হুম হুম সাফিনের মা এতো ভেবে কী হবে? তোমার ছেলে কেমন আছে, কি করছে, কি খাচ্ছে - খাচ্ছে নাকি না এতোসব তো জীবিত থাকতেই ভাবতে... ওই খোকা বাড়ি ফিরবে বলে অপেক্ষা করে করে চিন্তার কি যেনো রোগ, পেশার পেশারটা তো সেভাবেই বাঁধিয়েছিলে। রেঁধে রেঁধে বোধহয় হাতের চামড়া কঠিন করে ফেলেছো শেষ পর্যন্ত। তোমাকে আর কী বলবো, তোমার সাহেব, তোমার আগে এই ঘরের ভাড়াটে আর কি, আকবর ভাইও আমাদের তোমার যত গুণের কথা বলে মাথা পাকাতেন ঠিক ততোটাই তোমার ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আর মেয়েকে অবহেলার কথা বলতেন।
আরেক ঘর থেকে শেফু কাকা বলে উঠলেন, ও মজিদ ভাই, মরেও আপনার অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর স্বভাব গেলো না, ভাবি আইছে হপ্তাখানেক হয় নাই এখনি এতো কিচ্ছু জিগায়বার কাম কী?
পাত্তাতাত্তা না দিয়ে মজিদ বল্লেন, দেখো শেফু, কথা না বলে যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না, ঠিক একই ভাবে কথা না বলে মানুষের মৃত জীবনও কাটাতে পারে না, এই আমরা কথা বলতে পারছি দেখেই বিচারের অপেক্ষার অস্তিত্বের পথে বিরাজমান আছি, বুঝলে?
কী জানি, মিঞা ভাই, আপনে কইছেন আলা, ঠিগই কইছেন, তোয় এ একখান প্রশ্ন আমারো মনে খেলছে, আপনে মাইয়াডার লগে অমন্ডা ক্যন করতেন, কিচ্ছু মনে না করলে জানবার মন চায়...
কাফনের কাপড় ঠিক করতে করতে সাফিনের মা কড়া গলায় বলে, অর্পা আমার জীবন আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে, ও একটা কাল নাগিনী, আমার রূপ, আমার অহংকার সব আমি ওর মধ্যে দেখতে পাই, আমি যেন আমাকেই দেখছি... আমার ওকে সহ্য হয় না।
মজিদ কিছুটা বিরক্তির সাথেই বলে, আপনার নিজের মেয়ে আপনার মতো হবে না তো কার মতন হবে, বলেন?
সাফিনের মা ঠান্ডা কন্ঠে বলে, দেখুন আমি মরেছি, মরার আগেও শান্তির দেখা পাই নাই, এখন মরার পরেও আপনারা আমাকে অশান্তির মধ্যে রেখেছেন। আমি আপনাদের কোনো কথার উত্তর দিতেও বাধ্য নই, শুনতে পারতে না পারলে আরো বেশি ভালো হতো।
গতমাসের ২৩ তারিখে তরুণ ডাক্তার ও লেখক জুবায়ের আহমেদ সচরাচর খুব কথা বলেন, সম্ভবত মাত্র ২৭ বছর বয়সের জীবনে কী কী করতে পারলেন আর কী কী বাঁকি রয়ে গেলো সেসব ভেবেই বোধহয় চিন্তামগ্ন থাকেন। তবে, আজ তিনি একটু গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু একটা বলবার জন্যে উদ্যত হলেন...
তখনই আনন্দিত শেফু কাকা বলে উঠলেন, ভাতিজা কিছু কইবা নাকি?
জ্বি, মানে আমি বলছিলাম, কিছু মনে না করলে, কিছু তথ্য আপনাদের জানাতে চাচ্ছিলাম।
সাফিনের মা, এই প্রথম বারের মতো যুবকটির দিকে ভালো করে দেখে ভাবলেন যেনো তিনি তার আদরের সাফিনকে দেখছেন, কিছু না বলে আগ্রহের সাথে চেয়ে রইলেন।
মজিদ সাহেব বললেন, লেখক বলবে আমরা শুনবো এটাইতো জগৎ সংসারের রীতি, বল বল , কি জানাতে চাও আমাদের...
দেখুন খালা, আপনার বিষয়টা একটি অসাধারণ এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে ভরপুর বিষয়। মা ও মেয়ের এই জটিল সম্পর্ককে আমরা ডাক্তারি ভাষায় বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বলি। যেখানে, রোগী তীব্র আত্ম-ঘৃণা (Self-loathing) এবং পরিচয়হীনতায় ভোগে...
আপনি আসলে মনে-প্রাণে নিজেকে ঘৃণা করেন। আপনার মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে যখন মায়ের অবিকল রূপ (কথাবার্তা, জেদ বা আচরণ) ধারণ করে, তখন আপনি আপনার মেয়ের মাঝে নিজের সেই "ঘৃণ্য রূপ" দেখতে পান। আপনি ভাবেন, আপনি নিজে যেমন নিজের জীবন নষ্ট করেছেন, মেয়েও তেমন করবে। এই অবচেতন ভয় ও তীব্র আত্ম-ঘৃণা থেকে আপনার মেয়েকে আপনি সহ্য করতে পারেন না এবং দূরে ঠেলে দেন। আর তখনই আপনার নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD) — অহংকার ও প্রতিযোগী মনোভাবের জন্য জনপ্রিয় মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা নিজের মধ্যে জাগ্রত হয়। নার্সিসিস্ট হিসেবে আপনি নিজ সন্তানকে নিজের একটি অংশ বা "এক্সটেনশন" মনে করেন এবং আপনি চান আপনার সন্তান যেন সবসময় আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং আপনার চেয়ে যেন কখনোই ভালো কিছু করতে না পারে।
এগুলো আপনার কথা থেকেই বলে দেয়া সম্ভব। যেমন, আপনি নিজেই বললেন, আপনি অত্যন্ত অহংকারী এবং নিজেকে সবার চেয়ে সেরা ভাবার প্রবণতা আপনার ছিল। আপনার মেয়ে যখন মায়ের মতোই জেদি, রূপবতী বা প্রতিভাবান হয়ে ওঠে, তখন আপনি মেয়েকে নিজের "প্রতিযোগী" বা রাইভাল (Rival) মনে করা শুরু করতেন। এখাই আপনার মেয়ে আপনার মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে—এই ঈর্ষা থেকে আপনি আপনার মেয়েকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করেন, কারণ মেয়েটি হুবহু আপনার মতোই শক্তিশালী চরিত্রের। এর সাথে , আমি ধারণা করছি আপনার প্রসবোত্তর বিষণ্নতা যা পরবর্তীতে সাইকোসিসে রূপ নিয়ে থাকতে পারে (Postpartum Psychosis) —
আপনি যদি মেয়ের জন্মের পর থেকেই তাকে ঘৃণা করেন, তবে এই রোগের লক্ষ্মণ আপনার মধ্যে উপস্থিত।
আপনার মেয়ের জন্মের পর আপনার তীব্র মানসিক রোগ (Psychosis) হয়। আপনার অবচেতন মন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আপনার মেয়েটি আপনার সমস্ত ভালো বৈশিষ্ট্য চুরি করে নিয়েছে এবং মেয়েটি আসলে আপনার নিজেরই একটি "অভিশপ্ত প্রতিচ্ছবি"।
মেডিকেল টার্মের পাশাপাশি আপনি এটিকে "মিরর সিন্ড্রোম" (Mirror Syndrome) হিসেবে ধরতে পারেন।আপনার ভাষায় —"আমি তোকে ঘৃণা করি না, আমি তোর মাঝে বেঁচে থাকা আমার অতীতকে ঘৃণা করি।"
এই বিরাট ডাক্তারি বিবরণ দিয়ে, জুবায়ের কিছুক্ষণ থামলেন, তখন আর কেউ কিছু বলছে না। সবাই চুপচাপ।
গ্রীষ্মের তাপমাত্রা চমৎকার বেড়েছে বোধহয়। তবুও কবরস্থানের এলাকা ঘিরে অদ্ভুৎ ঠান্ডা অবহে তপ্ত বাতাসের ধাক্কায় তখন গাছপাতার শব্দের সাথে দূর থেকে গাড়ির হর্ণ ভেসে আসছে... বাক্স বাক্স ঘর গুলির ছাদের উপরে মাঝে মাঝে জীবিত হাঁটাচলা আর মালিদের আনাগোনা শুনি আমরা। কখনো মোনাজাত আর কান্নার ধ্বনি আমাদের আনন্দিত এবং একই সাথে মর্মাহত করে, এখনো কী করে এই বোধ তৈরী হচ্ছে সেটা অবোধ ভাবনার প্রতিফলন। আমরা সব থেকে বেশি শুনি ফকির মিস্কিন্দের জীবন গল্প আর ঝগড়াঝাটি। এখানে আমাদের আজানের সময়টুকু বাদে বাকি সবসময়ের তেম্ন কোনো নিয়ম নেই... আমরা খুশি হই নতুন কোন লাশ নিয়ে আসলে, আমাদের কমিউনিটি বৃদ্ধি হচ্ছে, একদিন মানুষের বিলুপ্তি হবে ~ তখন হয়ত আমরা আমাদের বিরাজমান অপেক্ষার শেষ বিচারের অস্তিত্বের শেষে নতুন কোনো জগতে পৌঁছাতে পারব - জীবিত জীবনে যেগুলো স্বর্গ অথবা নরক বলে পরিচিত। অপরিচিতদের এই মাটির ভেতরের গর্ভে আমাদের অপেক্ষা অপেক্ষারত...
এসব,ভেবে ভেবে জুবায়ের আক্ষেপ করেনা, অপেক্ষাকে সে উপেক্ষা করতে থাকে।
7
View