'আমি ঈশ্বরের গল্প বলতে চাই, আর শয়তানেরও।' এই বলে বৃদ্ধ লোকটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। আমরাও এমন একটা কথা শুনে তার প্রতি আকৃষ্ট হলাম।
'কী বললেন আপনি?' বিস্মিত কন্ঠে আমরা তাকে জিজ্ঞাস করলাম।
তিনি আগের কথাটি অন্য ভাবে বললেন - আমি ঈশ্বরের গল্পটা জানি, শয়তানেরটাও।
এখন কথাটিকে বেশ সাধারণ মনে হলো, কেননা আমরাও ঈশ্বর আর শয়তানের গল্প জানি, সেই শিশুবেলা থেকে আমরা এই গল্প শুনে বড় হয়েছি। আমাদের বৃদ্ধের প্রতি যে তীব্র কৌতুহল তৈরি হয়েছিল, তা নিমিষেই কমে গেল। 'অ...।' আমাদের মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বেরিয়ে পড়ে অনুৎসাহী শব্দটি।
তিনি আমাদের মনের অবস্থা আঁচ করতে পারলেন। 'তোমরা যেটা জানো সেটা নয়। আমি অন্য গল্পটা জানি। '
আমরা এবার তাঁর দিকে ভালো করে লক্ষ করলাম। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বৃদ্ধ বয়সের সাথে মিল আছে লোকটার মুখের। ভিখিরিদের মতো একটা ঝোলা ঝুলিয়ে রেখেছেন কাঁধে। খালের উপর যে সেতুটিতে আমি আর শৈশব গল্প করছিলাম, তার পাশে বাঁশঝাড়টির নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বৃদ্ধ। হয়তো আমরা আমাদের গল্পে বেশ মগ্ন ছিলাম বলে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তিনি এমনটা বলে থাকবেন। কিন্তু আমাদের তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করার কারণ কী থাকতে পারে বুঝলাম যখন তিনি বললেন, 'বলতে পারি সত্য গল্পটি, যদি আমাকে কিছু খেতে দিতে পারো। আমি ক্ষুধার্ত।'
শৈশবকে বেশ আগ্রহী মনে হলো গল্পটি শোনার ব্যাপারে। 'আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি খাবার নিয়ে আসছি,' বলেই ও আমাকে সেতুর উপর দাঁড় করিয়ে ভোঁ দৌড় দিলো বাড়ির দিকে। আমি বললাম, 'দাঁড়া আমিও আসছি তোর সাথে।'
- না, তুই থাক দাদুর কাছে। যদি চলে যেতে চায় যেতে দিবি না একদম, আমি গল্পটা শুনতে চাই।
শৈশব আমার মামাতো ভাই। আমি নানা বাড়ি এসেছি বেড়াতে। দুপুরে ভাত খেয়ে দুজন আমাদের প্রিয় এই সেতুটিতে আড্ডা দিতে এসেছি। দুপুর বলে এখানে আমি, শৈশব আর বৃদ্ধ লোকটি ছাড়া অন্য কেউ ছিলো না। বিকেলে সকলে যখন অফিস-আদালত-মাঠ থেকে ফিরে আসে, তখন এই সেতুটি আর তার দুপাশের রাস্তা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তিনি বাঁশঝাড়ের পাড় ঘেঁষে খালের উজানি পানিতে নেমে হাতমুখ ধুয়ে ওপরে আসলেন। ঝোলার ভেতর থেকে গামছা বের করে হাত মুখ মুছে গামছাটি সেতুর রেলিঙের ওপর শুকাতে দিলেন।
-আপনি কে? আপনাকে আগে কখনো এ গ্রামে দেখিনি। আমার প্রশ্নে তিনি হাসলেন,' আমি সক্রেটিস।'
-গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস?
-হ্যা।
-তিনি তো সেই আড়াই হাজার বছর আগে মারা গেছেন।
মৃদু হেসে তিনি বললেন, 'আমার পুনর্জন্ম নয়,পুনরাগমন হয়েছে পৃথিবীতে।'
- আপনার আগমন গ্রীসে না হয়ে বাংলাদেশে হলো কেন?
- ঈশ্বর ভুল করে গ্রীসে না পাঠিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন হয়তো।
-ঈশ্বর ভুল করে পাঠিয়েছেন!
-হ্যা। কেন ঈশ্বর কি ভুল করতে পারেন না? তাঁর তো আর বয়স কম হলোনা, একটা ভুল করতেই পারেন।
-ঈশ্বর একটা নয় আপনার বেলায় দুটো ভুল করেছেন।
-দুটো ভুল!
- হ্যা। তিনি আপনাকে পৃথিবীতে পাঠানোর সময় সক্রেটিসের নয় বরং ভিঞ্চির চেহারা দিয়ে পাঠিয়েছেন।
-তাই নাকি?
-হ্যা, তাই।
-হতে পারে। তিনি বেশ উদাসীন আর মানুষের উপর বিরক্ত অনেক বেশি মাত্রায়। তোমার বন্ধুটি এখনো আসছেনা কেন?
-এসে পড়বে। আমাদের দুপুরের খাওয়া হয়েগেছে। তাই হয়তো খাবারের ব্যবস্থা করতে সময় লাগছে।
বৃদ্ধ একবার আকাশের দিকে তাকালেন। এরপর ডান হাতটি কপালে রেখে রোদ আড়াল করে খালের পূর্ব দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখে বললেন, 'আমার হাতে আজ সময় বেশি নেই।'
তাকে কিছুটা চঞ্চল দেখালো। বললাম, 'ঈশ্বরকে নিয়ে কিছু বললেও শয়তানকে নিয়েতো কিছু বললেন না।'
লিওনার্দো রূপী সক্রেটিস আমার দিকে তাকালেন এবং কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, 'ঈশ্বরের অভিধানে শয়তান বলে কেউ নেই।'
কী অদ্ভুত কথা! লোকটা কি পাগল নাকি? আমি কী বলবো বুঝতে পারছিনা। আশেপাশে কেউ নেই। দূরের মাঠে বর্গা চাষীরা কাজে মগ্ন, খুব জোরে চিৎকার না করলে শুনতে পারবেনা। এবার আমার মন চঞ্চল হলো। শৈশব এতো দেরি করছে কেন? বৃদ্ধের সাথে কথা বলার সাহস পাচ্ছি না। যদি পাগল হয়ে থাকে তাহলে আমার কপালে দুঃখ আছে। আবার সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া উদ্যত মন কিছুতে বৃদ্ধের কাছে আমার ভীত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। আমাকে বিস্মিত করে তিনি বললেন, 'তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগেনি কখনো, আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করেছে বলে আযাযিলকে শয়তান বানিয়েছেন ঈশ্বর, তিনি কি এতোই বোকা? যেখানে এক ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কারো কাছে মাথা নত করতে নিষেধ করেছেন তিনি নিজেই।'
আমি আবারও তাকে জিজ্ঞেস করলাম,' আপনি আসলে কে?"
-সেটা কি জানা বেশি জরুরী? নাকি গল্পটা শোনা?
আমি আর এখন তাকে ভয় পাচ্ছি না। বললাম, 'আপনি কোন গল্প বলছেন না। আমাকে বিভ্রান্ত করতে কিছু প্রশ্ন তুলছেন।'
বৃদ্ধ আমার কথায় উচ্চস্বরে হেসে বললেন, 'বোকা। তোমাকে বিভ্রান্ত করে আমার কী লাভ? তোমার চেয়ে তোমার বন্ধুটি বেশি যোগ্য ছিলো আমার কথা বোঝার ব্যাপারে।'
যোগ্যতা নিয়ে কথা বলায় আমার বেশ রাগ হলো। তাহলে ওকেই বলতেন কথা গুলো। আমাকে বলছেন কেন?
- যোগ্যতা থাকলেই সব কিছু পাওয়া যায় না। বুঝলে?
- না বুঝিনি। যোগ্যতা থাকলে কেন পাওয়া যাবে না?
- কারণ পৃথিবীতে ঈশ্বরের ক্ষমতা সীমিত। এবং ঈশ্বর রহস্যময়। আর ঐযে শয়তানের কথা জিজ্ঞেস করলে, আসলে শয়তান বলে কিছু নেই, ওটা মানুষের কাল্পনিক সৃষ্টি। মানুষ অনেক চতুর। তাই কীভাবে যেন বুঝে গেছে পৃথিবীতে ঈশ্বরের সীমাবদ্ধতার কথা। এবং নিজের অপকর্মের দায় চাপিয়ে দিতে সৃষ্টি করেছে কাল্পনিক শয়তান।
- হয়তো আপনার মতো কেউ এসে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছে ঈশ্বরের সীমাবদ্ধতার কথা। আপনি যেমন আমাকে জানালেন। আচ্ছা আপনি স্বয়ং শয়তান নন তো; তা নাহলে ঈশ্বরের শক্তি সীমাবদ্ধ পৃথিবীতে,কেন বলছেন? আমরা জানি তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী।
- যাক মানুষের মতোই চিন্তা করছো। কিন্তু তুমিতো এমন কোন পাপ করনি যে তোমার সে পাপের দায় চাপিয়ে দিতে একজন শয়তানকে প্রয়োজন হবে।
- আপনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গ তুলছেন।
- আমি তোমার কথার উত্তর দিয়েছি। তুমি বুঝতে না পারলে সেটা তোমার ব্যর্থতা।
এরপর বৃদ্ধ দুহাত তুলে আকাশে তাকিয়ে বললেন,' হে ঈশ্বর আপনার রহস্য বোঝা বড় দায়। আমায় এই শিশু সূলভ কিশোরের নিকট কেন পাঠিয়েছেন, বুঝতে পারছিনা।'
- আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি, আপনি শয়তান নন।
-হে ঈশ্বর আপনাকে ধন্যবাদ। এই অবুঝ কিশোরকে এতো দ্রুত বুঝ দেওয়ার জন্য।
-আপনি কি জিবরাইল?
- কেন তোমার কি নিজেকে পয়গম্বর মনে হচ্ছে? ও চিন্তা মাথা থেকে বাদ দাও।
- না আমি নিজেকে পয়গম্বর ভাবছি না। আপনি যেভাবে আকাশে তাকিয়ে ঈশ্বরের কাছে জানতে চাইলেন, আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে কেন, তাই ভাবলাম আপনি জিবরাইল কিনা। তিনিতো জিবরাইলকেই পাঠাতেন দূত হিসাবে।
- তিনি জিবরাইলকে পাঠাতেন সেটা অতীত, কিন্তু আজরাইলকে এখনো পাঠান।
- না আপনি আজরাইল নন।
- কীভাবে বুঝলে?
- আপনাকে দেখে মোটেই ভয় পাচ্ছি না। বরং বেশ ভালো লাগছে। মনে একটা প্রশান্তি ভাব আসছে।
বৃদ্ধ হাসলেন, ' ঈশ্বর কি আর শুধু শুধু এতো আকর্ষণ অনুভব করে তোমাদের প্রতি। মুখের কী চমৎকার বুলি। বুলবুলির গানও হার মানবে এই প্রশংসার কাছে। তোমার কথায় জাদু আছে। শোন, মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে অমৃতবাণী - ঈশ্বর পৃথিবীতে কোন্দল চান না।'
- এই মাত্র বললেন ঈশ্বর মানুষের প্রতি উদাসীন আর বিরক্ত।
- সেটা পৃথিবীতে মানুষের কর্মকাণ্ড দেখে। কী করার কথা আর কী করছে মানুষ পৃথিবীতে!
- আমার কথা মানুষ শুনবে কেন? আমি কে?
- হ্যা শুনবে। কারণ তোমার কথায় জাদু আছে এবং তোমার আছে শৈশবের মতো ভালো ও বিশ্বস্ত একজন বন্ধু যে তোমার চলার পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে সহায়ক হবে।
এরপর খালের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। ঐ আমার নৌকা এসে পড়ছে।'
তাঁর কথায় আমিও খালের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা নৌকা আসছে সেতুর দিকে।
বললাম, 'আপনি আসলে কে? নিজেকে সক্রেটিস বলে পরিচয় দিলেন অথচ দেখতে ভিঞ্চির মতো। আবার বললেন আপনার পুনরাগমন হয়েছে পৃথিবীতে-যার অর্থ দাঁড়ায় আপনি ইসা নবী, কিন্তু আপনাকে বহন করার জন্য নুহ নবীর নৌকা এসেছে। নবী রাসূলগণ নিজেরাই ঈশ্বরের বার্তা মানুষের কাছে প্রচার করেন, আপনি তা না করে আমাকে বলছেন ঈশ্বরের বানী প্রচার করতে। তাহলে আপনার জিবরাইল হওয়ার কথা। কিন্তু আপনি স্বীকার করছেন না তা। তাহলে আপনি কে?'
আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বৃদ্ধ সেতু থেকে নেমে নৌকায় উঠে পড়লেন। নৌকা থেকে জবাব দিলেন, 'আমি কে সেটা জরুরী নয় আমি যেটা করতে বলেছি সেটা জরুরী।'
পানির স্রোতে তাঁর নৌকাটি বেশ দ্রুত দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। আমি তাকিয়ে রইলাম সে দিকে। কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম মনে নেই, শৈশবের কন্ঠ শুনে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। খাবার হাতে ও জিজ্ঞেস করলো, 'কীরে বুড়ো দাদুটা কোথায়?'
আমার এখনো রেশ কাটেনি। আমি ঘোর লাগা কন্ঠে বললাম, 'চলে গেছে।'
'চলে গেছে?' শৈশবের কন্ঠ হতাশায় বেজে উঠল।
- হু।
'কিন্তু আমি গল্পটি শুনতে চেয়েছিলাম।' কন্ঠে কাতরতা ওর।
আমি ওর কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করলাম, 'আমাকে বলে গেছে গল্পটা। আর তোকেও শোনাতে বলেছে।'
38
View