স্মৃতির অশ্রুজল
আমারও একদিন বয়স হবে, চুলে পাক ধরবে, শরীর ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে আসবে। তখন হয়তো আজকের এই দিনগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে দামী স্মৃতি হয়ে ফিরে আসবে। মনে পড়বে আমি কুমিল্লায় জন্ম নিয়েও কুমিল্লায় থাকতে পারিনি। মনে পড়বে, কতবার কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের পথে যেতে যেতে ছোট্ট শিশুর মতো কেঁদেছি, শুধু এই ভেবে ইশ, যদি কুমিল্লাতেই আজীবন থাকতে পারতাম!
মনে পড়বে আমার দীদার পাশে ঘুমিয়ে থাকার কথা। রাতে দীদার মুখের দিকে তাকিয়ে গল্প শোনার কথা। দীদার কণ্ঠের সেই পরিচিত শব্দগুলো, মাথায় স্নেহের হাত, কাছে থাকার সেই শান্তিটুকু একদিন হয়তো সবই শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে। তখন হয়তো চোখ বন্ধ করলেই দীদাকে দেখতে পাব, কিন্তু হাত বাড়িয়ে আর ছুঁতে পারব না।
মনে পড়বে দাদুকে দেখতে কুমিল্লায় আসার দিনগুলো। দাদুকে দেখলেই আমার মন আনন্দে ভরে যেত। মনে হতো, পৃথিবীতে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কোথাও নেই। অথচ ফিরে যাওয়ার সময় বুকটা ভার হয়ে আসত, চোখে পানি জমত। কুমিল্লা ছেড়ে চট্টগ্রামের পথে যেতে যেতে সেই কান্না আজও যেন আমার ভেতরে কোথাও জমে আছে।
দাদু ২০১৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু যাওয়ার আগে তাঁর একটি কথা আমার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য লিখে দিয়ে গেছেন—“আমার উপর কোনোদিন রাগ করিও না ভাই, আমি তোমাদের খাওয়াতে পারি নাই, তুষ্ট করতে পারি নাই।” আজও সেই কথাগুলো মনে পড়লে বুকটা কেঁপে ওঠে। একজন মানুষের ভালোবাসার কত গভীরতা থাকলে বিদায়ের আগে এমন কথা বলতে হয়!
আমার দীদার বয়সও এখন নব্বইয়ের ওপরে। ভগবানের কৃপায় তিনি যতটুকু পারেন চলাফেরা করেন, কথা বলেন, গল্প করেন। কিন্তু আমি জানি, পৃথিবীর নিয়ম কাউকে চিরদিন কাছে রাখে না। একদিন হয়তো দীদাও আমাকে বলবেন, “ভাই, আমার ওপর রাগ করিস না, তোদের জন্য যতটুকু পারলাম করতে পারিনি।” সেই দিনটি যদি সত্যিই আসে, জানি না কীভাবে নিজেকে সামলাব। হয়তো তখন দীদার কথার উত্তর দেওয়ার মতো শব্দই আমার মুখে থাকবে না—শুধু চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরবে।
শুনেছি, ছেলেদের নাকি কান্না করতে নেই। কিন্তু মানুষ কি সব কান্না লুকিয়ে রাখতে পারে? কিছু স্মৃতি বুকের এত গভীরে গিয়ে বসে থাকে যে, সেগুলো মনে পড়লে চোখের পানি নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেয়। কিছু মানুষকে হারানোর ভয় এত গভীর হয় যে, শক্ত মানুষও একদিন শিশুর মতো কাঁদে।
মানুষ পৃথিবীতে চিরস্থায়ী নয়। কেউ কারও কাছে চিরদিন থাকে না। আজ যে মানুষটি পাশে বসে গল্প করছে, কাল হয়তো সে শুধু একটি ছবির মধ্যে থাকবে। আজ যে হাতটি মাথায় স্নেহের পরশ দিচ্ছে, একদিন সেই হাতটি আর থাকবে না। থাকবে শুধু স্মৃতি আর সেই স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে একজন মানুষ, যার চোখে অশ্রু থাকবে কিন্তু সেই অশ্রু মুছে দেওয়ার মানুষটি হয়তো আর থাকবে না।
তাই যতদিন বেঁচে আছি, মানুষকে ভালোবাসতে চাই। কারও মনে কষ্ট দিতে চাই না। যতটুকু পারি মানুষের উপকার করতে চাই, ভালো ব্যবহার করতে চাই, আপন করে নিতে চাই। কারণ মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলেও তার ভালোবাসা, তার ব্যবহার, তার মায়া আর তার করা ভালো কাজগুলো অন্য মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
একদিন আমিও এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাব। আমারও একদিন সবকিছু পিছনে ফেলে যেতে হবে। হয়তো তখন আমারও কোনো প্রিয় মানুষ আমার কথা মনে করে চোখের পানি ফেলবে। কিন্তু তার আগে যতদিন জীবন আছে, আমি আমার প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে ভালোবাসায় থাকতে চাই।
আর কোনো এক নির্জন সন্ধ্যায় যখন ছোটবেলার কথা মনে পড়বে কুমিল্লার সেই দিনগুলো, দীদার পাশে ঘুমানো, তাঁর গল্প শোনা, দাদুকে দেখতে আসা, কুমিল্লা ছেড়ে যাওয়ার সময় চোখের পানি তখন হয়তো আমি নীরবে কাঁদব।
হয়তো চোখের জল মুছে দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না।
তবুও সেই অশ্রুর ভেতরেই বেঁচে থাকবে আমার শৈশব, আমার কুমিল্লা, আমার দাদুর স্মৃতি, আমার দীদার ভালোবাসা আর আমার জীবনের সবচেয়ে আপন কিছু দিন।
আদিত্য ভৌমিক
১৩/৮/২০২৬
8
View