আকাশের মুখভার সকাল থেকেই। মেঘের ঘনঘটা দেখে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি আজ কোনো এক চরম সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।সবাই বলছিল—বৃষ্টি আসবেই আজ। আবহাওয়া বার্তা, বাতাসের গন্ধ, চারপাশের গুমোট ভাব—সবকিছুই সেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। উঠোনে দাঁড়ানো পাড়ার বড়রা চশমাটা ঠিক করতে করতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, "যেভাবে মেঘ জমছে, বৃষ্টি নেমে গেলে আর রক্ষা নেই। সব আয়োজন পণ্ড হয়ে যাবে।"ঘরের ভেতরে তখন অন্যরকম এক ব্যস্ততা। মায়ের চোখের কোণে জল জমাট বেঁধে আছে। বাবা বারান্দার এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালেন, যা তিনি সাধারণত করেন না। একাত্তরের সেই উত্তাল, বিষাদময় দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে ওনাদের। ১৯৭১ সালের সেই দিনগুলোতে যেমন এক অনিশ্চয়তা আর মন খারাপের মেঘ চারপাশকে গ্রাস করেছিল, আজ ঠিক তেমনই এক অদ্ভুত মন খারাপ পুরো বাড়িটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ঘরের প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি আসবাব যেন এক নীরব একাত্তরের যন্ত্রণায় ভুগছে।সবাই বারবার বলছিল, "বৃষ্টি চলে গেলে এই ঘর পুরো শূন্য হয়ে যাবে।"পাড়া-প্রতিবেশীরা ফিসফিস করছিল। কেউ বলছিল, আজ বৃষ্টির বিয়ে। হ্যাঁ, এই প্রকৃতির রুক্ষতা ভাঙতে, এই গুমোট ভাব কাটাতে আজ এক মহা মিলন হতে চলেছে। কিন্তু বাবা-মায়ের মন মানছে না। তাদের সারা জীবনের সঞ্চয়, তাদের কলিজার টুকরো আজ ঘর ছেড়ে চলে যাবে অনেক দূরে। এক অজানা ঠিকানায়, এক অচেনা নতুন মানুষের হাত ধরে সে পাড়ি জমাবে সুদূর এক শ্বশুর বাড়িতে।বাতাসে তখন কান্নার সুর। সানাইয়ের আওয়াজ যেন মেঘের ডাকের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই চারপাশটা অন্ধকার হয়ে এলো। বাতাসে একটা শীতল অনুভূতি। একজন চেঁচিয়ে উঠল, "ঐ যে, বৃষ্টি হলো! বৃষ্টি নেমে গেল!"ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতরের লাল বেনারসি পরা মেয়েটি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। মা এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবা দূর থেকে তাকিয়ে চশমাটা খুলে চোখ মুছলেন।আসলে এতক্ষণ ধরে পুরো বাড়ি যার চলে যাওয়ার আশঙ্কায়, যার বিদায়ের বেদনায় চাতক পাখির মতো ছটফট করছিল—সে আকাশের কোনো জলধারা নয়। সে এই বাড়ির আদরের নাতনি, বাবা-মায়ের নয়নের মণি, যার নাম রাখা হয়েছিল 'বৃষ্টি'। আজ মেঘলা আকাশের নিচে, প্রকৃতির বৃষ্টির আবহে, মানুষের রূপ ধরে থাকা "বৃষ্টি" নামের মেয়েটি তার চেনা ঘর ছেড়ে চিরতরে পাড়ি জমাচ্ছে তার শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে।গল্প কেমন হলো লিখে জানাতে পারেন ধন্যবাদ।