর, সমাজে হঠাৎ একটা বড় পরিবর্তন এলো। নতুন প্রজন্মের একদল তরুণ এই বৈষম্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করল। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং বিভিন্ন সেমিনারে প্রচার করতে শুরু করল—"আমরা যদি জুতো কেনার জন্য এসি রুমে হাজার টাকা খরচ করতে পারি, তবে কবি, লেখক ও সাংবাদিকদের পরিশ্রমের মূল্য কেন দেব না? কেন তাদের বই ও পত্রিকা আমরা কিনে পড়ব না?"এই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের বিবেকে ধাক্কা লাগল। পরবর্তী বইমেলায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। মানুষ আর মেলায় গিয়ে শুধু বই উল্টে দেখল না, বরং ঝাঁপিয়ে পড়ে বই কিনতে শুরু করল। আনন্দমোহন আর রাশেদ বাবুর বইয়ের স্টলে উপচে পড়া ভিড়। মানুষ বুঝতে পারল, একজন লেখককে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তার লেখা কিনে পড়তে হবে।পত্রিকার সার্কুলেশনও হু হু করে বেড়ে গেল। মানুষ এখন আর চায়ের দোকানে ফ্রীতে পত্রিকা পড়ে না, প্রত্যেকে নিজের বাড়িতে পত্রিকা রাখা শুরু করল। নিয়াজের সততার পুরস্কার হিসেবে পত্রিকার মালিক পক্ষ তার বেতন ও রয়্যালটি বহু গুণ বাড়িয়ে দিল।গল্পের শেষ প্রান্তে এসে জীবনের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেল। সেই ধুলোবালির ফুটপাত থেকে কবি, লেখক আর সাংবাদিকরা উঠে এলেন সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে। কবি আনন্দমোহন এখন তার জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাচ্ছেন একটি সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টের এসি রুমে। তার জানলা দিয়ে সুন্দর শহর দেখা যায়। রাশেদ জামানের চিকিৎসার অভাব নেই, তার রয়্যালটির টাকায় এখন তার সংসার রাজকীয়ভাবে চলে। সাংবাদিক নিয়াজ এখন একটি বড় মিডিয়া হাউজের প্রধান, সেও এখন সচ্ছল এবং নিরাপদ জীবন যাপন করছে।যারা ইতিপূর্বে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে মারা গেছেন, সেইসব প্রয়াত কবি, লেখক ও সাংবাদিকদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় বড় সেমিনার হচ্ছে এবং তাদের পরিবারকে বিশাল অঙ্কের রয়্যালটি দেওয়া হচ্ছে। ফুটপাতের ধুলো ছেড়ে সাহিত্য আর সাংবাদিকতা আজ ১০ তলা ভবনের এসি রুমে মর্যাদার সাথে আসন করে নিয়েছে। কবি, লেখক ও সাংবাদিকরা তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের সঠিক পারিশ্রমিক পেয়েছেন। তাদের মুখে আজ কষ্টের কালো ছায়া নেই, আছে এক বুক তৃপ্তি আর পরম সুখের হাসি। আপনাদের লেখাটি কেমন লাগলো নিচে জানাবে কারণ লেখাটি লিখলাম এই জন্য যেগুলো আমার বেশিরভাগই চোখে বাজে। লেখায় ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমা করে দিয়েন ধন্যবাদ। হৃদয়ের স্পর্শ