Story

মিস্টার পারফেক্ট ১-আপেক্ষিকতার অলিগলি

September 14, 2026

75 views

১.

নিঝুম রাতে একটা মশা যখন কান মাথার মধ্যে সুর ভাঁজে, তখন নিউটনের গতিসূত্র কিংবা কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান মনে আসাটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। অন্তত নিয়াজের জন্য তো নয়ই। নিয়াজ লোকটাকে আপনি পদার্থবিজ্ঞানের চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বলতে পারেন, কিংবা স্রেফ একটা আজব জ্যান্ত ক্যালকুলেটর। দুনিয়ার আর দশটা মানুষ যেখানে অনুভূতির দোলাচলে দোলে, নিয়াজ সেখানে খোঁজে নিখুঁত অনুপাত আর গাণিতিক সাম্যাবস্থা। বন্ধু মহলে তার নাম পড়ে গেছে—'মিস্টার পারফেক্ট'।

গল্পের সূচনা একটা মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে। টিনের চালে শেষ বিকেলের তির্যক রোদ এসে পড়েছিল। কাপে গরম চা ঢালার পর তা থেকে ওঠা ধোঁয়ার গতিপথ মেপে নিয়াজ হঠাৎ মন্তব্য করে বসলো, "চায়ের তাপমাত্রার এই সূচকীয় পতন রোধ করতে হলে কাপের ব্যাস অন্তত তিন মিলিমিটার কমানো উচিত ছিল।"

বলেই সে তার চিরচেনা বাঁকা চশমাটা নাকের ওপর একটু টেনে তুললো।

চা-দোকানি খলিল মিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

ঘটনাচক্রে ঠিক সেই মুহূর্তেই চায়ের দোকানের বাইরে একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটে চলেছে। পাড়ার নামকরা চোর কালা মজিদ সবেমাত্র একটা চটজলদি টান মেরে এক ভদ্রলোকের মানিব্যাগ বাগিয়ে চম্পট দিয়েছে। ভিড়ের মধ্য থেকে চিৎকার উঠলো, "ধর ধর!"

সাধারণ মানুষ হলে হয়তো দৌড়ে যেতো চোরকে ধরতে, কিন্তু নিয়াজ তো আর সাধারণ নয়। সে তার পকেট থেকে নোটবুক আর বলপেন বের করে ফেলল। তারপর শান্ত গলায় বিড়বিড় করতে শুরু করলো, "বাতাসের বাধা যদি প্রতি মিটারে ০.০২ নিউটন হয় এবং মজিদের ভর যদি আনুমানিক ৬৫ কেজি ধরা যায়, তবে ওর ত্বরণ কখনো ২ মিটার প্রতি সেকেন্ড স্কয়ারের বেশি হওয়া সম্ভব নয়।"

পাশ থেকে রাশেদ চিৎকার করে উঠলো, "আরে নিয়াজ! তত্ত্ব ছাড়, চোর তো পালিয়ে গেলো!"

নিয়াজ ঘড়ির দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো উত্তেজনা নেই, আছে এক গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টি—ঠিক যেমনটা থাকে কোনো জটিল রহস্যের জট ছাড়ানোর মুহূর্তে।

"পলায়ন শব্দটা আপেক্ষিক, রাশেদ," নিয়াজ অত্যন্ত সুগভীর থিওরি কপচানোর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। "কালা মজিদ সরলরেখায় দৌড়াচ্ছে না। ফুটপাতের ঘর্ষণ গুণাঙ্ক অত্যন্ত বেশি, আর তার জুতোজোড়ার তলা ক্ষয়ে সমতল হয়ে এসেছে। যার ফলে বাঁক নেওয়ার মুহূর্তে অপকেন্দ্র বলের প্রভাবে তার ভারসাম্য হারানো কেবল সময়ের ব্যাপার।"

ঘটলোও ঠিক তাই। মোড়ের মাথায় গিয়ে বাঁক নিতেই কালা মজিদ ভেজা রাস্তায় পিছলে সোজা গিয়ে পড়লো এক গাদা খড়কুটোর ওপর। মানিব্যাগটা ছিটকে এসে পড়লো ঠিক নিয়াজের জুতোর সামনের ধূলিকণায়।

নিয়াজ ঝুঁকলো, নিখুঁত ৪৫ ডিগ্রি কোণে নিচু হয়ে ব্যাগটা কুড়িয়ে নিলো। তারপর ভিড়ের উদ্দেশ্যে শান্ত গলায় বললো, "পদার্থবিজ্ঞান আসলে কোনো রহস্য রাখে না। সবটুকুই স্রেফ কার্যকারণ সম্পর্কের খেলা।"

রাশেদ বললো, "আরে তো ফিজিক্স তো কালা মজিদেরে ধরাই দিছে।'

নিয়াজ বললো, 'তথাস্তু'।

#মিস্টার_পারফেক্ট

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login