Story

মিস্টার পারফেক্ট ৬: প্রতিবেশির বিয়েবাড়ি ডেট, ছিনতাই ও অন্যান্য

October 20, 2026

34 views


গায়েহলুদের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত হলুদাভিযানের ক্ষত সামলে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। সোবহান চাচার হলুদ-টাকের উজ্জ্বলতা তখনও যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। গায়ে থার্ড-ডিগ্রী ক্লান্তির প্রভাব থাকলেও আমার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো তখন অন্য এক গাণিতিক সমীকরণে ব্যস্ত।

বিছানায় পিঠ ঠেকানোর আগেই ফোনটা চেনা ফ্রিকোয়েন্সিতে কেঁপে উঠলো।

"হ্যালো, মিস্টার পারফেক্ট!" মিলির কণ্ঠ ভেসে এলো। "শুনলাম আজ প্রতিবেশীর গায়েহলুদে নাকি ফিজিক্সের আলো ছড়িয়ে এসেছেন? সোবহান চাচার টাকের রিফ্লেক্টিভ ইনডেক্স নাকি এখন ২০% বেশি?"

আমি চশমাটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে নিচু গলায় বললাম, "ফ্রি-উইল বা স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই, মিলি। পুরো ঘটনাটাই ছিল স্রেফ নিউটনের ভেলোসিটি আর লো-ফ্রিকশন ফ্লোরের যৌথ চক্রান্ত। তবে আমার বায়োলজিক্যাল সিস্টেম এখন মারাত্মকভাবে এনার্জি ড্রপ করছে।"

"অজুহাত একদম চলবে না!" মিলি মিষ্টি করে ধমক দিল। "কাল বিকেলে আপনার সাথে আমার ডেট ফিক্সড। মনে আছে তো? ওই যে কাল বিকেলেই ক্যাফেতে দেখা করার কথা ছিল?"

"কিন্তু মিলি, কাল তো আবার ওই একই ফ্ল্যাটে রহিম চাচার মেয়ের মূল বিয়ের অনুষ্ঠান!" আমি হিসেব মেলাতে গিয়ে কপালে ভাঁজ ফেললাম। "বিকাল পাঁচটায় যদি আমরা ডেটে যাই, তবে থার্মোডাইনামিকসের নিয়ম অনুযায়ী সাড়ে ছয়টার মধ্যে আমার বিয়ের আসরে উপস্থিত থাকা অসম্ভব। আম্মার রাগের মাত্রা তখন এক্সপোনেনশিয়াল হারে বৃদ্ধি পাবে!"

"আমি কোনো হিসেব শুনতে চাই না," মিলি একদম অটল। "কাল বিকেল ঠিক চারটায় ধানমন্ডির সেই লেকের পাড়ে। পাঁচটা বেজে তিরিশ মিনিটে আপনি আপনার পাড়ার বিয়ের আসরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। নো এক্সকিউজ, ডক্টর নিয়াজ!"

ডিজিটাল সিগন্যাল কলাপস করল। অর্থাৎ মিলি ফোন কেটে দিয়েছে। কালকের দিনটি যে চরম বিশৃঙ্খল বা হাই-এনট্রপির মধ্য দিয়ে যেতে চলেছে, তা আমার প্রসেসর তখনই বুঝে গেল।

পরদিন বিকেল চারটা।

ধানমন্ডি লেকের পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় আমরা বসে ছিলাম। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম, যার ফলে মিলি শাড়ির আঁচলটা যখন বাতাসে উড়ছিল, তখন তার গতিপথ পাটিগণিতের সুন্দর ছন্দ তৈরি করছিল।

আমি আম কাঠের বেঞ্চে বসে মিলির দিকে তাকিয়ে বললাম, "তুমি জানো মিলি, এই যে আমরা লেকের স্থির জলের দিকে তাকিয়ে আছি, এখানে আলোর প্রতিফলনের ফলেই তোমাকে এত নিখুঁত দেখাচ্ছে। এটাকে যদি কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে ব্যাখ্যা করি..."

মিলি হঠাৎ আমার দিকে এক কাপ গরম ফুচকা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "থামুন তো আপনার মেটাফিজিক্স! ফুচকার ভেতরের এই টক জলটার এসিডিক পিএইচ (pH) না মেপে সোজা মুখে পুরে দিন তো!"

আমি ফুচকাটা মুখে দিলাম। সত্যি বলতে, আমার জীবনের কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্রে এত সুস্বাদু কোনো থিওরি আজ পর্যন্ত লেখা হয়নি। সময় যেন ফারম্যাটের নীতি মেনে খুব দ্রুত গতিতে এগোতে শুরু করল। বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজতেই আমার ভেতরে আম্মার ভয়ের মহাকর্ষীয় টান সক্রিয় হয়ে উঠলো।

"মিলি, আমাদের এখন স্থান পরিবর্তন করতে হবে," আমি তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালাম। "আমার সময় আর মাত্র ৩০ মিনিট। দেরি হলে আম্মার ভেক্টর এনার্জি আমার ওপর আছড়ে পড়বে!"

মিলি হেসে ফেলে একটা রিকশা ডেকে ফেলল।

সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা। রিকশাটি নির্জন গলি দিয়ে আমাদের পাড়ার দিকে এগোচ্ছিল। রিকশাচালকের প্যাডেল মারার ফ্রিকোয়েন্সি ছিল গড়ে প্রতি মিনিটে ৪০ বার। ঠিক তখনই গলি থেকে ঝোপের মতো একটা মূর্তির আবির্ভাব ঘটলো।

হাতে চকচকে সাত ইঞ্চি লম্বা একটা রামদা নিয়ে সোজা রিকশার গতিপথের সামনে এসে দাঁড়ালো এক ছিনতাইকারী।

"যা আছে সোজা বের কর! নাহলে এই রামদা দিয়ে ক্যাঁচ করে দেব!" লোকটার গলায় উগ্র গর্জন।

মিলি চমকে উঠে আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। যেকোনো সাধারণ মানুষ এই মুহূর্তে ভয়ে তাদের অ্যাডেনালিন হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে চিৎকার দিত। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক তখন অন্য হিসেব কষছিল।

আমি একদম শান্ত ভঙ্গিতে রিকশা থেকে নেমে দাঁড়ালাম। চশমাটা নাকের ওপর অত্যন্ত ধীরে ঠেলে দিয়ে ছিনতাইকারীর অস্ত্রের দিকে তাকালাম।

"শোনো হে তরুণ," আমি গাম্ভীর্যের সাথে বললাম। "তোমার হাতে যে অস্ত্রটি দেখছ, সেটার তলের ভর আনুমানিক ৫০০ গ্রাম এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ ইঞ্চি। তুমি যে বল বা ফোর্স প্রয়োগ করে ওটা ঘোরাচ্ছ, তাতে তোমার কনুইয়ের 'টরক' (Torque) মারাত্মকভাবে ভারসাম্য হারাচ্ছে।"

ছিনতাইকারী এক মুহূর্ত হা করে থমকে গেল, "অ্যাঁ?! কী আবোল-তাবোল বকছিস রে চশমাপরা পাগলা?"

"আমি আবোল-তাবোল বলছি না, এটা পদার্থবিজ্ঞান!" আমি এক পা এগিয়ে গেলাম। "তোমার জুতোর সোলে কোনো ট্র্যাকশন বা ঘর্ষণ নেই। এই ভেজা রাস্তায় তুমি যদি ওই অস্ত্রটি আমার দিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণের বেশি বাঁকিয়ে স্ট্রাইক করতে যাও, তবে নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র অনুযায়ী এর রিঅ্যাকশন ফোর্সে তুমি নিজেই পিছলে পাশের ড্রেনে গিয়ে পড়বে। তদুপরি, আমার উচ্চতা ও ভরের সাপেক্ষে তোমার ওই রামদার সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স সামলানো অসম্ভব!"

ছিনতাইকারী অস্ত্রটা একটু নিচু করে হতভম্ব হয়ে নিজের জুতোর তলার দিকে তাকাল। "মানে... আমি পড়ে যামু?"

"শুধু পড়ে যাবে না," আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে হাত উঁচিয়ে বললাম, "তোমার বাহুর ডেল্টয়েড পেশিতে ইতিমধ্যেই পক্ষাঘাতের মতো ল্যাকটিক এসিড জমা হতে শুরু করেছে। খেয়াল করে দেখো, তোমার হাত অলরেডি থরথর করে কাঁপছে! এখন যদি তুমি এই অস্ত্র সারেন্ডার না করো, তবে তোমার কনুইয়ের লিগামেন্ট চিরতরে কলাপস করবে, যার চিকিৎসাসেবা ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বেশ ব্যয়বহুল!"

ছিনতাইকারী নিজের কাঁপা হাতের দিকে তাকাল। আমার চোখমুখের অতি-প্রাকৃতিক আত্মবিশ্বাস আর সুগভীর সায়েন্টিফিক লেকচার শুনে তার মানসিক প্রসেসর এক লহমায় হ্যাং করে গেল!

সে আতঙ্কিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাইরে ভাই... তোরা কোন গ্রহের মানুষ রে? টিয়া পাখির মতো কী সব মন্ত্র পড়ছিস? এই নে তোর মানিব্যাগ, আমারে মাফ কর ভাই!"

ছিনতাইকারী সোজা রামদাটা মাটিতে ফেলে দিয়ে 'আল্লাগো' বলে উল্টো অভিমুখে উল্কা বেগে দৌড় লাগাল!

মিলি রিকশায় বসে চোখ গোল গোল করে পুরো ঘটনাটা দেখছিল। আমি নিচু হয়ে রামদাটা একপাশে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত শান্ত পায়ে আবার রিকশায় উঠে বসলাম।

"তু... তুমি স্রেফ মুখের কথায় একটা চকচকে রামদাধারী ছিনতাইকারীকে ভাগিয়ে দিলে?!" মিলির গলায় চরম বিস্ময়!

"হিসেব খুব সাধারণ, মিলি," আমি চশমাটা ঠিক করতে করতে বললাম। "ভয় হলো স্রেফ একটা মানসিক এনট্রপি। সঠিক সময়ে সঠিক লজিক প্রয়োগ করলে তা শূন্যে নেমে আসে।"

মিলি এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। খিলখিল করে হেসে উঠে আমার কাঁধে মাথা রাখল।

ঠিক তখনই আমার পকেটের ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠলো। ডিসপ্লেতে জ্বলজ্বল করছে—'AMMA'।

ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ৯ ডেসিবল সাউন্ডের একটা কর্কশ কন্ঠ ভেসে এলো, "নিয়াজ! তুই কোথায় রে হতভাগা? বরপক্ষ চলে এসেছে! তোকে না বললাম সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আসতে? তুই না এলে কি কনে সাজবে নাকি? এখনই না আসলে তোকে ত্যাজ্যপুত্র করার প্রসেস শুরু করব!"

আমি ফোনের স্পিকারটা কান থেকে একটু দূরে সরিয়ে মিলির দিকে তাকালাম।

"দেখলে তো মিলি?" আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। "দুনিয়ার সব ছিনতাইকারীকে হয়তো পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে পর্যুদস্ত করা সম্ভব, কিন্তু আম্মার থার্মোডাইনামিক এনার্জির সামনে স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনও ব্যর্থ! আমাদের এখন আলোর গতিতে দৌড়াতে হবে!"

মিলি হেসে গড়িয়ে পড়ল। রিকশাচালক এবার দ্বিগুণ বেগে প্যাডেল ঘুরাতে শুরু করল, আর আমরা ছুটলাম প্রতিবেশীর সেই পরম বিশৃঙ্খল বিয়ের আসরের উদ্দেশ্যে!

#মিস্টার_পারফেক্ট

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login