ডিমের দড়ি ও অদৃশ্য অপরাধী:
একটি রূপক গল্পছোটবেলার সেই পরিচিত ছড়াটা মনে পড়লেই অদ্ভুত এক ঘোর লাগে—"ডিম পাড়ে দড়ি,
কে বেঁধেছে দড়ি?" শৈশবে মনে হতো,
ডিমের গায়ে বুঝি সত্যিই কোনো লুকানো দড়ি আছে,
যা বড়রা দেখতে পায় কিন্তু আমরা পাই না।
কিন্তু আজ, হাতে একটি আস্ত ডিম নিয়ে এপাশ-ওপাশ করে ঘুরিয়ে দেখার পর এক অমোঘ সত্য সামনে ধরা দিল।
ডিমের গায়ে দড়ি বাঁধার কোনো জায়গা নেই। যতই চেষ্টা করি, তা পিছলে যায়।
ডিমের কোনো মাথা বা লেজ নেই, নেই কোনো স্থায়ী অবলম্বন—তাই দড়ি বাঁধা অসম্ভব।
এই সাধারণ অভিজ্ঞতাই আমাদের জীবনের জটিল কিছু সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবনের রঙ্গমঞ্চে এমন অনেক মানুষ আসে-যায়, যাদের ডিমের মতোই ধরা ছোঁয়া যায় না, কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোয় বাঁধা যায় না।
গল্পের শুরুটা করা যাক। গ্রামের নাম রূপপুর। সেই গ্রামে এক চতুর লোক ছিল,
নাম রহিম।
রহিম ডিমের মতো—পিচ্ছিল, গোলমেলে। তাকে দোষী প্রমাণ করা মানে ডিমের গায়ে দড়ি বাঁধার চেষ্টা করা।
সে অপরাধ করে, কিন্তু দড়ি বাঁধার মতো কোনো কিনারা পাওয়া যায় না।
একদিন রহিম পাশের বাড়ির আম গাছ থেকে আম চুরি করে পালালো।
সবাই দেখলো সে দৌড়ে পালাচ্ছে।
কিন্তু যখন গ্রামের মাতব্বররা তাকে ধরলো, রহিম অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
"আমি তো পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম।
আম গাছ তো ওখানে, আমি এখানে।
আমার কাছে তো আম নেই!"ঠিক যেন সেই ডিমের দড়ি!
সামনে প্রত্যক্ষ দোষী, কিন্তু তার 'দড়ি' বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাঁড় করানোর জায়গা নেই।
এভাবেই আমাদের আদালতে অনেক সময় প্রত্যক্ষ দোষীও ছাড়া পেয়ে যায়।
আইন তো আর শুধু 'দেখেছি' বিশ্বাস করে না, আইন বিশ্বাস করে 'দড়ি' বা অকাট্য প্রমাণের ওপর।
অথচ যার বিরুদ্ধে কোনো দড়ি বা প্রমাণ বাঁধা যায় না,
আইন তাকে ধরতে পারে না।আবার অন্য একটি দৃশ্যের কথা ভাবা যাক।
একটি সংসারের গল্প। দুই ভাইয়ের বউ, রীনা আর মিনা।
শাশুড়ি মা তীর্থ ভ্রমণে গিয়েছিলেন,
আর সেই সুযোগে দুই বউ মিলে ঘরের আসবাবপত্র এলোমেলো করে,
ঝগড়া করে একাকার করে ফেলেছে।
দোষটা মূলত বড় বউ রীনার,
সে-ই বেশি উস্কানি দিয়েছে।
শাশুড়ি মা ফিরে এলেন।
ঘর দেখে হতভম্ব। দুই বউ দৌড়ে এসে নালিশ করতে লাগলো।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যে দোষী,
সেই সবচেয়ে বেশি কান্না করছে।
রীনা শাশুড়ির পা জড়িয়ে ধরে বলছে,
"মা, মিনা ভাবি আমাকে আজ মেরে ফেলতো! আমি কিছু করিনি,
সব দোষ ওর।" অথচ মিনা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,
সে জানতো শাশুড়ি এসে তার দিকটাই শুনবে, কিন্তু রীনার অভিনয়ে সে নির্বাক।
শাশুড়ি মা বিচার করতে বসে কেঁচো খুঁড়তে সাপ পেলেন না।
দোষী রীনা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী করে ফেলছে, যেন সে-ই নির্দোষ।
আর মিনা, যে তুলনায় কম দোষী বা কিছুটা পরিস্থিতির শিকার, সে চুপ।
শাশুড়ি মা বুঝতে পারলেন না কার দড়ি বা 'দোষ' কোথায়। যে দোষী, সে দড়ি বাঁধার জায়গা খুঁজে দিচ্ছে না,
বরং কান্না দিয়ে বিচারকের চোখে জল এনে দিচ্ছে।
এই শাশুড়ি মা হলেন আমাদের বিচার ব্যবস্থা। আর রীনা হলো সেই ডিম—পিচ্ছিল,
ধরার অযোগ্য।আমাদের সমাজের অনেক ভালো মানুষ, যারা সোজা সাপটা,
তারা এই চতুরদের ভিড়ে কোনো দড়ি বা প্রমাণ খুঁজে পায় না।
দোষী ব্যক্তিরা কান্না, নাটক আর মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করে।
আর নির্দোষ ব্যক্তিরা চুপচাপ সাজা ভোগ করে, কারণ তাদের পক্ষে দড়ি বাঁধার মতো কোনো শক্ত ভিত্তি থাকে না।
টেলিভিশনের টকশোতে যেমন ডিম আগে না মুরগি আগে—এ নিয়ে বহু তর্ক হয়,
কিন্তু মূল দড়িটা কেউ খুঁজে পায় না। তেমনই সংসারে, সমাজে, আদালতে—আমরা অনেক সময় সত্যের নাগাল পাই না।হাতের ডিমটি আজও দড়ি ছাড়া।
ঠিক যেমন জীবনের বহু অপরাধী, বহু চতুর মানুষ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
দড়ি বাঁধার জায়গা না থাকলে যেমন ডিমের দড়ি হয় না, তেমনি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলে সুবিচার হয় না।
এই পিচ্ছিল জগত, আর এই পিচ্ছিল মানুষ—এরাই পৃথিবীর আসল রহস্য।
তাই ডিমের দড়ি কোনো রূপকথা নয়,
বরং এটি প্রমাণ করে যে,
অনেক সময় প্রত্যক্ষ সত্যের চেয়েও প্রমাণের অভাব আমাদের বড় অসহায় করে তোলে।ডিমটিতে দড়ি লাগানো যায় না, কারণ তার প্রকৃতিই গোল।
তেমনি, কিছু মানুষের চাতুর্যও ধরাছোঁয়ার বাইরে, যা আমাদের বারবার শিখিয়ে যায়—সততাই দড়ি, কিন্তু সব সময় তা দৃশ্যমান হয় না।