একটু পড়তে বস বাবা, একটু পড়তে বস। রাতে বাংলাদেশের ফুটবল-ক্রিকেট খেলা আছে, তখন না হয় বাপ-ব্যাটা এক সাথেই খেলা দেখব। এখন একটু পড়তে বস। নিজের চোখেই তো দেখতেছিস—যখন তোর ছোট কাকা আরাম করে অফিসে বসে কাজ করে, তখন আমি পেঁয়াজ লাগাই মানুষের ক্ষেতে-খামারে।
নিজের চোখেই তো দেখতেছিস, গ্রামে একখান জলসা হলে এখন তার পোস্টারেও নাম ওঠে তোর ছোট কাকার। ছোট ভাই বসে চেয়ারে, আর আমি বসি খড়ের ছাই দিয়ে মাটিতে। ছোটকালে যখন তোর ছোট কাকা পড়তে বসত বই নিয়ে, তখন আমি ওকে খুব ক্ষ্যাপাইতাম। আমি ওকে বলতাম, "এই যে তুই কষ্ট করে পড়তেছিস, আর আমি গুলি খেলে আসলাম বন্ধুদের সাথে!"
আর আজ সন্ধ্যাবেলায় যখন আমার চাষাবাদের কাজ শেষ হয় না, তখন তোর কাকা বাড়িতে এসে এসি ছেড়ে ঘুমায়। আর ৪২ ইঞ্চি টিভিতে দেখে—"তুই বন্ধু কালা পাখি, আমি যেন কী..."। এসির সেই বাতাস আমার ঘর পর্যন্ত না আসলেও, টিভির সেই সাউন্ড তো আমার কান পর্যন্ত ঠিকই আসে! তোর কান পর্যন্ত আসে না?
একটু পড়তে বস বাবা, একটু পড়তে বস...। বাপ যতদিন বেঁচে আছে, ততদিন যত সুবিধা আদায় করে নেওয়া যায় নিয়ে নাও। আমি কিছু বললেই এখন ঘ্যানঘ্যান মনে হয়, তাই না বাবা? আমার বাবাও যখন আমাকে বলত, আমার কাছেও ঘ্যানঘ্যানই মনে হতো।
এখন যখন নদীতে চালাই শ্যালাোমেশিন লাগানো নৌকা, সারাদিন কানের কাছে বিকট আওয়াজ—ভট-ভট-ভট, ভট-ভট-ভট আওয়াজ। আবার কয়দিন যখন চালালাম জমি চাষ দেওয়ার পাওয়ার টিলার, কাজই একটু আছে ঠিকই, কিন্তু সেই ভট-ভট আওয়াজ আর যায় না!
জীবনে গরীব হলে আওয়াজ অনেক বেশি, বাবা। জীবনে গরীব হলে আওয়াজ অনেক বেশি! চাউল ভাঙানো মেশিনের আওয়াজ, সেলাই মেশিনের আওয়াজ, আগুনে পোড়ানো লোহা পিটিয়ে সোজা করার আওয়াজ, কাঠ ফাড়া স-মেশিনের আওয়াজ... কোন আওয়াজটা তোমার বেশি পছন্দ, বাবা?
জীবনে গরীব থাকলে আওয়াজ অনেক বেশি, বাবা! পড়ার সময় কাটাইছি আরাম-আয়েশে, খাইছি-খেলেছি। কোমরে ছিল না বোঝা টানার শক্তি, হাত-পা নরম—শক্ত ছিল না তেমন। বাবা, মরণ দেখলাম জীবন, তার চেয়ে বাবার ঘ্যানঘ্যান শুনলেই মনে হয় লাভ হতো বেশি!