Story

মিস্টার পারফেক্ট ৭ মেগা এপিসোড: বিয়েবাড়ি ও পাত্রপক্ষের ক্যাঁচাল

October 23, 2026

21 views

৭.

আম্মার হুকুমের সামনে নিউটনের গতিসূত্র আর মেটাফিজিক্সের জটিল থিওরি যে কতটা অসহায়, তা আমি এই নিয়ে অন্তত হাজারখানেক বার হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
বিয়ের বাড়ির গলির মুখে আসতেই মনে হলো, একটা আস্ত কেওস থিওরি বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব যেন সশরীরে রাস্তায় নেমে এসেছে। মাইকে বিকট শব্দে বাজছে—‘সোনা বন্ধু তুই আমারে করলি রে দেওয়ানা’। সাউন্ড স্পিকারের নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির বিটের চোটে আমার বুকের খাঁচার হাড়গুলো পর্যন্ত তিন মিলিমিটার করে কেপে উঠছিল। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে কানের দুই ফুট দূরত্বে ধরে রাখলাম। সাউন্ড ডেসিবল মিটার চালু করার মানসিক অবস্থা তখন ছিল না, তবে ধারণা করছি স্পিকারের পাশের নয়েজ লেভেল সহজেই ১০০ ছাড়িয়ে গেছে।
কনে রহিম চাচার বাড়ির গেটে ফুলের চাদর দিয়ে তৈরি একখানা তোরণ। ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য! মানুষজন যেন সব অণু-পরমাণুর মতো ব্রাউনিয়ান মোশনে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে। একদল পিচ্চি রানিং ভেলোসিটি বাড়িয়ে বরপক্ষের দিকে প্লাস্টিকের বল ছুঁড়ছে, অন্যপাশে ডেকোরেটরের লোক দুটো ভারী কাঠের ফোল্ডিং টেবিল ঘাড়ের ওপর ব্যালেন্স করে পার করার বিফল চেষ্টা চালাচ্ছে।
আমি অত্যন্ত সতর্ক পায়ে পা ফেলে ভিড় কেটে ভেতরের দিকে এগোচ্ছিলাম। কারণ এই মুহূর্তে যদি কেউ ভুলবশত আমার ওপর ধাক্কা মারে, তবে আমার ফোরওয়ার্ড মোমেন্টামের কারণে আমি গিয়ে পড়বো সোজা বরপক্ষের সেই ভাবগম্ভীর জ্যাঠামশাইয়ের কোলে!
ঠিক তখনই ঘটে গেল আসল ঘটনা। বর আসছে শুনে মেয়েপক্ষের জনা আটেক তরুণী এক লহমায় করিডোরের চিপায় বরের জুতো লুকানোর পরিকল্পনা ফাঁদতে জড়ো হলো। তাদের চেঁচামেচি আর প্যাঁচাল শুনে মনে হচ্ছিল একটা মিনি সাইজের মহাজাগতিক ক্যাচাল শুরু হয়েছে।
আমি চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে তাদের কোণঠাসা অবস্থান থেকে বের হয়ে পেছনের ছোট বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়ালাম। এখানে অন্তত থার্মোডাইনামিকসের অক্সিজেন লেভেল একটু স্বাভাবিক।
হুট করে পকেটের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো। ভাইব্রেশনের প্যাটার্ন দেখেই আমি বুঝে গেলাম সিগন্যাল কার।
স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে—'Unknown Number'। কিন্তু আমার নিউরাল নেটওয়ার্ক জানে, এই সিগন্যালের ওপাশে কে।
ফোনটা কানে তুলতেই মিলি কোনো ভূমিকা ছাড়াই খিলখিল করে হেসে উঠলো। "কী খবর, ডক্টর নিয়াজ? আম্মার ডেসিবল ভয়েস অ্যালার্ম শুনে কত কিলোমিটার পার আওয়ার বেগে দৌড়ে বিয়ে বাড়িতে পৌঁছালেন?"
আমি লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়ালাম। "মিলি, তুমি হাসছ? কিন্তু এই বিয়ে বাড়ির এনট্রপি লেভেল এখন চরম সীমায়। বায়োলজিক্যাল কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা ৯০ পার্সেন্ট। এর চেয়ে আমাকে একটা কোয়ান্টাম ব্ল্যাকহোলে ছুঁড়ে দিলে বেশি শান্তিতে থাকতাম।"
"আহা! সায়েন্টিস্টের মাথাটা দেখছি আজকেও বেশ গরম," মিলি উসকে দেওয়ার মতো মিষ্টি গলায় বলল। "তা বরের জুতো লুকানো টিমকে কোনো স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইস দিলেন না? জুতো যে অক্ষরেখায় লুকিয়ে রাখলে মোমেন্টাম জিরো থাকে?"
"পাগলামি কোরো না মিলি," আমি কপালে হাত দিয়ে বললাম। "জুতোর জ্যামিতিক অবস্থান দিয়ে কখনোই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে আমি যেটা খেয়াল করলাম, বরপক্ষের মামী আর বরপক্ষের জ্যাঠামশাই কিন্তু গেটে ঢোকার সময় থেকেই মুখ কালো করে আছেন। তাদের সাইকোলজিক্যাল প্রসেসর কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে শর্ট সার্কিট হতে পারে।"
মিলি ওপাশ থেকে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমিও তো তাই বলছি! আমার সোর্স থেকে খবর পেয়েছি—বরপক্ষের মামী অলরেডি কনেপক্ষের সালাদের কাটা শসা আর ডেকোরেশনের বাঁকা কোণ নিয়ে প্যানপ্যান শুরু করে দিয়েছেন। তুমি কিন্তু তোমার সায়েন্টিফিক মেটাফিজিকসের অস্ত্র একবারে রেডি রাখো, ডক্টর! যেকোনো সময় ফায়ার করতে হতে পারে!"
আমি চশমাটা আর একবার নাকের ওপর ঠিক করে নিলাম। "অস্ত্র তো প্রস্তুতই থাকে মিলি। তবে সমস্যা হলো, অবৈজ্ঞানিক সব ঝগড়া সামলাতে গিয়ে আমার মস্তিষ্কের ডোপামিন লেভেল যে জিরোতে গিয়ে ঠেকছে!"
"চিন্তা নেই," মিলি হেসে বলল। "আজকের টেস্ট রান বা পরীক্ষা যদি সাকসেসফুল হয়, তবে কালকের ডেটে আপনাকে অতিরিক্ত দুই বাটি ফুচকা বোনাস দেওয়া হবে। উইথ এক্সট্রা টক!"
ফোনটা কট করে কেটে গেল।
ফুচকার টকের রাসায়নিক ক্রিয়ার কথা ভেবে আমার মুখের লালাগ্রন্থি অলরেডি তরল নিঃসৃত করতে শুরু করেছিল। কিন্তু তখনই পাশ থেকে হঠাৎ এক কর্কশ নারী কণ্ঠ ভেসে এলো, "ওমা! ডেকোরেশনের এই প্যান্ডেলটা এত ত্যাড়াবেঁকা কেন গো? ছাদটা তো সোজা না! মেয়েপক্ষ কি চোখ বুজে টাকা ঢেলেছে নাকি?"
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি—অ্যাকশন শুরুর সিগন্যাল এসে গেছে। বরপক্ষের সেই রাশভারী মামী তাঁর ভারী ফ্রেমের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে প্যান্ডেলের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আছেন!
আমার মেটাফিজিক্সের ইঞ্জিন তখন অলরেডি ওয়ার্ম-আপ করা শেষ। আজ দেখা যাক, অনাকাঙ্ক্ষিত কুসংস্কার আর অবৈজ্ঞানিক ত্যাড়ামেপির জবাবে ফিজিক্সের লজিক ঠিক কতটা ধারালো হতে পারে!

বরপক্ষের সেই রাশভারী মামী—উনার নাম সম্ভবত রেশমা মামী—চোখের চশমাটা নাকের ডগায় একদম ১০ ডিগ্রি কোণে ঝুলিয়ে দিয়ে প্যান্ডেলের বাশে আর কাপড়ে খুঁত খুঁজছিলেন। উনার মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল, উনি কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে আসেননি, এসেছেন নাসা (NASA)-র রকেট লঞ্চিং প্যাডের অডিট করতে।
"ওমা! রহিম ভাই কি চোখে ছানি দেখেছেন নাকি?" মামী তাঁর ভারী গলার ফ্রিকোয়েন্সি একটু বাড়িয়ে চারপাশে মেহমানদের শোনানোর ভঙ্গিতে বললেন, "প্যান্ডেলের বাঁশের পিলারের অ্যাঙ্গেলটাই তো সোজা না! এই ঢালু ব্যাকড্রপের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুললে আমার ছবি তো পিসার হেলানো টাওয়ারের মতো আসবে! কনেপক্ষের কোনো রুচি বলতে কিছু নেই!"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কনেপক্ষের রহিম চাচার মেজো বোন—অর্থাৎ আমাদের শিউলি খালাম্মা—উনার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে একদম শুকিয়ে আমসি হয়ে গেল। পাড়ার আর পাঁচটা মানুষ হলে হয়তো সামাজিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা করে মুখ বুজে সয়ে নিত। কিন্তু আমার মস্তিষ্কের সাব-কনশাস মাইন্ড তখন অলরেডি বৈজ্ঞানিক যুক্তির ঢাল-রথের চাকা ঘুরিয়ে ফেলেছে।
আমি অত্যন্ত সাবলীল ও ধীরস্থির পায়ে মামীর থেকে ঠিক ১.৫ মিটার দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ালাম। চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নাকের ওপর ঠেলে শান্ত ও গম্ভীর গলায় বললাম—
"মামীজি, আপনার এই প্রাথমিক পর্যবেক্ষণটি দৃষ্টিভঙ্গির চরম বিভ্রান্তি বা অপটিক্যাল ইলিউশনের এক চমৎকার উদাহরণ।"
মামী হঠাৎ করে উনার পাশে এক চশমাপরা তরুণকে অত্যন্ত বিজ্ঞের মতো ডায়ালগ মারতে দেখে চমকে উঠলেন। চশমাটা চোখের সামনে ধরে কটমট করে তাকাল, "অ্যাঁ?! কী বললে তুমি? তুমি আমাকে অপটিক্যাল ইলিউশন শেখাচ্ছ? আমার চোখ সোজা জিনিস বাঁকা দেখে?"
"আপনার চোখ সোজা জিনিসকেই সোজা দেখছে, কিন্তু সমস্যাটা আপনার রেটিনায় আলো পৌঁছানোর কোণে," আমি অত্যন্ত বিনীত ভঙ্গিতে বুঝিয়ে বললাম। "একটু গভীরভাবে খেয়াল করুন। প্যান্ডেলের যে বাঁশটাকে আপনি 'তাত্পর্যপূর্ণ ঢালু' ভাবছেন, সেটার নতিমাত্রা বা স্লোপ আসলে শূন্য। আসল ঘটনা হলো, আপনার চোখের চশমার ফ্রেমটি ডানদিকে আনুমানিক ৭ ডিগ্রি হেলে আছে, যার ফলে আলো যখন বায়ু মাধ্যম থেকে আপনার চশমার উচ্চ প্রতিসরাঙ্কের কাচে প্রবেশ করছে, তখন তা সমকোণে প্রতিফলিত না হয়ে সামান্য প্রতিসরিত হচ্ছে।"
মামী চোখ গোল গোল করে নিজের চশমার ফ্রেমে হাত দিলেন, "মানে? আমার চশমা বাঁকা?!"
"শুধু চশমা নয়," আমি আরও একটু এগিয়ে গিয়ে প্যান্ডেলের খুঁটির দিকে নির্দেশ করলাম। "প্যান্ডেলের ব্যাকড্রপে যে লাল আর সোনালি কাপড়ের প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়েছে, তার জিওমেট্রিক লাইনের সাথে ড্রয়িংরুমের ৩ হাজার ক্যান্ডেলা পাওয়ারের টিউবলাইটের আলোর এক অদ্ভুত ইন্টারফেয়ারেন্স বা ব্যতিচার তৈরি হয়েছে। এটাকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'জেরার্ড ইলিউশন'। কাপড় কিন্তু সোজা, কিন্তু আপনার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম সেটিকে হেলানো হিসেবে প্রসেস করছে। অর্থাৎ দোষ প্যান্ডেলের নয়, দোষ হলো আলোকবিজ্ঞানের সরল সূত্রের!"
মামী হাঁ করে প্যান্ডেলের বাঁশ আর কাপড়ের দিকে বারবার তাকাতে লাগলেন। উনার মাথার প্রসেসর তখন জেরার্ড ইলিউশন আর প্রতিসরাঙ্কের হিসেব মেলাতে গিয়ে রীতিমতো ধোঁয়া ছাড়ার জোগাড়!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলি খালাম্মা এবার একটু আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে মুখ টিপে হেসে বললেন, "শুনলেন তো ভাবী? আমাদের নিয়াজ তো আবার বিজ্ঞানের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী! ও যা বলছে, সব একদম খাঁটি থিওরি!"
মামী চরম অস্বস্তিতে পড়ে নিজের চশমাটা হাত দিয়ে টেনে সোজা করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বললেন, "আরে না... মানে... আমি তো বলছিলাম যে আলোর এফেক্টটা একটু অন্যরকম লাগছে আর কি! তা... তোমার নাম যেন কী বললে?"
"আমি নিয়াজ, মামীজি। মহাবিশ্বের যেকোনো ত্যাড়াবেঁকা জিনিসকে লজিক দিয়ে সোজা করাই আমার কাজ," আমি একটা ছোট্ট মুচকি হাসি উপহার দিলাম।

মামী আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিলেন না। শাড়ির আঁচলটা সামলে নিয়ে মুখ চুন করে সোজা ভিড়ের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেলেন!
আমি বিজয়ের হাসিসহ চশমাটা আর একবার নাকের ওপর ঠিক করে নিলাম। যাক, মীরজাফরি অপটিক্যাল ইলিউশনের অবৈজ্ঞানিক নাটক আপাতত ভেস্তে দেওয়া গেছে। এবার দেখা যাক ডাইনিং হলের থার্মোডাইনামিকস কী রূপ নেয়!
ডাইনিং হলে পা রাখতেই এক অদ্ভুত সুবাস আর হট্টগোলের ককটেল নাকে-কানে এসে ধাক্কা দিল। সারি সারি টেবিল, লাল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার, আর তার ওপর বাসনের থালা-বাটির ঝনঝন শব্দ। মেহমানরা যেন এক চরম 'থার্মোডাইনামিক কেওস'-এর মধ্য দিয়ে খিচুড়ি আর কাচ্চির অনুপাত মেলাতে ব্যস্ত!
আমি একটুকরো ফাঁকা জায়গা দেখে সাবধানে বসতে যাব, ঠিক তখনই তিন নম্বর টেবিল থেকে এক বিকট হাঁক ভেসে এলো।
"অ্যাই ডেকোরেটর! বয়! এদিকে আয় তো!"
চেঁচামেচি শুনে চোখ গেল পাত্রের নামকরা খিটখিটে ফুফা—মতিন ফুফার দিকে। উনার পরনে পাঞ্জাবি, কিন্তু মেজাজটা যেন একেবারে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটছে। প্লেটের খাসির মাংসের বিশাল এক পিস চামচ দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে উনার মুখমণ্ডল চরম বিরক্তিতে কুঁচকে গেছে।
"এইটা কিসের মাংস দেওয়া হয়েছে? হাড্ডি আর চর্বির বস্তা!" ফুফা চেঁচিয়ে চারপাশের অন্তত জনা তিরিশেক খদ্দেরের আকর্ষণ কেড়ে নিলেন। "মাংসের পিসটা তো পুরা চর্বির লেয়ারে ঢাকা! আর এই চাল? সান্দ্রতা বলতে কিছু নেই, মসলার মলিকিউলার ডেনসিটি একদম জিরো! এ কি মানুষে খায়, নাকি বরপক্ষকে অপমান করার জন্য রান্না করা হয়েছে?"
কনে রহিম চাচা তো ডাইনিং হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। বরপক্ষের ফুফা যদি খাবারের সমালোচনা করে না খেয়ে উঠে যান, তবে সমাজে উনার ইজ্জতের আণবিক ভরের মান একদম শূন্যে নেমে আসবে!
ভিড়ের মধ্য থেকে আমি অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। চশমাটা নাকের ওপর ২ মিলিমিটার টেনে সোজা ফুফার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
"আসসালামু আলাইকুম, ফুফাজী," আমি অত্যন্ত গম্ভীর ও মার্জিত গলায় শুরু করলাম। "আপনার খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করাটা বায়োলজিক্যালি স্বাভাবিক হলেও, আপনার রাসায়নিক বিশ্লেষণ কিন্তু চরম ত্রুটিপূর্ণ।"
ফুফা মুখভর্তি বিরক্তি নিয়ে চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। "অ্যাঁ? তুই কে রে ব্যাটা? আমি কাচ্চির মসলা আর চর্বি নিয়ে কথা বলছি, আর তুই আমাকে কেমিস্ট্রি শেখাতে এসেছিস?"
"আমি ফুড কাইনেটিক্স আর মেটাফিজিক্সের কথা বলছি, ফুফাজী," আমি আঙুল দিয়ে উনার প্লেটের মাংসের পিসটি নির্দেশ করলাম। "আপনি যেটাকে 'ক্ষতিকারক চর্বির লেয়ার' ভেবে ভ্রুকুটি করছেন, থার্মোডাইনামিকসের প্রথম সূত্র অনুযায়ী সেটা আসলে একটা নিখুঁত 'থার্মাল ইনসুলেটর' বা তাপ-নিরোধক স্তর!"
ফুফা হা করে হাঁসের মতো তাকিয়ে রইলেন, "কী... কী ইনসুলেটর?"
"আহ্, সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলছি," আমি ডাইনিংয়ের সবাইকে শোনানোর জন্য গলার ফ্রিকোয়েন্সি একটু বাড়ালাম। "কাচ্চির ডেক যখন ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটছিল, তখন এই চর্বির স্তরটি বাফারের মতো কাজ করে মাংসের ভেতরের প্রোটিন আর জুসিনেসকে বাষ্পীভূত হতে দেয়নি। চর্বিটুকু যদি না থাকত, তবে তাপের সরাসরি প্রভাবে এই খাসির মাংসের মলিকিউলগুলো শুষ্ক হয়ে জুতার সোলের মতো শক্ত হয়ে যেত! রান্না করা বাবুর্চি আসলে একজন ছদ্মবেশী ফিজিসিস্ট, যিনি তাপের গতিবিদ্যা মেপে আপনাকে একটা পরম নরম মাংসের টুকরো উপহার দিয়েছেন!"
ডাইনিং হলের চারপাশে বসা লোকজনের মধ্যে তখন ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে। একজন মুরুব্বি বলেই ফেললেন, "কথা তো ভুল কয় নাই পোলা! চর্বি না থাকলে মাংস তো শুকাইয়া কাঠ হয়া যাইত!"
ফুফা একটু আমতা-আমতা করে চর্বির নিচে চামচ চালিয়ে দেখলেন, সত্যিই ভেতরে মাংসটা অবিশ্বাস্য রকমের নরম ও তুলতুলে! কিন্তু উনি হার মানার পাত্র নন। উনার অহংকারের ভেক্টর রাশি তখনও ধনাত্মক।
উনি গলার আওয়াজ একটু নামিয়ে বললেন, "হুম... তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু এই রাইসের গ্র্যাভিটি আর মসলার কী হবে? মসলা তো কম মনে হচ্ছে!"
"পেনিট্রেটিং পাওয়ার, ফুফাজী!" আমি টেবিলের দিকে ঝুকে এসে হাত নেড়ে বোঝালাম। "বেশি মসলা দিলে চালের কণাগুলো তাদের নিজস্ব অ্যারোমা বা সুবাস হারিয়ে ফেলে। বাবুর্চি এখানে মসলার 'অসমোসিস প্রক্রিয়া' বা অভিস্রবণ এমনভাবে ঘটিয়েছেন যে, মসলা চালের চালের ওপরে ভেসে না থেকে সোজা শর্করার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এটাকে বলে মলিকিউলার গ্যাস্ট্রো-ব্যালেন্স। আপনি যদি এই কাচ্চি না খেয়ে রেখে দেন, তবে কেমিক্যাল ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে এনট্রপি বৃদ্ধি পাবে, যা আক্ষরিক অর্থেই এক চরম সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক অপচয়!"
ফুফা আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না। উনার মস্তিষ্কের লজিক গেটগুলো আমার বৈজ্ঞানিক ডিফেন্সের সামনে এক এক করে কলাপস করে গেল।
উনি নিঃশব্দে চামচটা হাতে নিলেন। তারপর সেই তথাকথিত চর্বিযুক্ত খাসির মাংসের পিসটা সোজা মুখে পুরে দিলেন। ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড চর্বণ করার পর উনার মুখের এক্সপ্রেশন ১০০ ডিগ্রি বদলে গিয়ে পরম শান্তিতে রূপ নিল!
ফুফা প্লেটের দিক থেকে চোখ না তুলে হাত বাড়িয়ে বললেন, "অ্যাই বয়! এই ছেলেকে আরেক বাটি রেজালা আর এক্সট্রা রাইস দে তো! পোলাটা কথা খারাপ বলে নাই... ফিজিক্সের কাচ্চি আসলেই জিনিস একটা হইছে!"
রহিম চাচা দূর থেকে স্বস্তির লম্বা শ্বাস ফেললেন। আর আমি আমার চশমাটা আর একবার নাকের ওপর ঠেলে বিজয়ের হাসিসহ নিজের টেবিলের দিকে পা বাড়ালাম।
যাক! থার্মোডাইনামিক খাদ্যবিজ্ঞান দিয়ে ফুফাকে তো ঘায়েল করা গেল, এবার দেখা যাক মেইন স্টেজে বিয়ে ভাঙার যে বৈজ্ঞানিক মহানাটক অপেক্ষা করছে, তার গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়!
কাচ্চির থার্মোডাইনামিক ডিফেন্স দিয়ে ফুফাকে শান্ত করার ঠিক পনেরো মিনিট পরের কথা। ডাইনিং রুমের ঝামেলা মিটিয়ে কেবল স্টেজের দিকে পা বাড়িয়েছি, অমনি মেইন স্টেজের সামনে থেকে বিকট হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে এলো।
বরপক্ষের সর্বেসর্বা—অর্থাৎ পাত্রের বাবা শওকত সাহেব, যিনি পেশায় একজন ডাকসাইটে ব্যবসায়ী—গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছেন। উনার মুখের ফেসিয়াল মাসলগুলো এমনভাবে কাঁপছিল যেন রিখটার স্কেলে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প শুরু হয়েছে!
"না! এই বিয়ে আর হতে পারে না!" শওকত সাহেব প্যান্ডেলের ক্যানভাস কাঁপিয়ে গর্জে উঠলেন। "বরের বসার সিটের মোড়া নাকি ৩ ইঞ্চি নিচু? বরের বাবাকে একটা সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে? কনেপক্ষের অহংকার আর অসভ্যতা একদম চরমসীমায় পৌঁছে গেছে! বরপক্ষকে এমন অপমান করার কোনো মানে হয়? আমি এখনই ছেলে নিয়ে চলে যাচ্ছি!"
রহিম চাচা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন, "ভাইসাব, ভুল হয়ে গেছে! ডেকোরেটরের লোক ভুল করে...!"
"কোনো ভুল না! এটা চরম অসৌজন্যতা!" শওকত সাহেব হাত উঁচিয়ে বরকে হাত ধরে টেনে তুলে নিলেন। "চল রে নীরব! এই অযৌক্তিক পরিবারে তোর বিয়ে হতে পারে না!"
পুরো বিয়ে বাড়ির পরিস্থিতি এক লহমায় কলাপস করে গেল। কনের মা স্টেজের পাশে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ার উপক্রম। কনেপক্ষের আত আত্মীয়রা সব থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বরপক্ষের বাকি লোকজনও তখন ভাব গম্ভীর মুখে ক্যাচালটাকে বাতাস দিতে শুরু করেছে।
আমি চশমাটা নাকের ওপর ১.৫ মিলিমিটার টেনে ঠেলে সোজা স্টেজের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। দুই পক্ষ যেখানে চরম এনট্রপি আর আবেগের তুফান তুলছে, সেখানে আমার প্রবেশ ঘটলো একজন কোল্ড-হেডেড মেটাফিসিসিস্টের মতো।
"সম্মানিত পাত্রের পিতা," আমি অত্যন্ত স্পষ্ট ও গম্ভীর গলায় আহ্বান জানালাম। "আপনি যদি দুই মিনিট সময় দেন, তবে আমি গেম থিওরি এবং জ্যামিতিক সম্ভাব্যতা দিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারি যে, এই বিয়ে ভেঙে দেওয়াটা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় লস-ফাংশন বা আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনবে!"
শওকত সাহেব থমকে গিয়ে চোখ গোল গোল করে আমার দিকে তাকালেন। "অ্যাঁ?! তুই কে রে চশমাপরা ছোকরা? এখানে জীবনের হিসাব চলছে, আর তুই কীসের থিওরি ঝাড়ছিস?"
"আমি একজন সাধারণ বিজ্ঞানের ছাত্র," আমি স্টেজের চেয়ার আর মোড়ার দিকে হাত নির্দেশ করে বলতে শুরু করলাম। "প্রথমত, বর যে মোড়াটায় বসেছিলেন, সেটির উচ্চতা প্লাস্টিকের চেয়ারের চেয়ে ৩ ইঞ্চি কম হওয়ার কারণ কোনো অপমান নয়, এটি ফিজিক্সের 'সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি' বা ভরকেন্দ্রের সাম্যাবস্থা! বরের বিশাল শেরওয়ানি আর মাথার পাগড়ির ভরের কারণে উনাকে উচ্চতায় সামান্য নিচু না রাখলে উনি পেছন দিকে উল্টে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল ৮৭.৩ পার্সেন্ট! কনেপক্ষ আসলে বরের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে!"
শওকত সাহেব এক মুহূর্তের জন্য বরের ভারিক্কি পাগড়ির দিকে তাকালেন। বরের মাথা সত্যি ই সামান্য দুলছিল!
"দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে মোক্ষম কথা," আমি শওকত সাহেবের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে গলার আওয়াজ বাড়ালাম। "আপনার এই হঠাৎ বিয়ে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি 'ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম' বা সামাজিক সাম্যাবস্থার চরম বিরোধী। হিসেব করে দেখুন—আজকের এই আয়োজনে কনেপক্ষের খরচ হয়েছে আনুমানিক ৫ লাখ টাকা, আর আপনাদের গাড়িভাড়া ও কেনাকাটায় গেছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। আপনি যদি এখন বর নিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যান, তবে তাৎক্ষণিকভাবে আপনার আর্থিক ক্ষতি ৩ লাখ টাকা, সামাজিক ভাবমূর্তি বা সোশ্যাল রেটিং শূন্যের নিচে এবং ভবিষ্যতে নীরব ভাইয়ের জন্য নতুন কনে খোঁজার ক্ষেত্রে টাইম-ডিলে ফ্যাক্টর বেড়ে দাঁড়াবে অন্তত ২ বছর!"
স্টেজের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুরুব্বিরা হা করে পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন।
আমি থামলাম না, আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। "অথচ, এই মুহূর্তে যদি বিয়েটি সম্পন্ন হয়, তবে উভয় পক্ষের ইমোশনাল ও ফাইন্যান্সিয়াল রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) হবে শতভাগ ইতিবাচক! দুটি পরিবারের মহাজাগতিক এনট্যাঙ্গেলমেন্ট তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতের সমস্ত অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলাকে প্রতিহত করবে। এখন সিদ্ধান্ত আপনার—আপনি কি ৩ ইঞ্চি কাঠামোগত পার্থক্যের জন্য নিজের কোটি টাকার সামাজিক সাম্যাবস্থা বিসর্জন দেবেন, নাকি গেম থিওরির জয় স্বীকার করে শান্ত হয়ে বসবেন?"
পুরো প্যান্ডেলে তখন পিনপতন নীরবতা। কারো মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। শওকত সাহেবের মুখের রাগের রক্তিম ভাবটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে চরম বৈজ্ঞানিক চিন্তায় রূপ নিল। উনার প্রসেসর তখন ৩ লাখ টাকা, ২ বছর সময় আর ৩ ইঞ্চির হিসাব কষতে কষতে রীতিমতো হ্যাং করার পথে!
উনি আস্তে করে বরের হাতটা ছেড়ে দিলেন। তারপর চশমাটা খুলে হাত দিয়ে মুছে আবার চোখে পরে আমার দিকে এক পা এগিয়ে এলেন।
"তুমি... তুমি কথাগুলো বেশ কঠিন বললে ছোকরা, কিন্তু হিসেবটা তো একবিন্দুও ভুল বলোনি!" শওকত সাহেব একটা লম্বা শ্বাস ফেলে রহিম চাচার দিকে তাকালেন। "রহিম ভাই! আপনার এই ছেলে তো সায়েন্সের ক্যালকুলেটর! ও যা বোঝাল, তা তো চোখ খুলে দেওয়ার মতো!"
শওকত সাহেব নিজে গিয়ে আবার প্লাস্টিকের চেয়ারটায় বসে পড়লেন এবং বরকে টেনে মোড়ার ওপর বসিয়ে দিয়ে বললেন, "কই হে কাজি সাহেব! আর দেরি কেন? কাবিননামা নিয়ে আসেন! বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী বিয়ে এখনই সম্পন্ন হওয়া উচিত!"
পুরো প্যান্ডেলজুড়ে মুহূর্তেই আনন্দের রোল উঠে গেল! রহিম চাচা চোখের জল মুছতে মুছতে আমার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন।
আমি আবার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিলাম। যাক, গেম থিওরি আর সোশ্যাল মেটাফিজিক্সের জোর দিয়ে আজকে অন্তত একটা মহাজাগতিক কলাপস আটকানো গেল!

বিয়ের কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার পর প্যান্ডেলের পরিবেশটা হুট করেই কেমন যেন ভারী আর করুণ হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে আলোর ঝলকানি আর হাসির রুল ছিল, সেখানে এখন বিদায়ের করুণ সুর।
কনে—অর্থাৎ রহিম চাচার মেয়ে তাসনিমের—বিদায়ের মুহূর্ত এসে গেছে।
তাসনিম লাল বেনারসি শাড়িতে কনে সেজে যখন ধীর পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন তার চোখ দুটি লাল হয়ে বেশ ফোলা। নিজের বাড়ি, ঘর আর শৈশবের সমস্ত স্মৃতি পেছনে ফেলে এক অজানা ডোমেইনে পা রাখার অনুভূতিতে সে থরথর করে কাঁপছিল।
রহিম চাচা কেঁদে কেঁদে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এরপর তাসনিম এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে কাকে যেন খুঁজতে লাগলো। ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে দেখতে পেয়ে সে সোজা আমার দিকে এগিয়ে এলো।
কোনো কথা না বলে তাসনিম এক ঝটকায় আমার হাত দুটি শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়লো আমার পাঞ্জাবির হাতায়।
" নিয়াজ ভাই..." তাসনিম ভাঙা গলায় কেঁদে উঠে বলল, "আজকে যদি আপনি না থাকতেন, তবে আমার জীবনটা চিরতরে পণ্ড হয়ে যেত। বরপক্ষ যখন বিয়ে ভেঙে চলে যাচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল মহাবিশ্বটাই ভেঙে পড়েছে। আপনি শুধু বিয়েটাই বাঁচাননি, একজন রক্তের আপন ভাইয়ের মতো আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন।"
আমি ক্ষণিকের জন্য একটু স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সচরাচর মানুষের অতিরিক্ত আবেগীয় প্রকাশ বা বায়োলজিক্যাল অশ্রু নিরসন দেখলে আমার মস্তিষ্কের প্রসেসর একটু থমকে যায়। কিন্তু তাসনিমের এই নিখাদ আর সরল কৃতজ্ঞতা যেন আমার মেটাফিজিক্সের সমস্ত গাণিতিক কাঠিন্যকে এক লহমায় গলিয়ে দিল।
আমি অত্যন্ত মমতা দিয়ে তাসনিমের মাথায় হাত রাখলাম। চশমাটা বাঁ হাত দিয়ে একটু সোজা করে নিয়ে মৃদু হেসে বললাম—
"তাসনিম, কাঁদে না। কান্না হলো স্রেফ চোখের অতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড আর পানির নিঃসরন, যা তোমার এই সুন্দর রূপটার কনট্রাস্ট কমিয়ে দিচ্ছে। মনে রাখবে, বিয়েটা কোনো বিয়োগান্তক সমীকরণ নয়, এটা হলো দুটো সম্পূর্ণ পৃথক ভেক্টর রাশির এক নতুন দিকে যাত্রা। তুমি এক নতুন পরিবারে যাচ্ছ, নতুন একটা সিস্টেম তৈরি করতে। কোনো ভয় নেই। কোনো সমস্যা হলে তোমার এই বৈজ্ঞানিক ভাই কিন্তু সবসময় একটা ফোন কলেই এভেলেবল!"
আমার অবৈজ্ঞানিক অথচ পরম মমতাময় সান্ত্বনা শুনে তাসনিম চোখের জলের মাঝেই হালকা হেসে ফেলল। তারপর আমাকে ছোট করে একটা সালাম জানিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়াল। গাড়িটা যখন গলির মোড় ঘুরে ওজোন স্তরের ধোঁয়া উড়িয়ে হারিয়ে গেল, রহিম চাচা আমার কাঁধে একটা হাত রেখে বললেন, "নিয়াজ, আজ তুই প্রমাণ করলি, সায়েন্স শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, মানুষের বিপদেও কাজে আসে!"
রাত তখন একটা বেজে পঁচিশ মিনিট।
বিয়ের বাড়ির সমস্ত কোলাহল, আলো আর বিশৃঙ্খলা শেষে আমি নিজের শান্ত নিভৃত ঘরে ফিরে এসেছি। শরীরের প্রতিটা পেশিতে ল্যাকটিক এসিড জমা হয়ে বিষিয়ে উঠেছে, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। পাঞ্জাবিটা খুলে আরামদায়ক একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে মাত্র বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়েছি, ঠিক তখনই চেনা সিগন্যালে ফোনটা থরথর করে কেঁপে উঠলো।
স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে—'Unknown Number'।
ফোনটা কানে তুলতেই মিলি কোনো ভূমিকা ছাড়াই ওপাশ থেকে একরাশ মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে দিল।
"কংগ্র্যাচুলেশনস, ডক্টর নিয়াজ মোর্শেদ! আজকের এক্সপেরিমেন্ট তো ২০০% সফল! কনে তাসনিমকে তো এক্কেবারে আপন ভাইয়ের মতো উদ্ধার করলেন, আর বরপক্ষের বাবা-ফুফা-মামী—সবাইকে আপনার সায়েন্সের চাবুক দিয়ে সোজা করে দিলেন!"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালিশে মাথা রাখলাম। "মিলি, তুমি কি বিশ্বাস করবে? আজকে যে পরিমাণ থার্মোডাইনামিকস আর গেম থিওরি আমাকে অ্যাप्लाई করতে হয়েছে, তাতে আমার মস্তিষ্কের অন্তত চার জিবি ডোপামিন আর সেরোটোনিন ড্রপ করেছে। আমি এখন চরম ক্লান্ত।"
" আহা রে! আমার সায়েন্টিস্টের মাথাটা খুব পেকে গেছে, তাই না?" মিলি উসকে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল। "তা, অন্যের বিয়ের এত নাটক তো মেটাফিজিক্স দিয়ে সামলে দিলেন। এবার বলুন তো, নিজের বিয়ের দিন যখন বরপক্ষের হয়ে এই মামী আর ফুফারা ক্যাচাল বাঁধাবে, তখন কীভাবে সামলাবেন? নিজের বিয়ের দিনও কি স্টেজে দাঁড়িয়ে লেকচার দেবেন?"
আমি হালকা হেসে চশমাটা নাকের ওপর থেকে খুলে নাইটস্ট্যান্ডের ওপর রাখলাম। ঘরের অন্ধকারটা তখন বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে।
"আমার বিয়ের দিনে কোনো বিশৃঙ্খলা বা কেওস থিওরির অস্তিত্ব থাকবে না, মিলি," আমি নরম গলায় বললাম। "কারণ সেই বিয়ের সমীকরণের ওপাশে থাকবে একজন নিখুঁত অ্যানোনিমাস ক্যাটালিস্ট... অর্থাৎ তুমি! আর তুমি সাথে থাকা মানেই পুরো সিস্টেমটা পরম সাম্যাবস্থা বা পারফেক্ট ব্যালেন্সের মধ্যে থাকবে।"
ফোন লাইনের ওপাশ থেকে মিলি কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সম্ভবত আমার এই অকপট আর সরাসরি উত্তরটা প্রসেস করতে তার নিজের হৃদস্পন্দনের ফ্রিকোয়েন্সি কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল!
"হুম..." মিলি নিচু ও মিষ্টি গলায় ফিসফিস করে বলল, "কথায় তো বেশ ভালোই পটু হয়ে উঠছেন, মিস্টার পারফেক্ট! তা কাল বিকেলের ডেটে কখন আসছেন? ফুচকার টকের পিএইচ লেভেল মেপে দেব কিন্তু!"
"বিকেল ঠিক চারটা," আমি চোখে ঘুমের আমেজ নিয়ে মুচকি হাসলাম। "ফারম্যাটের সর্বনিম্ন সময়ের নীতি মেনেই আমি পৌঁছে যাব। গুড নাইট, মিলি।"
"গুড নাইট, নিয়াজ!"
ফোনটা কেটে যেতেই ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে আমি এক গাল হাসলাম। মহাবিশ্বের কত শত অজানা রহস্য, কত জটিল সমীকরণ—কিন্তু জীবনের আসল সৌন্দর্য যে এই সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আর সম্পর্কের মাঝে লুকিয়ে আছে, তা পদার্থবিজ্ঞানের কোনো বইয়ে লেখা থাকে না।
ঘুমে আমার চোখ দুটো বুজে এলো, আর আমার মস্তিষ্ক শান্তিতে পরবর্তী দিনের মহাজাগতিক ডেটের হিসেব কষতে শুরু করল!

#মিস্টার_পারফেক্ট

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login