৫.
নিচতলার রহিম চাচার মেয়ের গায়েহলুদ। পাশের ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসা ডিজে সাউন্ডের থ্রি-ডি বিট আর বেসের চোটে আমার ঘরের পড়ার টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসটা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপছিল। আম্মা জোর করে আমাকে একটা পাঞ্জাবি চাপিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সেখানে। আমার মোক্ষম যুক্তি ছিল—‘যে অনুষ্ঠানে শব্দের তীব্রতা ১০০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়, সেখানে বায়োলজিক্যাল কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৫ পার্সেন্ট!’ কিন্তু আম্মার চোখের কোণের সেই মারাত্মক চিমটি কাটার হুমকির সামনে আলবার্ট আইনস্টাইনের থিওরিও এক সেকেন্ডে কলাপস করে গেল।
ফ্ল্যাটে ঢুকতেই মনে হলো আস্ত একটা গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। মানুষের ভিড়, পানের পাতা চিবানোর শব্দ, আর কড়া সুগন্ধি তেলের গন্ধে অক্সিজেন লেভেল প্রায় তলানিতে। আমি এক কোণে দেওয়াল ঘেँষে দাঁড়িয়ে মনে মনে হিসাব করছিলাম—এই যে মানুষ দলবেঁধে গায়ে হলুদ মাখানোর উৎসবে মেতে ওঠে, এর পেছনে নিছক কোনো আনন্দ নেই; পুরোটাই হলো একটা যৌথ এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধির মহোৎসব!
ঠিক তখনই ঘটে গেল চরম বিপত্তি।
পাড়ার একটু বখাটে টাইপের ছোট ভাই রতন—যার ভর আনুমানিক ৭০ কেজি এবং বেগ প্রায় ১৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা—হাতে এক বাটি পীতবর্ণের কাঁচা হলুদ নিয়ে সোজা বিমানের মতো আমার দিকে ধেয়ে এলো। তার একটাই মিশন, আমাকে অন্তত তিন কেজি হলুদ মাখিয়ে ভূত বানিয়ে দেওয়া।
আমি সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তার গতিপথ, মোমেন্টাম আর আমার থেকে দূরত্ব মেপে ফেললাম। নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুযায়ী, সে আর এক সেকেন্ড সময় পেলে তার কাইনেটিক এনার্জি সোজা আমার নতুন পাঞ্জাবির বুকে গিয়ে আছড়াবে।
আমি অত্যন্ত শান্ত গলায় হাত উঁচিয়ে তাকে থামতে বললাম, "রতন! থামা বলছি! হলুদ হলো একটা কলয়েডাল সলিউশন। এর সান্দ্রতা বা ভিসকাস ফোর্স এত বেশি যে, একবার কাপড়ে লাগলে তা কোনো সাবান দিয়ে মোছা সম্ভব নয়। আর তোমার বর্তমান ত্বরণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে তুমি আমার বাঁকা চশমার ফ্রেমে ধাক্কা খেয়ে বড় ধরনের কোয়ান্টাম দুর্ঘটনা ঘটাতে পারো!"
কিন্তু রতন কি আর ফিজিক্স বোঝে? সে দাঁত কেলিয়ে এক লাফে আমার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আমি বাঁচার জন্য একপাশে একটু ফিজিক্যাল সাইড-স্টেপ নিলাম। কিন্তু আমার ডান পা পড়ল ঠিক তখুনি ফ্লোরে পড়ে থাকা এক ফোঁটা রসবোস বা মিষ্টির সিরাপে! ফ্ল্যাটের মার্বেল ফ্লোর ভীষণ পলিশ করা, যার গতি ঘর্ষণ গুণাঙ্ক বা কোফিশিয়েন্ট অফ ফ্রিকশন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
ফলাফল? বরফ ছাড়া স্কেটিং রিং-এ আইস স্কেটার যেমন ঘুরে যায়, আমি ঠিক তেমনি শূন্যে দুই পাক ঘুরে সোজা গিয়ে পড়লাম খাটের ওপর উপুড় হয়ে বসে থাকা পাড়ার সেই নাকউঁচু মুরুব্বি সোবহান চাচার কোলে!
আর রতনের হাতের বাটি থেকে উড়ে যাওয়া এক ডেলা ঘন কাঁচা হলুদ সোজা গিয়ে ল্যান্ড করল সোবহান চাচার একদম চকচকে টাক মাথার ঠিক মাঝখানে!
চারপাশের হইচই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ডিজে বক্সের গানটা পর্যন্ত যেন এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে থমকে গেছে। সবাই হা করে তাকিয়ে রইল।
সোবহান চাচা রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে টাক থেকে হলুদ মুছতে মুছতে চেঁচিয়ে উঠলেন, "নিয়াজ! তোর এই ফিজিক্সের গুষ্টি কিলাই!"
আমি তখন চাচার কোল থেকে উঠে নিজের পাঞ্জাবি ঝেড়তে ঝেড়তে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে বললাম, "চাচা রাগ করছেন কেন? এটা তো নিছকই অ্যাকশন-রিঅ্যাকশনের নিয়ম। আপনি চাইলে রতনের মোমেন্টামকে দোষ দিতে পারেন, কিংবা ফ্লোরের লো ফ্রিকশনকে। এতে আমার কোনো হাত নেই, সবটাই ফিজিক্সের দোষ!"
সোবহান চাচার মাথায় হলুদের ডেল্টা সাইনটা যেন নতুন কোনো উপগ্রহের মতো জ্বলজ্বল করছিল। চারপাশের আমন্ত্রিত মেহমানদের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছিল, তারা সবাই একসাথে থার্মোডাইনামিকসের দ্বিতীয় সূত্র স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছেন—অর্থাৎ, পুরো ঘরের অর্ডার বা শৃঙ্খলা এক লহমায় চরম কেওস বা বিশৃঙ্খলায় রূপ নিয়েছে!
সোবহান চাচা লাল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন, "ফিজিক্সের দোষ মানে? তুই আমার মাথার চান্দিতে এক বাটি হলুদ ঢেলে দিয়ে এখন সায়েন্সের অজুহাত দিচ্ছিস? তোর চশমা আমি আজকে ভেঙে গুড়ো করব!"
চাচার সেই গর্জন শুনে রতন তো আগেই পাতলা বাতাসে মিলিয়ে গেছে। ঘরে বাকি যারা ছিল—রহিম চাচা, পাড়ার তিন-চারজন মুরুব্বি আর সুট-টাই পরা দু-একজন আত্মম্ভরী আত্মীয়—সবাই স্তম্ভিত।
আমি কিন্তু মোটেই ঘাবড়ালাম না। চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নাকের ওপর আরেকটু ঠেলে সোজা করে নিলাম। বিজ্ঞান কখনোই আবেগের কাছে মাথা নোয়ায় না। অত্যন্ত শান্ত ও যুক্তিনির্ভর গলায় জবাব দিলাম—
"দেখুন সোবহান চাচা, আবেগ দিয়ে তো আর গ্র্যাভিটি চলে না! বিষয়টাকে একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করুন। রতনের হাতের বাটি থেকে যখন হলুদটা বিচ্যুত হলো, তখন তার গতিপথ ছিল একটা নিখুঁত প্যারাবোলা বা পরাবৃত্ত। আপনার মাথার উপরিভাগ সম্পূর্ণ মসৃণ এবং এর রেডিয়াস অফ কারভেচার বা বক্রতার ব্যাসার্ধ এমন যে, পরাবৃত্তটি ঠিক আপনার টাকের শীর্ষবিন্দুতেই আপতিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ৯৯.৮ পার্সেন্ট। আপনি যদি ওখানে না বসে অন্তত ১৫ ডিগ্রি কোণে বাঁদিকে ঘেঁষে বসতেন, তবে এই হলুদ সোজা গিয়ে পড়তো রহিম চাচার সোফার কুশনে!"
রহিম চাচা পাশে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ঘটনা দেখছিলেন। আমার কথা শুনে উনি এক লাফে দুই ধাপ পিছিয়ে গিয়ে বললেন, "অ্যাঁ! আমার কুশনে কেন পড়তে যাবে? নিয়াজ, তুই বরকে আশীর্বাদ করতে এসে এই সব কী মারপ্যাঁচ কচ্ছিস রে বাবা?"
"এটা মারপ্যাঁচ নয় রহিম চাচা," আমি হাত নেড়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। "এটাকে বলে প্রজেক্টাইল মোশন বা প্রাক্ষেপিক গতি। হলুদ কিন্তু নিজ ইচ্ছায় চাচার মাথায় যায়নি। মহাবিশ্বের গতিসূত্র তাকে বাধ্য করেছে।"
সোবহান চাচা ততক্ষণে একটা তোয়ালে দিয়ে মাথা মোছার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কাঁচা হলুদ আর তোয়ালের তন্তুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উনার টাকের রঙ এখন প্রায় সূর্যমুখী ফুলের মতো উজ্জ্বল হলুদ হয়ে উঠেছে! উনি চোখ ছোট ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে কিচিরমিচির করে উঠলেন, "পদার্থবিজ্ঞান মারতে এসেছিস? তোদের এই ছাইপাঁশ থিওরির কারণেই আজকের যুগের ছেলেপেলেদের আদব-কায়দা উঠে গেছে! চল, তুই আর ওই রতন মিলে এখন এই ফ্লোর আর আমার মাথা পরিষ্কার করবি!"
ঠিক তখনই বরপক্ষের ডজনখানেক মেহমান ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন। তাদের পরনে চকচকে শেরওয়ানি, মুখে ভাবগম্ভীর এক্সপ্রেশন। তারা ঢুকেই এমন এক দৃশ্য দেখলেন—এক মুরুব্বির মাথায় ঝলমলে হলুদ, পাড়ার এক সায়েন্সের পোকা চশমা ঠেলতে ঠেলতে পদার্থবিজ্ঞান শেখাচ্ছে, আর ফ্লোরে ছড়িয়ে আছে মিষ্টির রস আর হলুদের কাদা!
বরপক্ষের একজন বয়স্ক মুরুব্বি মুখ বাঁকিয়ে বললেন, "হুম! কনেপক্ষের আয়োজনের যা বহর দেখছি! বিয়ের আগেই গায়েহলুদে হাঙ্গামা? ফ্লোরজুড়ে হলুদ আর সিরা ছিটানো, এ তো চরম অব্যবস্থা!"
কনে রহিম চাচার মুখ এক লহমায় চুন হয়ে গেল। গায়েহলুদের আসরে বরপক্ষের কাছে এমন কথা শোনার চেয়ে অপমানজনক আর কী হতে পারে! উনি হাত জোড় করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমার মেটাফিজিক্সের আত্মসম্মানে লেগে গেল।
আমি এক পা এগিয়ে বরপক্ষের ওই মুরুব্বির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
"জনাব," আমি গম্ভীর গলায় বললাম, "আপনার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত ভুল এবং বিজ্ঞানের নীতিবহির্ভূত। আপনি যেটাকে 'অব্যবস্থা' বলছেন, সাইকোলজিক্যালি এবং ফিজিক্যালি তা আসলে একটা চরম প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া! এই ফ্লোরে যা দেখছেন, তা হলো ভরবেগ আর ঘর্ষণের এক অপূৰ্ব ভারসাম্য। আর সোবহান চাচার মাথায় যে হলুদ দেখছেন, হলুদ হলো অত্যন্ত উৎকৃষ্টমানের প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক। উনার মাথার ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে এই হলুদের ভূমিকা অসামান্য। আপনি এটাকে হাঙ্গামা না বলে 'অ্যাভান্ট-গার্ড স্কিন ট্রিটমেন্ট' বলতে পারেন!"
বরপক্ষের লোকটা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন তিনি এতক্ষণ কোনো মহাকাশযানের এলিয়েনের কথা শুনছিলেন। উনার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না।
সোবহান চাচা তোয়ালে হাতে থমকে গিয়ে নিজের মাথায় হাত বোলালেন, "অ্যাঁ? সত্যি? ব্যাকটেরিয়া মরে?"
"অবশ্যই চাচা!" আমি বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লাম। "হলুদে থাকা কারকিউমিন উপাদান আপনার ত্বকের সেলুলার ড্যামেজ রোধ করবে। তাছাড়া আপনার মাথার ত্বকের রিফ্লেক্টিভ ইনডেক্স বা প্রতিসরাঙ্ক এখন এত নিখুঁত যে, ঘরের লাইটের আলো প্রতিফলিত হয়ে পুরো ড্রয়িংরুমটা ২০ পার্সেন্ট বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে! আপনি তো আসলে এই অনুষ্ঠানের প্রাইমারি লাইট সোর্স হয়ে উঠেছেন!"
কথাটা শোনামাত্রই ড্রয়িংরুমের ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো একযোগে হেসে উঠল। রহিম চাচার মুখেও জমে থাকা দুশ্চিন্তার মেঘ এক লহমায় কেটে গিয়ে ফুটল এক চওড়া হাসি।
বরপক্ষের লোকটিও নিজের ভুল বুঝতে পেরে হালকা হেসে বললেন, "বাহ্! কনেপক্ষের ছেলে তো দারুণ কথা বলে! বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা দিয়ে এমন গোলমেলে পরিবেশ হাসিখুশি করে দিল!"
রহিম চাচা তড়িঘড়ি করে বরপক্ষকে টেবিলে খাওয়ার জন্য নিয়ে গেলেন। সোবহান চাচা আয়নায় নিজের হলুদ মাথাটা একবার দেখে, চশমাটা ঠিক করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "হুম... তা তুই যা বললি, আলো সত্যি বেশি ছড়াচ্ছে নাকি রে নিয়াজ?"
"শতভাগ বৈজ্ঞানিক সত্য, চাচা," আমি চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে বললাম। "তবে পরবর্তী ১ ঘণ্টার মধ্যে হালকা ঈষদুষ্ণ পানি দিয়ে না ধুলে কারকিউমিন স্থায়ী দাগ ফেলে দিতে পারে, যা অপটিক্যাল ফাইবারকেও হার মানাবে!"
সোবহান চাচা 'ইয়া মাবুদ' বলে বাথরুমের দিকে দৌড় লাগালেন।
আমি নিজের পাঞ্জাবির হাতাটা একটু গুঁটিয়ে খাবারের টেবিলের দিকে পা বাড়ালাম। রোস্ট আর খাসির রেজালার সুবাস চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। পেটের ভেতরে পাকস্থলীর এসিড ততক্ষণে ক্ষরণ শুরু করে দিয়েছে। কাঁচা হলুদের এনট্রপি তো সামলানো গেল, এবার দেখা যাক রোস্টের ভর আর আমার খিদের রাসায়নিক সাম্যাবস্থা কীভাবে মেলানো যায়!
#মিস্টার_পারফেক্ট