বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (শ্যামলী, ঢাকা): শিশু স্বাস্থ্যসেবায় এক অনন্য বৈশ্বিক আলোকবর্তিকা
১. ভূমিকা :একটি সুস্থ শিশুই গড়ে তোলে একটি সমৃদ্ধশালী জাতি। আর সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রোগমুক্ত ও সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানটি বিগত পাঁচ দশক ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তা হলো বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘ঢাকা শিশু হাসপাতাল’ নামে সমধিক পরিচিত হলেও বর্তমানে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় ইনস্টিটিউট। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শ্যামলীর শের-ই-বাংলা নগরে অবস্থিত এই হাসপাতালটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের বৃহত্তম বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা চিকিৎসা ও গবেষণাকেন্দ্র। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তৎকালীন কতিপয় প্রথিতযশা শিশু বিশেষজ্ঞের দূরদর্শী চিন্তার ফসল হিসেবে এই গৌরবময় প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এই হাসপাতালটি আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিশ্বমানের সেবা প্রদান করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের এক অনন্য গৌরবময় ভাবমূর্তি ও সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
২. ভৌগোলিক অবস্থান, সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনিক পরিচিতিহাসপাতালটির প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সুপরিকল্পিত।রোড ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান: হাসপাতালটি ঢাকার শের-ই-বাংলা নগরের সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ রোডে অবস্থিত। এটি শ্যামলী বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ২০-৩০ গজ পূর্ব দিকে এবং সুপরিচিত বিনোদন পার্ক ‘শিশু মেলা’ বা ‘ডিএনসিসি ডারউইন শিশু পার্ক’-এর ঠিক পূর্ব পাশে অবস্থিত। এর ঠিক পশ্চিম পাশে রয়েছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)।সিটি কর্পোরেশন: এটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (DNCC) আওতাভুক্ত। ঢাকা মহানগরীকে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ভাগে ভাগ করার পর শ্যামলী ও শের-ই-বাংলা নগর এলাকাটি সম্পূর্ণভাবে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ন্যস্ত রয়েছে।ওয়ার্ড নাম্বার ও থানা: হাসপাতালটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত (কিছু অংশ সংলগ্ন অঞ্চলের সাথে যুক্ত) এবং এটি সম্পূর্ণভাবে শেরেবাংলা নগর থানার আওতাধীন।সংসদীয় আসন: এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ঢাকা-১২ নির্বাচনী আসনের অন্তর্ভুক্ত।
৩. হাসপাতালের অবকাঠামো, আয়তন ও শয্যা সংখ্যাবাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এর ভৌত অবকাঠামো বিশাল এবং প্রতিনিয়ত এটি সম্প্রসারিত হচ্ছে।বিল্ডিং বা ভবনের সংখ্যা: বর্তমানে এই হাসপাতাল চত্বরে প্রধানত ৩টি বিশাল বহুতল ভবন রয়েছে। এর মধ্যে সামনের দিকে রয়েছে একটি ৪-তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ও বহির্বিভাগ ভবন। ঠিক পেছনে রয়েছে মূল ইনডোর সেবা ও চিকিৎসার জন্য ৬-তলা বিশিষ্ট ভবন। এছাড়া ২০১২ সালে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আধুনিক ৯-তলা বিশিষ্ট নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়, যেখানে বর্তমানে শিশু কার্ডিয়াক সেন্টারসহ সর্বাধুনিক ল্যাবরেটরি ও আইসিইউ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।আয়তন: হাসপাতালটি শের-ই-বাংলা নগরের এক বিশাল এবং মনোরম সবুজাভ চত্বর জুড়ে বিস্তৃত, যা শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী এবং কোলাহলমুক্ত।শয্যা বা বেড সংখ্যা: দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ছিল ৬৫০ থেকে ৬৮১টি। তবে ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ সামলাতে এবং সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকার ৩৪৪.০২ কোটি টাকার একটি মেগা সম্প্রসারণ প্রকল্প (Expansion Project-2) অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাসপাতালে আরও ১০০টিরও বেশি নতুন অত্যাধুনিক বেড এবং কেবিন যুক্ত হচ্ছে, যার ফলে হাসপাতালটির মোট শয্যা সংখ্যা ৭৮৭টি-তে উন্নীত হচ্ছে। পরিচালকদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে এটিকে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ শয্যার একটি বৈশ্বিক মানের হসপিটালে রূপান্তর করা।
৪. মেডিকেল কলেজ নাকি শুধুই হাসপাতাল?অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এটি কি কেবলই একটি চিকিৎসালয়? উত্তর হলো—না, এটি শুধুমাত্র একটি হাসপাতাল নয়। এটি একই সাথে একটি উচ্চতর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাকেন্দ্র।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ (BICH): এই হাসপাতালের নিজস্ব শিক্ষা উইং বা একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হলো ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ’ (BICH)।প্রদত্ত কোর্সসমূহ: এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU)-এর অধিভুক্ত হয়ে স্নাতকোত্তর স্তরের চিকিৎসা শিক্ষা প্রদান করে। এখান থেকে চিকিৎসকেরা শিশু স্বাস্থ্যে FCPS, MD, Diploma (DCH), MS (Paediatric Surgery) সহ বিভিন্ন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।নার্সিং ও প্রযুক্তিবিদ শিক্ষা: এখানে উচ্চতর চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দক্ষ শিশু নার্স এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট তৈরির জন্য বিশেষায়িত কোর্স ও ডিপ্লোমা চালু রয়েছে। সুতরাং, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পোস্ট-গ্রাজুয়েট মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।
৫. প্রধান কর্মকর্তা ও চিকিৎসক মন্ডলীপ্রধান কর্মকর্তার পদবি: এই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক এবং নির্বাহী কর্মকর্তার পদবি হলো ‘পরিচালক’ (Director)। একজন জ্যেষ্ঠ এবং খ্যাতিমান শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এই পদে নিয়োজিত থাকেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য সরকার কর্তৃক মনোনীত একটি ১২-সদস্যের গভর্নিং বা ম্যানেজমেন্ট বোর্ড রয়েছে, যার প্রধান হলেন একজন ‘চেয়ারম্যান’। বর্তমানে হাসপাতালটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. এ কে এম আজিজুল হক এবং পরিচালক হিসেবে আছেন অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম।ডাক্তার ও স্টাফদের সংখ্যা: হাসপাতালটিতে নিয়মিত এবং চুক্তিভিত্তিক মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ জনেরও বেশি দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্মরত আছেন। এর পাশাপাশি প্রায় ৫ শতাধিক নার্স, চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ এবং কয়েকশত প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কর্মী দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করছেন।৬. বিভাগসমূহ এবং রোগের চিকিৎসাএখানে শিশুদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জটিল রোগ নিরাময়ের জন্য পৃথক ও সুনির্দিষ্ট সাব-স্পেশালিটি বিভাগ রয়েছে। প্রধান বিভাগগুলো হলো:১. সাধারণ শিশু রোগ বিভাগ (General Pediatrics): সাধারণ জ্বর, সর্দি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টিজনিত রোগের চিকিৎসা।২. নবজাতক বিজ্ঞান বিভাগ (Neonatology): প্রাক-পরিপক্ক (Premature) এবং কম ওজনের নবজাতকদের বিশেষ যত্ন ও NICU সেবা।৩. শিশু সার্জারি বিভাগ (Paediatric Surgery): জন্মগত ত্রুটি সংশোধন এবং জটিল অস্ত্রোপচার।৪. শিশু হৃদরোগ বিভাগ (Paediatric Cardiology): শিশুদের হার্টে ছিদ্র বা জন্মগত হৃদরোগের জন্য Cath-Lab এবং হার্ট সার্জারি।৫. শিশু কিডনি রোগ বিভাগ (Paediatric Nephrology): কিডনি ডায়ালাইসিস এবং ট্রান্সপ্লান্টেশন সুবিধা।৬. শিশু স্নায়ুরোগ ও অটিজম বিকাশ কেন্দ্র (Paediatric Neurology): মৃগীরোগ, সেরিব্রাল পালসি এবং মানসিক বিকাশজনিত সমস্যার চিকিৎসা।৭. শিশু হেমাটো-অনকোলজি (Paediatric Hemato-Oncology): শিশুদের রক্তস্বল্পতা, থ্যালাসেমিয়া এবং ক্যান্সারের আধুনিক কেমোথেরাপি।৮. অন্যান্য বিভাগ: এর পাশাপাশি শিশু ইউরোলজি, রেস্পিরেটরি বা ফুসফুস রোগ বিভাগ এবং পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিকস বিভাগ সাফল্যের সাথে চালু রয়েছে।৭. প্রতিদিনের রোগীর সংখ্যা ও জরুরি বিভাগের চিত্রবাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল—যেমন উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ বা হাওর অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার অভিভাবক তাদের মুমূর্ষু শিশুদের নিয়ে এখানে আসেন।বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা: প্রতিদিন এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে (OPD) আনুমানিক ১,৫০০ থেকে ২,০০০ শিশু চিকিৎসা ও পরামর্শ গ্রহণ করে।জরুরি বিভাগে দৈনিক ভর্তি: হাসপাতালের জরুরি বা এমার্জেন্সি বিভাগটি ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আসে এবং রোগীর তীব্রতা অনুযায়ী দৈনিক আনুমানিক ৮০ থেকে ১২০ জন শিশুকে সরাসরি ইনডোর বা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।৮. চিকিৎসা ব্যয়, জরুরি টিকিট ও ভর্তির ফিএই হাসপাতালের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও মানবিক চিকিৎসা ব্যয়, যা বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতালের তুলনায় ১০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র।জরুরি বিভাগের টিকিট ও ডাক্তার দেখানোর ফি: জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টাকার একটি টিকিট কেটে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানো যায়। বহির্বিভাগে বা আউটডোরে ডাক্তার দেখানোর টিকিটের মূল্য সর্বনিম্ন ৬০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা (বিশেষজ্ঞ ভেদে)।ইনডোরে ভর্তির ফি ও বেড ভাড়া: সাধারণ সরকারি নিয়মে নামমাত্র খরচে জরুরি ভিত্তিতে রোগী ভর্তি করানো হয়। সাধারণ ওয়ার্ডের বেড ভাড়া প্রতিদিন মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং সাধারণ পেয়িং বেড বা উন্নত বেডের ভাড়া ৭০০ টাকার মতো। এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কেবিনও রয়েছে, যার দৈনিক ভাড়া ১,২০০ টাকা থেকে ৩,৫০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।দরিদ্র তহবিল ও বিনামূল্যে চিকিৎসা: হাসপাতালের মোট শয্যার একটি বড় অংশ (প্রায় ১৮০ থেকে ২০০টি বেড) সম্পূর্ণ ফ্রি বা বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ থাকে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহায়তায় দরিদ্র ও এতিম শিশুদের ওষুধ, প্যাথলজিক্যাল টেস্ট এবং খাবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।৯. চিকিৎসার মান, দ্রুত সেবা ও সিট পাওয়ার বাস্তবতাচিকিৎসার গুণগত মান: এখানে কর্মরত চিকিৎসকেরা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশেষ করে জটিল এনআইসিইউ (NICU), পিআইসিইউ (PICU) এবং শিশু কার্ডিয়াক অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে এই হাসপাতালের সফলতার হার বিশ্বমানের।দ্রুত সেবার মান: জরুরি বিভাগে আসা মাত্রই ট্রায়াজ (Triage) ব্যবস্থার মাধ্যমে অতি মুমূর্ষু শিশুদের কোনো রকম বিলম্ব ছাড়াই তাৎক্ষণিক অক্সিজেন ও লাইফ-সাপোর্ট দেওয়া হয়।সিট পাওয়ার বাস্তবতা: যেহেতু এটি পুরো দেশের একমাত্র কেন্দ্রীয় বিশেষায়িত সরকারি শিশু হাসপাতাল, তাই এখানে সিটের চাহিদা সবসময়ই আকাশচুম্বী থাকে। শতভাগ শয্যা পূর্ণ থাকার কারণে মাঝে মাঝে তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ ওয়ার্ডে বা কেবিনে সিট পেতে কিছুটা অপেক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বেড সংখ্যা বাড়িয়ে এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার জোরালো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সিট খালি থাকা সাপেক্ষে কোনো তদবির ছাড়াই সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে রোগী ভর্তি করা হয়।১০. নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলাহাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশু এবং তাদের মায়েদের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষার্থে অত্যন্ত কঠোর ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে।সিসিটিভি ও প্রহরা: পুরো হাসপাতাল চত্বর, প্রতিটি করিডোর, ওয়ার্ড এবং বহির্বিভাগ ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার নজরদারিতে থাকে। নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মী ছাড়াও এখানে আনসার ব্যাটালিয়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বক্ষণিক টহল থাকে।মাতৃ ও শিশু সুরক্ষা: নবজাতক চুরি বা যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধ করতে মা ও শিশুর হাতে ম্যাচিং কোডেড রিস্টব্যান্ড (Wristband) পরিধান করানো হয়। নির্দিষ্ট পাস বা অনুমতিপত্র ছাড়া ইনডোর ওয়ার্ডগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।১১. মানুষের আস্থা: মানুষ কি এখানে প্রতারিত, বিতাড়িত বা মৃত্যুর হার বেড়েছে?একটি বৃহৎ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কোটি মানুষের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ থাকলেও সামগ্রিকভাবে এই হাসপাতালের ওপর মানুষের আস্থা অবিচল।মানুষ কি বিতাড়িত বা প্রতারিত হয়?: কোনো শিশুকে চিকিৎসা না দিয়ে ‘বিতাড়িত’ করার কোনো সুযোগ এই হাসপাতালে নেই। শয্যা খালি না থাকলেও জরুরি বিভাগে প্রাথমিক জরুরি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা (Emergency Stabilization) দিয়ে তবেই অন্য কোথাও রেফার করা হয়। সরকারি কঠোর তদারকির কারণে এখানে কোনো দালাল চক্র বা আর্থিক প্রতারণার সুযোগ নেই। সমস্ত ফি কাউন্টারে রশিদের মাধ্যমে জমা নেওয়া হয়।মৃত্যুর হার কি বেড়েছে?: আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে বিগত দশকগুলোর তুলনায় এখানে এসে শিশুদের মৃত্যুর হার উল্টো উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে দেশের সব প্রান্ত থেকে বেসরকারি হাসপাতালে যখন কোনো শিশুর অবস্থা একদম শেষ পর্যায়ে চলে যায় বা লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়, তখন শেষ ভরসা হিসেবে তাকে এই শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় বা শেষ মুহূর্তে ভর্তি করার কারণে কিছু ক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যু ঘটে, যা কোনোভাবেই চিকিৎসকদের অবহেলা বা হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণে নয়। বরং চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় বহু অলৌকিক জীবন বাঁচানোর নজির এখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে।১২. দেশের চিকিৎসা খাতের মান উন্নয়নে হাসপাতালের অবদানবাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মানকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছে।শিশু মৃত্যুর হার (IMR) হ্রাস: জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে এবং বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই হাসপাতালের ভূমিকা এককভাবে সবচেয়ে বেশি।গবেষণা ও প্রকাশনা: এই ইনস্টিটিউট থেকে নিয়মিত বিশ্বমানের ‘ঢাকা শিশু হাসপাতাল জার্নাল’ প্রকাশিত হয়। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ডেঙ্গু এবং হামের মতো মহামারী প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আইসিডিডিআর,বি (icddr,b)-এর সাথে যৌথ গবেষণায় এই প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দেশেই বিশ্বমানের জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশুর বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বা ‘মেডিকেল মাইগ্রেশন’ কমছে, যা দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে।১৩. যাতায়াত ব্যবস্থা ও যোগাযোগ সুবিধাঢাকার শেরেবাংলা নগরের মিরপুর রোডের কোল ঘেঁষে অবস্থিত হওয়ায় দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এখানে যাতায়াত করা অত্যন্ত সহজ।মাধ্যমযাতায়াত ও পৌঁছানোর উপায়🚌 বাস (Bus)ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে গাবতলী, মিরপুর, সাভার বা ফার্মগেটগামী বাসে উঠে ‘শ্যামলী বাস স্ট্যান্ড’ অথবা ‘শিশু মেলা’ স্টপেজে নামলেই ঠিক সামনে হাসপাতালটি দেখা যায়।🚊 মেট্রোরেল (Metro Rail)মেট্রোরেলে আসতে চাইলে সবচেয়ে কাছের স্টেশন হলো ‘আগারগাঁও স্টেশন’। আগারগাঁও স্টেশন থেকে সিএনজি বা রিকশায় মাত্র ৫ মিনিটে হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব।🚇 ট্রেন (Train)দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রেনে এলে ‘কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন’ বা ‘বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন’-এ নামতে হবে। সেখান থেকে সরাসরি বাস, সিএনজি বা রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি শ্যামলী আসা যায়।🚢 লঞ্চ (Launch)ঢাকার বাইরে থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে নামলে, সেখান থেকে সরাসরি মিরপুর বা গাবতলী অভিমুখী বাস (যেমন: তানজিল, বিহঙ্গ ইত্যাদি) যোগে সরাসরি শ্যামলী শিশু মেলার সামনে নামা যায়।🛺 সিএনজি / অটোরিকশা / রাইড শেয়ারিংঢাকা শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে সিএনজি বা অটোরিকশাকে সরাসরি "শ্যামলী শিশু হাসপাতাল" বললেই তারা মূল ফটকের সামনে নামিয়ে দেয়।
১৪. উপসংহার ও বিশ্বব্যাপী সুনামের ওপর আস্থাপরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট কেবল ইটের তৈরি কোনো হাসপাতাল ভবন নয়; এটি লাখো ক্রন্দনরত বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর এক পরম পবিত্র আশ্রয়স্থল। শত সীমাবদ্ধতা ও বিপুল রোগীর চাপের মাঝেও এখানকার চিকিৎসকদের আন্তরিকতা, সেবামূলক মনোভাব এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা একে অনন্য করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই হাসপাতালের গবেষণা ও চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত প্রশংসিত। দেশ-বিদেশের যেকোনো মানুষ ও অভিভাবক কোনো দ্বিধা বা সংশয় ছাড়াই এই হাসপাতালের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন। সরকারি নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের সুবাদে আগামী দিনগুলোতে এই প্রতিষ্ঠানটি আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠবে এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার সুনামকে আরও উজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান করে রাখবে।এর উদ্দেশ্য হল শুধুমাত্র তথ্য জানানো। নিজেও রচনাটি পড়বেন অন্য কে পড়ার উৎস করবেন লেখাটি কেমন হলো তা লিখে জানাতে পারেন ধন্যবাদ।