Story

যে মেয়েটা প্রতিদিন একই বাসে উঠত

September 14, 2026

Jk Rimon

14
View

প্রতিদিন সকাল ৮টা ১০ মিনিটে মেয়েটা একই বাসে উঠত।

একই জায়গা থেকে।

একই সিটে বসত।

আর প্রতিদিন বাস থেকে নামার আগে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসত।

কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—

সে কোনোদিন আমার সঙ্গে কথা বলত না।

প্রথম দিন বিষয়টা খেয়াল করিনি।

দ্বিতীয় দিনও না।

কিন্তু এক সপ্তাহ পর বুঝলাম, মেয়েটা ইচ্ছা করেই আমার দিকে তাকায়।

প্রতিদিন।

ঠিক একই সময়ে।

ঠিক একইভাবে।

আমি ভাবলাম, হয়তো কোনো কারণে আমাকে চেনে।

একদিন সাহস করে বললাম,

“আপনি কি আমাকে চেনেন?”

মেয়েটা কিছু বলল না।

শুধু হেসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

পরের দিনও একই ঘটনা।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,

“আপনার নামটা জানতে পারি?”

এবার সে আমার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

“আমার নাম জানলে আপনার ভালো লাগবে না।”

আমি হেসে বললাম,

“কেন?”

সে উত্তর দিল,

“কারণ আপনি আমাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।”

আমি অবাক।

“কী বলছেন আপনি? আমি তো আপনাকে চিনিই না!”

মেয়েটা তখন শুধু একটা কথা বলল—

“এখনো না।”

তারপর বাস থেকে নেমে গেল।

---

সেদিন সারাদিন কথাটা মাথা থেকে বের করতে পারলাম না।

“আপনি আমাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।”

কিন্তু কাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি?

পরদিন মেয়েটা বাসে উঠল না।

তার পরদিনও না।

এক সপ্তাহ কেটে গেল।

আমি ভাবলাম, হয়তো আর আসবে না।

কিন্তু ঠিক সপ্তম দিনের সকালে সে আবার বাসে উঠল।

আজ তার হাতে একটা ছোট নীল খাম।

আমার পাশে এসে বসে খামটা আমার হাতে দিয়ে বলল,

“এটা এখন খুলবেন না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“ভেতরে কী?”

সে বলল,

“আপনার অতীত।”

আমি হেসে ফেললাম।

“আপনি আসলে কে?”

মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

“যেদিন আপনি সত্যিটা জানতে পারবেন, সেদিন আমাকে আর খুঁজে পাবেন না।”

তারপর সে বাস থেকে নেমে গেল।

---

বাস থেকে নেমেই আমি খামটা খুললাম।

ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিটা দেখে আমার হাত কাঁপতে শুরু করল।

ছবিতে আমি ছিলাম।

কিন্তু ছবিটা তোলা হয়েছিল প্রায় দশ বছর আগে।

আর আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল—

সেই মেয়েটা।

আমি ছবির পেছনে লেখা কথাগুলো পড়লাম।

মাত্র এক লাইন।

“তুমি বলেছিলে, আমাকে কোনোদিন ভুলবে না।”

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

আমি তো তাকে কোনোদিন দেখিইনি!

অথবা—

হয়তো দেখেছি।

কিন্তু মনে নেই।

আমি দ্রুত বাড়িতে ফিরে পুরোনো অ্যালবাম বের করলাম।

একটার পর একটা ছবি দেখতে লাগলাম।

তারপর একটা ছবির সামনে এসে থেমে গেলাম।

ছবিটা আমার শৈশবের।

আমি, আমার মা…

আর সেই মেয়েটা।

কিন্তু মেয়েটার মুখের ওপর কালো কালি দিয়ে দাগ টানা।

আমি মাকে ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

“এই মেয়েটা কে?”

মা ছবিটা হাতে নিয়েই চুপ হয়ে গেলেন।

তারপর অনেকক্ষণ পর বললেন,

“তুই সত্যিই ওকে মনে করতে পারছিস না?”

আমি মাথা নাড়লাম।

মায়ের চোখে পানি চলে এলো।

তিনি বললেন,

“ও ছিল তোর ছোট বোন।”

আমার মাথা যেন ঘুরে গেল।

“আমার তো কোনো বোন ছিল না!”

মা কিছু বললেন না।

শুধু আলমারি থেকে একটা পুরোনো হাসপাতালের কাগজ বের করে আমার হাতে দিলেন।

সেখানে লেখা—

“শিশুটি দুর্ঘটনার পর স্মৃতিশক্তির কিছু অংশ হারিয়েছে।”

আমি কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

মা বললেন,

“দশ বছর আগে বাস দুর্ঘটনায় তুই বেঁচে গিয়েছিলি। কিন্তু তোর বোন…”

তিনি আর কথা শেষ করতে পারলেন না।

আমার চোখ চলে গেল সেই ছবির দিকে।

আমি ফিসফিস করে বললাম,

“কিন্তু… সে যদি মারা গিয়ে থাকে…”

ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা মেসেজ এলো।

অচেনা নম্বর থেকে।

“তুমি এবার আমাকে মনে করতে পেরেছ?”

আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

আমি দ্রুত নম্বরে ফোন করলাম।

ওপাশ থেকে মেয়েটার কণ্ঠ ভেসে এলো—

“ভাইয়া…”

আমি কথা হারিয়ে ফেললাম।

সে বলল,

“আমি তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।”

আমি কাঁপা গলায় বললাম,

“কী?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর সে বলল—

“আমি সেই দুর্ঘটনায় মারা যাইনি।”

আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।

আর ঠিক তখনই দরজায় কেউ কড়া নাড়ল।

আমি দরজা খুলে দেখলাম—

সামনে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে।

চোখে পানি।

হাতে সেই নীল খাম।

আর তার পেছনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ—

যাকে আমি দশ বছর ধরে মৃত বলে জানতাম।

আমার বাবা।

তিনি শুধু বললেন,

“এবার তোকে পুরো সত্যিটা বলার সময় হয়েছে।”

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login