পুজোর গন্ধ, ফেরার টান
আদিত্য ভৌমিক
তারিখ ১৩/১০/২০২৬
কাশফুলের সাদা ঢেউ যখন শরতের হাওয়ায় দুলে ওঠে তখনই বুকের ভেতরটা কেমন যেন উথালপাথাল করে। এ যে মায়ের আসার বার্তা।
বছর কুড়ি পর আজ আবার নিজের পাড়ার গলিতে পা রাখলাম। শহরের কাচের দেওয়ালে ঘেরা অফিস ক্যালেন্ডারের লাল দাগ আর অসংখ্য ব্যস্ততার ভিড়ে ঢাকের শব্দটাই কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ গলির মোড়ে পা দিতেই সেই শব্দ আমাকে জড়িয়ে ধরল ঠিক যেমন মা ছেলেকে বুকে টেনে নেন।
মাথার ওপর রঙিন পতাকার সারি বাতাসে কাঁপছে। বাঁশের কাঠামোয় সোনালি আলোর মালা ঝলমল করছে আর তার মাঝখানে মণ্ডপের গম্বুজটা শরতের বিকেলের আলোয় যেন সোনা দিয়ে গড়া। ভেতরে দশভুজা মা দুর্গা দুপাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী পায়ের কাছে সিংহ। মায়ের চোখ দুটি যেন সোজা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। ওই চোখে অভিমান নেই আছে শুধু অপার স্নেহ। যেন বলছে এতদিনে এলি বাবা
ধুনুচির ধোঁয়া পাক খেয়ে উঠছে আকাশের দিকে। লাল পাড় সাদা শাড়িতে মেয়েরা নাচছে। কপালে সিঁদুরের টিপ হাতে শাঁখা পলা ঠোঁটে অনাবিল হাসি। হলুদ পাঞ্জাবি আর কোঁচানো ধুতিতে পাড়ার দাদারা ধুনুচি হাতে তালে তালে পা ফেলছেন। খালি পায়ে মাটির সোঁদা গন্ধ মেখে নাচার সেই আনন্দ কোনো দামি জুতোয় পাওয়া যায় না।
পাশেই ঢাকি কাঁধে ঢাক ঝুলিয়ে বাজিয়ে চলেছেন। মাথায় লাল ফেট্টি ঢাকের মাথায় রঙিন পালক। প্রতিটি কাঠির ঘায়ে যেন হৃদয়ের একেকটা বন্ধ দরজা খুলে যাচ্ছে। ওই ঢাকের তালে আমার শৈশব ফিরে এল।
মনে পড়ল ছোটবেলায় বাবার কাঁধে চড়ে ঠাকুর দেখতাম। বাবা বলতেন ভালো করে দেখে নে মায়ের মুখটা মনে রাখিস। মা নতুন শাড়ির আঁচলে আমার হাত ধরে রাখতেন ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে। আজ বাবা নেই মাও নেই। শুধু রয়ে গেছে এই গলি এই ঢাকের শব্দ আর ধুনুচির ধোঁয়ায় মেশানো স্মৃতির গন্ধ।
দোতলার বারান্দা থেকে কয়েকটি মুখ ঝুঁকে দেখছে। কেউ হাসছে কেউ হাত নাড়ছে। ওদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন আরে ভৌমিকবাড়ির ছেলে না কবে এলি রে
গলাটা কেঁপে গেল আমার। চোখের কোণে জল জমে উঠল। এতগুলো বছর পরেও এই পাড়া আমাকে ভোলেনি। শহর আমাকে নাম দিয়েছে পরিচয় দিয়েছে কিন্তু আপন বলে ডাকার মানুষ এখানেই রয়ে গেছে।
ভিড়ের মাঝে এগিয়ে গেলাম। একজন অচেনা মেয়ে হেসে আমার হাতে একটা ধুনুচি ধরিয়ে দিয়ে বলল আসুন না কাকু নাচুন। আমি প্রথমে সংকোচ করলাম। তারপর ঢাকের তাল যখন আরও জোরালো হয়ে উঠল সব দ্বিধা ধোঁয়ার সঙ্গে উড়ে গেল। আমিও পা মেলালাম সবার সঙ্গে। চোখের জল আর হাসি একসঙ্গে মিশে গেল।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম পুজো আসলে শুধু উৎসব নয়। এ হলো ফিরে আসার নাম। যে যত দূরেই যাক মা ঠিক ডেকে আনেন তাঁর সন্তানদের। বছরের এই কটা দিন আমরা সবাই আবার ছোট্ট হয়ে যাই সব অভিমান ভুলে যাই সব দূরত্ব মুছে ফেলি।
সন্ধ্যা নামল। মণ্ডপের আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠল আর মায়ের মুখখানা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাত জোড় করে দাঁড়ালাম। মুখে কোনো মন্ত্র এল না শুধু মনে মনে বললাম মা আমি ফিরে এসেছি।
কাশফুল তখনো দুলছিল হাওয়ায় যেন মাথায় হাত বুলিয়ে বলছিল যাক এবার তুই ঘরে ফিরলি।
আর ঢাকের শব্দ সে তো থামেনি। সে আজও বাজছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরে যতদিন শরৎ আসবে যতদিন কাশফুল ফুটবে যতদিন মা আসবেন।
ঢাকের তালে ফিরে আসুক সব হারানো ভালোবাসা। শুভ শারদীয়া