আমার জীবন গল্প
আমার নাম আদিত্য ভৌমিক।
আমার জন্ম ২২ এপ্রিল ২০০০। আমার জন্মস্থান কুমিল্লা। কুমিল্লার নামকরা ডাক্তার যোবায়দা হান্নানের হাসপাতালে আমার জন্ম হয়েছিল। পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলাম সেই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েই। অথচ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি হলো, যে মাটিতে আমার জন্ম, সেই কুমিল্লার মাটিতে আমি ছোটবেলা থেকে বড় হতে পারিনি।
জন্মস্থানটা আমার, অথচ শৈশবটা সেখানে নয়।
কখনো কখনো মনে হয়, মানুষ তার জন্মভূমিকে যতটা আপন করে পায়, আমি হয়তো ততটা সুযোগই পাইনি। কুমিল্লার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যেন সবসময়ই একটু দূরের। খুব আপন, অথচ ছুঁয়ে দেখার মতো নয়। যে মাটিতে আমার জীবনের প্রথম কান্না, সেই মাটিতেই আমার শৈশবের হাসিগুলো জমে রইল না।
বর্তমানে আমি চট্টগ্রামে থাকি।
আমার ছোটবেলাটা অন্য অনেক শিশুর মতো ছিল না। যখন অন্য শিশুরা নিয়ম করে স্কুলে যেত, বই খাতা নিয়ে স্বপ্ন দেখত, তখন আমি পড়াশোনার প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলাম না। নিয়মিত স্কুলে যেতাম না। শেষ পর্যন্ত পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্তই পড়াশোনা করেছি।
আজ যখন বড় হয়ে পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকাই, তখন নিজের ছোটবেলার অনেক কিছুই নতুন করে বুঝতে পারি।
তখন বুঝিনি, আমি স্কুলে না গেলে আমার মা কতটা কাঁদতেন।
একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা ভয় পেলে নিজের চোখের জল লুকাতে পারেন না, সেটা তখন বুঝিনি। আমার মা আমাকে ভালো দেখতে চেয়েছিলেন। আমার ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, সেই আশায় আমাকে ভারত পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু কিছুই বদলাতে পারেনি আমাকে।
আজও মায়ের সেই কান্নার কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে। মনে হয়, সেদিন যদি বুঝতাম মায়ের চোখের প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর মূল্য, তাহলে হয়তো মাকে এতটা কাঁদতে হতো না।
আমার জীবনে কিছু দুর্বলতা আছে, কিছু সমস্যা আছে।
কেউ যখন আমার সঙ্গে উল্টাপাল্টা কথা বলে, অপমান করে, কটু কথা শোনায়, কিংবা এমন কিছু বলে যা আমার আত্মসম্মানে আঘাত করে, তখন আমি খুব কষ্ট পাই। আমার মাথা গরম হয়ে যায়। অনেক সময় নিজের রাগকেও নিজের কাছে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
আমার মা আজও বলেন,
“কারও সঙ্গে রাগ করিস না। সবসময় হাসিখুশি থাকিস।”
আমি মায়ের কথা শুনতে চাই।
কিন্তু জীবন কি সবসময় মায়ের কথার মতো সহজ?
মানুষের কিছু কথা খুব গভীরে গিয়ে লাগে। কিছু আচরণ বাইরে থেকে সামান্য মনে হলেও ভেতরে ভেতরে একজন মানুষকে অনেকটা ভেঙে দিতে পারে। আমিও ভেঙে যাই।
তখন হাসিখুশি থাকার কথা মনে থাকে না।
আমি খুব বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলি না। কেন জানি নীরবতাকেই আমার আপন মনে হয়। অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও কখনো কখনো নিজেকে ভীষণ একা মনে হয়। তাই একা বসে থাকা, চুপ করে থাকা, এসবের মধ্যেই আমি এক ধরনের শান্তি খুঁজে পাই।
আমার নীরবতারও একটা গল্প আছে।
সেখানে অনেক কথা আছে।
অনেক অভিমান আছে।
অনেক কষ্ট আছে।
অনেক না বলা প্রশ্ন আছে।
শুধু সেই কথাগুলো সবাইকে বলা হয়ে ওঠে না।
আমার পড়াশোনা বেশি নয়। বড় কোনো ডিগ্রি নেই। জীবনের পথে হয়তো অনেকের মতো বড় কোনো পরিচয়ও তৈরি করতে পারিনি।
কিন্তু আমার হৃদয়ের ভেতরে একটি জিনিস আছে, কবিতা।
আমি কবিতা লিখতে ভালোবাসি।
হয়তো কোনোদিন বড় কবি হতে পারব না। হয়তো আমার লেখা কোনো বিখ্যাত বইয়ের পাতায় জায়গা পাবে না। হয়তো আমার কবিতা পড়ে কেউ হাততালি দেবে না।
তবুও আমি লিখে যাব।
কারণ কবিতা আমার কাছে শুধু কিছু শব্দ নয়।
কবিতা আমার নীরবতার ভাষা।
আমার চোখের জলের ভাষা।
আমার অভিমানের ভাষা।
আমার ভালোবাসার ভাষা।
যে কথাগুলো কাউকে বলতে পারি না, সেগুলোই কখনো কাগজের কাছে বলে দিই। মানুষকে বলতে না পারা কথাগুলো কবিতার কাছে রেখে দিই।
হয়তো কাগজ আমাকে বিচার করে না।
হয়তো শব্দগুলো আমাকে ছেড়ে চলে যায় না।
জীবন আমাকে ধীরে ধীরে একটা কঠিন সত্য শিখিয়েছে। এই পৃথিবীতে কেউ চিরদিন কারও পাশে থাকে না।
মানুষ এই পৃথিবীতে অল্প সময়ের অতিথি।
আজ যে মানুষটি পাশে আছে, কাল সে হয়তো অনেক দূরে চলে যাবে।
আজ যে মানুষটি আপন করে কথা বলছে, কাল হয়তো সেই মানুষটির কাছেই আমি অপরিচিত হয়ে যাব।
সম্পর্ক বদলায়।
মানুষ বদলায়।
সময় বদলায়।
শুধু কিছু স্মৃতি থেকে যায়।
তাই অনেকে বলে, মানুষের কথা চুপচাপ শুনে যেতে হয়, অনেক কিছু হজম করে নিতে হয়।
কিন্তু সত্যি বলতে, আমি এখনো সেই মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি।
আমি কষ্ট পেলে কষ্ট পাই।
অপমানিত হলে ভেঙে পড়ি।
রাগ হলে রাগ করি।
অভিমান হলে চুপ হয়ে যাই।
আর ভালোবাসলে মন উজাড় করে ভালোবাসি।
আমার জীবনের আরেকটি বড় শূন্যতা হলো, আমার কোনো আপন ভাই নেই।
ভাই বলে ডাকার মতো, বুকের ভেতর থেকে আপন বলে জড়িয়ে ধরার মতো একজন মানুষকে আমি পাইনি। এই অভাবটা হয়তো বাইরে থেকে খুব ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটি অনেক বড় এক শূন্যতা।
কখনো কখনো মনে হয়, জীবনে যদি একজন আপন ভাই থাকত, তাহলে হয়তো কিছু কষ্ট ভাগ করে নেওয়া যেত।
কিছু কান্না লুকাতে হতো না।
কিছু কথা একা একা বলতে হতো না।
আমার জীবনে অপূর্ণতা অনেক।
না পাওয়া অনেক।
অভিমান অনেক।
প্রশ্ন অনেক।
কিন্তু উত্তর খুব কম।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় যখন ভাবি, আমার জন্ম কুমিল্লায়, অথচ কুমিল্লার মাটিতে আমার শৈশব গড়ে ওঠেনি।
আমার জন্মভূমি আমার কাছে যেন নিজের হয়েও কিছুটা পর হয়ে আছে।
কখনো কখনো মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা হয়তো এমন একটি জায়গায় কেটে গেছে, যার স্মৃতিই আমার কাছে পুরোপুরি নেই।
কী অদ্ভুত জীবন!
যে মাটিতে জন্মেছি, সেই মাটিকে পুরোপুরি নিজের করে পাওয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়নি।
তবুও আমি হেরে যেতে চাই না।
কারণ আমি জানি, আমার জীবন হয়তো অন্যদের মতো সুন্দরভাবে সাজানো নয়। আমার পড়াশোনা কম। আমার রাগ আছে। আমার অভিমান আছে। আমার দুর্বলতা আছে। আমার আচরণের অনেক কিছু হয়তো অন্যদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
কিন্তু আমার হৃদয়ের ভেতরেও ভালোবাসা আছে।
অনেক ভালোবাসা।
আমি শুধু চাই, মানুষ আমাকে বিচার করার আগে একবার আমার গল্পটা শুনুক।
আমাকে নিয়ে হাসার আগে একবার ভাবুক, হয়তো এই মানুষটার বুকের ভেতরেও এমন কিছু কান্না আছে, যার শব্দ কেউ কোনোদিন শোনেনি।
হয়তো আমার রাগের পেছনে কোনো পুরোনো কষ্ট আছে।
হয়তো আমার নীরবতার পেছনে অনেক না বলা কথা আছে।
হয়তো আমার একাকীত্বের পেছনে এমন কিছু শূন্যতা আছে, যার কথা আমি কাউকে বলতে পারিনি।
আমি বড় কবি হতে না পারলেও কবিতা লিখে যাব।
বড় মানুষ হতে না পারলেও একজন ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করে যাব।
জীবন যতদিন আমাকে সুযোগ দেবে, ততদিন আমার অনুভূতিগুলো শব্দ হয়ে কাগজে জন্ম নেবে।
হয়তো একদিন আমি থাকব না।
হয়তো আমার নামটাও একদিন মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে।
কিন্তু আমার লেখা কোনো একটি কবিতা হয়তো কোনো পুরোনো খাতার পাতায় পড়ে থাকবে।
হয়তো কোনো এক অচেনা মানুষ একদিন সেই কবিতাটি পড়বে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকবে।
তারপর হয়তো মনে মনে বলবে,
“মানুষটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা ছিল অসাধারণ রকমের গভীর।”
সেদিন হয়তো আমার জীবনের সমস্ত না পাওয়া একটু হলেও পূর্ণতা পাবে।
কারণ আমি খ্যাতি চাই না।
আমি শুধু চাই, আমার অনুভূতিগুলো যেন হারিয়ে না যায়।
আমার কান্নাগুলো যেন একদিন অর্থহীন না হয়ে যায়।
আমার নীরবতাগুলো যেন কোনোদিন শব্দহীন না থাকে।
এটাই আমার জীবন।
অপূর্ণ।
অসম্পূর্ণ।
অভিমানী।
নীরব।
কখনো রাগী।
কখনো ভীষণ আবেগী।
অনেক না পাওয়ায় ভরা।
অনেক অশ্রুতে ভেজা।
তবুও এই জীবন আমার।
এই কষ্টগুলো আমার।
এই স্মৃতিগুলো আমার।
এই একাকীত্বও আমার।
আর যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন আমার বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো কবিতা হয়ে কাগজে জন্ম নেবে।
হয়তো পৃথিবী আমাকে মনে রাখবে না।
কিন্তু আমি আমার প্রতিটি কষ্টকে শব্দে বাঁচিয়ে রাখব।
কারণ আমার কাছে কবিতা শুধু লেখা নয়।
কবিতা হলো আমার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।
আদিত্য ভৌমিক
১ সেপ্টেম্বর ২০২৬