Posts

গল্প

ছাদের সেই ভিনদেশী লোকগুলোর কথা আজও মনে পড়ে।

August 4, 2026

Shafin pro

8
View

হালিম মিয়ার কথায় আমি চমকে উঠলাম। বিছানা ছেড়ে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত তখনো একটা বেজে দশ মিনিট! তার মানে এতক্ষণ যা ঘটল, তা মাত্র কয়েক মিনিটের একটা দুঃস্বপ্ন ছিল?হালিম মিয়া আমার হাতে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। আমি এক চুমুকে পুরো গ্লাসটা খালি করে ফেললাম। কিন্তু পানি খাওয়ার পরই আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ঘরের কোণার দিকে চোখ যেতেই দেখলাম—মেঝেতে একটা কাঁচের গ্লাস ভাঙা পড়ে আছে, আর চারপাশটা পানিতে ভাসছে! ঠিক যেমনটা আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। ভয়ার্ত চোখে হালিম মিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "হালিম, এই গ্লাসটা কখন ভাঙল?"হালিম মিয়া অবাক হয়ে বলল, "স্যার, আপনি যখন ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠলেন, ঠিক তখনই টেবিল থেকে গ্লাসটা ধুপ করে পড়ে ভেঙে গেল। আর আপনার পোষা বিড়ালটাও ভয় পেয়ে ঘর থেকে মেও করে বেরিয়ে গেল।"আমার গায়ের পশম আবার দাঁড়িয়ে গেল। টেবিলের গ্লাস নিজে নিজে কীভাবে পড়ে যায়? তার মানে কি পুরোটাই স্বপ্ন ছিল না?হালিম মিয়াকে বিদায় দিয়ে আমি আবার বিছানায় শুলাম, কিন্তু ঘুম আর এলো না। জানলা দিয়ে আসা হিমশীতল বাতাসটা যেন বারবার আমাকে সেই অদ্ভুত তরুণ-তরুণীদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। তাদের সেই অপার্থিব সৌন্দর্য, সেই স্বর্গীয় আনন্দ আর অদ্ভুত শান্তি আমাকে ভেতর থেকে টালমাটাল করে দিচ্ছিল। যদি ওটা শুধুই স্বপ্ন হয়, তবে এত শান্তি আমার মনে কেন বিরাজ করছে? আর যদি ওটা বাস্তব হয়, তবে এই সাত দিন সময় কোথায় হারিয়ে গেল?পরদিন সকালে বাংলোর বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম। ভোরের আলোয় জঙ্গলটাকে আর ততটা ভয়ানক লাগছিল না। এমন সময় হালিম মিয়া এসে একটা খবরের কাগজ আমার টেবিলের ওপর রাখল। চায়ের কাপে চুমুক দিতে যাব, এমন সময় খবরের কাগজের প্রথম পাতার একটা হেডলাইনে আমার চোখ আটকে গেল।সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা—"বনের গভীর বাংলো থেকে এক পর্যটক নিখোঁজ, সাত দিন পর আজ ভোরে উদ্ধার!"চমকে উঠে নিজের নামটা দেখলাম। হ্যাঁ, ওখানে আমার নাম 'রাজ্জাক খান'-ই লেখা আছে! কাগজের তারিখটার দিকে তাকিয়ে আমার হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে গেল। আজ চার তারিখ নয়, আজ এগারো তারিখ! ক্যালেন্ডার থেকে সত্যি সত্যি সাতটা দিন গায়েব হয়ে গেছে!তাহলে হালিম মিয়া কাল রাতে কেন বলল যে আমি মাত্র কয়েক মিনিট ঘুমিয়েছি? ভয়ে মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রার মতো জমে গেলাম আমি। আস্তে করে মাথা তুলে সামনে দাঁড়ানো হালিম মিয়ার দিকে তাকালাম। হালিম মিয়া আমার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি হাসল। সেই হাসিতে কোনো মানুষের ছোঁয়া ছিল না।হঠাৎ আমার মনে পড়ল, সেই সাত দিনের অদ্ভুত সফরে আমি যাদের দেখেছিলাম, তাদের মধ্যে একজন ঠিক এই হালিম মিয়ার মতোই দেখতে ছিল! তবে কি তারা কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী, যারা মানুষের রূপ ধরে এই নির্জন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়? নাকি এই বাংলোটাই অন্য কোনো জগতের প্রবেশদ্বার?আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালাম না। স্যুটকেসটা টেনে নিয়ে গাড়ির দিকে ছুটলাম। পেছনে ফেলে এলাম সেই মায়াবী জঙ্গল, রহস্যময় বাংলো আর অদ্ভুত সেই শান্তির স্মৃতি। আমি রাজ্জাক খান আবার নিজের চেনা শহরে ফিরে এসেছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনের একটা অংশ আজও সেই নির্জন জঙ্গলের ছাদেই রয়ে গেছে।

Comments

    Please login to post comment. Login