Story

জালাল সাহেব

September 14, 2026

Musfique

10
View

অধ্যায় ০১: শিমুল বসে আছে একটা চেয়ারে। তার সামনে একটা টেবিল। সেটায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু বই, খাতা ও কলম। শিমুলের উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে, আগামীকাল তার ইংরেজি পরীক্ষা। সে বরাবরই ইংরেজিতে একটু কাঁচা, কাজেই একটা হাত কপালে রেখে খুব মনযোগ সহকারে পড়ার চেষ্টা করছে সে।

গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়। রাতের বেলাতেও ভ্যাপসা গরম পড়ে, আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে ভালো খবর হচ্ছে, বাইরে ঝড়ো বাতাস বইছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই বোধহয় ঝড়-বৃষ্টি হবে; কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যাবে তাতে। এদিকে ভেতরে শিমুলের কিছুই ভালো লাগছে না—কাল পরীক্ষা অথচ তার একদমই পড়ায় মন বসছে না। বরং তার কপাল ঘামছে; চোখে-মুখে ক্লান্তির চিহ্নগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে; বইয়ের পাতা ওল্টানোর মাঝেও যেন বিরক্তির ভাবটা প্রকাশ পাচ্ছে তার। আসলে এতে তার দোষ নেই—অতিরিক্ত গরমে কিছুতেই একনাগাড়ে মনোযোগ ধরে রাখা যায় না; খুব কম সময়ের মধ্যেই অসহ্য লাগতে শুরু করে সবকিছু।

শিমুল হটাৎ পড়া থামাল। হাতটা কপাল থেকে নামিয়ে রাখল টেবিলে। তারপর ঠিক করল এবার সে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নেবে—গল্পের বই পড়বে, রাতের খাওয়াদাওয়া করবে, তারপর সময় থাকলে পড়তে বসবে আবার। যেই ভাবা, সেই কাজ—হাতে একটা বই নিয়ে, পা দুটো টেবিলে তুলে দিয়ে পড়তে লাগল সে।

শিমুল আগে গ্রামে থাকত। গ্রামের একটা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে শহরে এসেছিল সে। শহরে এসে প্রথমে শিমুল কয়েকমাস থেকেছে তার এক দুঃসম্পর্কের চাচার কাছে। মাসখানেক হবে তার ভাই চাকরি পেয়েছে। তারপর থেকেই শিমুল এখানে থাকে তার বড় ভাই, সাফায়েতের সঙ্গে। অফিস থেকে নাকি থাকার জন্য এই বাড়িটা তাকে দিয়েছে। বাড়িটা ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যকলায় নির্মিত বলে আন্দাজ করে শিমুল। মূল শহর থেকে জায়গাটা একটু দূরে, তবে আর যাই হোক শিমুলের ঘরটা বেশ বড়, তবে আয়তন অনুপাতে সেখানে আসবাবপত্র খুবই কম। থাকার মধ্যে আছে কেবল একটা খাট, একটা টেবিল আর দুটো ছোট্ট বই রাখার তাক। আর পড়ার টেবিলের পাশেই আছে একটা জানালা। সেটার পাশে অবশ্য একটা শেওলাপড়া পুকুর, যেটাকে ডোবা বলইেই বরং ভালো হয়।

সেই জানলাটা দিয়েই ঘরের ভেতর কেমন একটা বাজে গন্ধ প্রবেশ করছে। শিমুল বুঝতে পারল গন্ধটা পঁচা মাছের। অবশ্য বিষয়টা তেমন অস্বাভাবিক লাগল না তার। ডোবা-নালা জাতীয় জায়গা থেকে বিশ্রী পঁচা গন্ধ আসাটাই বরং তারকাছে স্বাভাবিক মনে হল। সে টেবিল থেকে পা দুটো নামিয়ে, আয়েসি ভঙ্গি ছেড়ে, চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিল। জানলা বন্ধ করার সময় অবশ্য সে টের পেল বাইরে ঝড়ো বাতাস এখন আরো তীব্র হয়েছে। কিন্তু শিমুলকে হটাৎ আশ্চর্য করে দিয়ে গন্ধটা কমার ব্যতীরেকে আরো কিছুটা তীব্র হয়ে গেল। এখন ঘরের আনাচে কানাচে কেবল পঁচা মাছের গন্ধ।

অধ্যায় ০২: বিদ্যুৎ নেই। একটু ঝড়ো বাতাস উঠতে না উঠতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। শিমুলের ব্যপারটা খুব অসহ্য লাগে। সাধারণত শহুরে অঞ্চলে এমন পরিস্থিতিতে খেয়াল করলে দু'একটা ঘরে আলো জ্বলতে দেখা যায়; তবে এই জায়গাটা লোকালয় থেকে দূরে, কাজেই বিদ্যুৎ না থকালে দূর-দূরান্তেও কোন প্রাণের চিহ্ন টের পাওয়া যায় না। এমনি দিনেই সন্ধ্যার পর নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর তার উপর আজ আবার উঠেছে ঝড়।

অন্ধকারের মাঝে একপ্রকার হাতরে-হাতরেই রুম থেকে বেরোল শিমুল। পড়তে বসার আগে কয়েল জ্বালিয়ে রেখেছিল সে। কিন্ত কয়েলটা ঘরের ঠিক কোথায় রেখেছে তার মনে আসছে না। কাজেই খুব বুঝে শুনে পা ফেলতে হচ্ছে তাকে। শিমুলের মনে ছিল ড্রয়িং রুমের একটা টেবিলে দেশলাই আর কয়েকটা মোমবাতি রাখা আছে। সেটার খোঁজেই যাচ্ছে সে। শিমুলের ঘর থেকে ড্রয়িং রুমের দূরত্ব খুব বেশি না; মাত্র কয়েকটা পা ফেললেই পৌছে যাওয়া যায় সেখানে, তবে আজ অন্ধকারের মাঝে এটুকু পথ পার করাও কঠিন বলে মনে হচ্ছে তার।

বাইরে পুরোদমে ঝড় হচ্ছে এখন; সেই সাথে আছে মুষলধারে বৃষ্টি; আর বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে হচ্ছে বজ্রপাত। কিছুক্ষণ পরপর চারদিক আলোকিত করে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শিমুল টের পেল গন্ধটা ইতিমধ্যে পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে। ড্রয়িং রুমের একটা জানলার কয়েকটা পাল্লা খোলা, সেগুলোকে বন্ধ করা দরকার। তবে তার আগে দরকার আলো।

বহু খোঁজা-খুঁজির পর অবশেষে মোম জ্বালাতে সক্ষম হয়েছে শিমুল। গন্ধটাও এখন আর নাকে লাগছে না তার। শিমুল এখানে যদিও তার ভাইয়ের সঙ্গে থাকে, কিন্তু আপাতত সে বাসায় একা। তার ভাই, মানে সাফায়েতের বাসায় আসতে মাঝেমধ্যেই একটু দেরি হয়, সেই হিসেবে আজ তো আরো দেরি হওয়ার কথা। বিদ্যুৎটাও নেই, বাসায় এসে কলিং বেলে চাপ দিলে শিমুল শুনতে পাবে না, কাজেই সে ঠিক করল—সাফায়েত আসা পর্যন্ত সে এই ঘরটায় থেকে বই পড়বে।

অধ্যায় ০৩: মোম জ্বলছে। সেটা থেকে আসছে কিছুটা কমলা রঙের আলো—আর সেই আলোতে বই পড়তে খুব ভালো লাগে শিমুলের—তার মতে, একটা প্রাচীন ভাব আছে এতে। কিন্তু আজ তার ব্যাতিক্রম হলো, কিছুতেই সে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না বইয়ের পাতায়। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই সে লক্ষ্য করছে তার অস্বস্তি বোধ হচ্ছে; ঘরটাকেও স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে। তার হাতে এখন আছে একটা গল্পের বই, যার বিষয়বস্তু পরাবাস্তব নিয়ে। সেজন্যই বোধহয় তার এই অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে। ঝড়বৃষ্টির রাতে এসব বই পড়তে নেই, শিমুল বুঝতে পেরেছে তার ভুল হয়েছে। নিজের ভুলটা বুঝতে পারার সঙ্গে-সঙ্গেই বইটা রেখে দিল সে, আর ঠিক করল জানলাটা বন্ধ করে দেবে। কেননা সেখান থেকে বারবার ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির ছাট এসে ঢুকছে ঘরে; বাতাসে মোমটা নিভে যেতে চাইছে সেজন্য।

হটাৎ কেন যেন শিমুলের কাছে ঘরটা ভারী-ভারী লাগছে। তার মনে হচ্ছে কেউ যেন তার দিকে নজর গেঁড়ে বসে আছে। তবে এমনটা মনে করার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ তার কাছে নেই। শিমুল জানলাটা বন্ধ করতে এসেছে। কিন্তু সে এখন আর সেই কাজটা করতে পারছে না। ওদিকে আকাশে ক্রমশ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সেটার সাদা বিকট আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে চারদিক, আর এই বিকট আলোতেই শিমুলের মনে হলো সে জানলার বাইরে কাউকে যেন দেখেছে; যদিও শিমুল ব্যপারটা পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই তার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেটা মিলিয়ে গেল শূন্যে। তবে এক ঝলকেই শিমুলের মনে গেঁথে গেছে ওটার লাল রঙের উজ্জ্বল দুটো চোখ। তবে শিমুল জানে, এই বাড়িটাতে কেউ চাইলেই উঁকি দিতে পারবে না, কেননা এটার অবস্থান মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে, জানলায় যদি উঁকি দিতেও হয়, তবে তাকে কম করে হতে হবে দশ-বারো ফুট কিংবা তারও বেশি উচ্চতা সম্পন্ন, যা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। কাজেই শিমুল আসলে কি দেখেছে তার কোন একক ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। এভাবে জানলায় উঁকি দেওয়ার অভ্যাস আছে বাচ্চাদের; আর উঁকি দেওয়া অবস্থায় কেউ তদের দেখে ফেললেই তারা দৌঁড়ে পালায়। তবে বাচ্চারা যত উৎসুক আর কৌতূহলি হোক না কেন, ঝড়-বৃষ্টির রাতে অবশ্যই কোন অপরিচিত বাড়ির জানলায় ওত পেতে থাকবে না তারা।

জানলাটা বন্ধ করার সময় একটা দমকা হাওয়া এসে নিভিয়ে দিয়েছিল মোমবাতিটাকে। তাই শিমুল অন্ধকারের মাঝেই বসে আছে ঘরের মেঝেতে। বেশিক্ষণ অন্ধকারে থাকলে মানুষের ভয় ও উদ্বেগ বাড়তে থাকে তাই তো শিমুলের মাথা ঘোরাচ্ছে; বুকের ভেতর হৃৎপিন্ডটা জোরে জোরে বাড়ি দিচ্ছে; শরীরের তাপমাত্রাটাও বেড়েছে খানিকটা; যদিও বৃষ্টিটা কিছুটা কমেছে আগের থেকে, তবে এখনও আকশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে; বাড়িটার ডানপাশে একটা লোকশূন্য টিনের ঘর আছে, সেটার চালে পানি পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে এখান থেকে—সবকিছুই যেন আজ পরাবাস্তবের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাকে। নিজেকে শান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে শিমুল—কিছুক্ষণ আগে সে যা দেখেছে, তা কেবলই ছিল তার মনের ভ্রম। এরকম ঝড়-বৃষ্টির রাতে পরাবাস্তব বই পড়লে এমনটাই হয় বলে শিমুল ধারণা করছে।

ঘরের ভেতরে কারো যেন হাঁটার শব্দ শুনতে পেল শিমুল—ভেঁজা আর কাঁদা মাখা স্যান্ডেল পড়ে হাঁটলে যে প্যাঁচপ্যাঁচে শব্দটা হয়, ঠিক সেরকম। শিমুলের বুঝতে আর বাকি রইলো না যে, ঘরে সে ছাড়াও অন্য কেউ আছে, কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব মাথায় আসছে না তার। দরজা-জানলা সবই তো বন্ধ, পেছনে কোন দরজাও নেই যেটা দিয়ে লুকিয়ে কেউ ঘরে ঢুকে পড়বে, আবার আহামরি খুব ধন-সম্পদ যে তাদের আছে তাও না, যে কেউ লুট করতে আসবে তাদের, তাও আবার এমন একটা দিনে। শিমুল লক্ষ্য করল শব্দটা থেমে গেছে, সে বুঝতে পারল ঘরের ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে কিছু একটা তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওটা চোখদুটো উজ্জ্বল লাল রঙের; চোখের অবস্থান বেশ উঁচুতে হওয়ায় উচ্চতাটা বোঝা যাচ্ছে ঠিকঠাকভাবে। বৃষ্টি পড়ায় গরম কিছুটা কমেছে, তবে শিমুলের ক্ষেত্রে ঘটল ভিন্ন কিছু। তারা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঘেমে গেছে; তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে; শরীরে ইতোমধ্যে ১০৩° জ্বর উঠে গেছে। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই…

“কে…কে ওখানে?” বলে উঠল শিমুল।

“আমি।”

“আমিটা কে?” কম্পিত কন্ঠে প্রশ্ন করে শিমুল।

“আমি, জালাল।”

“কে জালাল?”

“আমি আসলে এ বাড়িতে থাকি”, বেশ খানিকটা নীরবতার পর, “বহু বছর হলো এখানেই অবস্থান করছি। তবে বেশ কিছুদিন হয়েছে বাড়িটা থেকে আমি একটু বাইরে গিয়েছিলাম। আসলে ঘুরতেই গিয়েছিলাম। এই ঝড় ঝাপটার কারণে ফিরে আসতে হল।”

শিমুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তার মনে ঘুরঘুর করছে অনেকগুলো প্রশ্ন। সেগুলো ভাবতে ভাবতেই গলাটা সামান্য শুকিয়ে আসছে যেন। আর ঠিক সেই কারণেই কণ্ঠস্বরে কিছুটা কম্পন অনুভব করছে সে। “তার মানে আপনিই এতক্ষণ ধরে হাঁটাহাঁটি করছিলেন?”

“জ্বী।” কিছুক্ষণ নীরবতার পর উত্তর এলো।

শিমুল সেটা শুনে আবার জিজ্ঞেস করল তখন, “আপনি এ বাড়িতে থাকেন—বলতে কি বোঝাতে চাচ্ছেন?”

“আমি এই বাড়িতে থাকি বলতে আলাদা করে কি বোঝাতে চাইবো?”

“না, মনে—”

একটা অদ্ভুত হাসির শব্দ শুনতে পাওয়া গেল তারপর। “আপনি কি আমার উপর কোন ধরনের সন্দেহ করছেন, যে এ বাসাটা আমার কি না?”

“আমি সেরকমটা ঠিক—”

“এখন আপনি ধরেন, একজন রাধুনীর কাজ করেন। আর কাজের স্বার্থে একটা বাসাটাতে আপনি একা থাকেন ভাড়া নিয়ে। নিজের খাবার নিজেই বানিয়ে খান। ভাড়া করে থাকাটা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ না। নিজে রান্না করে খাওয়াটাই বড় বিষয়। এখন আপনাকেই যদি কেউ এসে জিজ্ঞেস করে, আপনার খাবারটা কে বানিয়ে দেয় প্রতিদিন। তখন বিষয়টা কি হাস্যকর হয়ে যাবে না?”

“আচ্ছা।”

“আমার হাসির কারণটা এখন বুঝতে পেরেছেন?”

“হাসি?”

“জ্বী। আমি হাসলাম এই নিয়ে আপনার মনে প্রশ্ন জাগলো না?”

“না।”

“তাহলে তো হয়েই গেল।”

আবারো নীরবতা নেমে এলো। দুই পক্ষের কেউই এখন আর কথা বলছে না। কিন্তু শিমুল বিষয়টাতে মানবিক যুক্তি ঢোকাতে গিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করে বসল, “আপনি…মানে, কতদিন ধরে এখানে থাকেন?”

“অনেকদিন ধরে…”, উত্তর এলো, “আসলে অনেক বছর বললেও ভুল হবে না। কিছুদিন হলো ঘুরতে গিয়েছিলাম বাইরে।”

“বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলেন?”

“জ্বী।”

“সেটা আবার কতদিন ধরে?”

“উম—সংখ্যাটা মন্দ হবে না।”

“তা আপনি কি আজকেই ফিরে এসেছেন?”

“জ্বী।”

“আজকে বলতে…এই মাত্র ফিরে এসেছেন?”

“জ্বী। আসলে আমি সচরাচর জানালা দিয়েই ঘরে ঢুকি। আজকেও তাই করতে যাচ্ছিলাম। তা দেখলাম আপনি জানালাটা মুখের উপর বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই আর ঢুকতে পারলাম না সেখান দিয়ে। বাধ্য হয়ে আপনার ওই রান্না ঘরের ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকতে হয়েছে। তাতে একটু কষ্ট হয়েছে অবশ্য। তবে আমি কিছু মনে করিনি।”

ঠিক এই জায়গাটায় এসে শিমুলের খটকা লাগল। গলাটা কেমন আটকে গেল তার। বুকের কাছে চাপ অনুভব করছে সে। “আমি আসলে দুঃখিত।”

“হুম? দুঃখিত? কিন্তু কেন?” কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল লোকটা।

“আমি বুঝতে পারিনি আপনি এখানে ছিলেন”, বলল শিমুল, “আসলে জানালাটা দিয়ে প্রচুর বাতাস আসছিল তো। সেজন্য মোমের আলোটা নিভে গেছিল। মোমের আলো থাকলে আপনাকে দেখতে পেতাম; জানলাটাও বন্ধ করতাম না। দুঃখিত, আমি খেয়াল করিনি প্রথমে। আলোটা থাকলে খেয়াল করতাম নিশ্চয়ই।”

“না না…ওটা আমিই নিভিয়েছি।” সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো এবার।”

শিমুল প্রশ্ন করল, “মানে?”

লোকটা বলল, “বলছি যে, আলোটা আমিই নিভিয়েছি। আমার আলো সহ্য হয় না। বিশেষত আগুনে আলো; আসলে এতটুকু উষ্ণতাও বড্ড বেশি যন্ত্রণা দেয়।”

শিমুলের সমস্ত শরীর এবার যেন কাঠ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—খুব বড় একটা বিপদে পড়েছে সে। নিজেকে ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে তার পক্ষে। আর সব থেকে বেশি কষ্ট হচ্ছে—স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলা। “আপনি তারমানে বলতে চাচ্ছেন যে, আলোটা নেভানোর পেছনে আপনার হাত ছিল?”

“জ্বী।” হালকা করে উত্তর এলো।

“আপনি কি তাহলে বরাবরই এখানে থাকেন?” প্রশ্ন করল শিমুল।

“না না, ব্যাপারটা ঠিক সেরকমও না। আমার কোন কিছুতে কোন ঠিক ঠিকানা থাকে না। আমি একেক সময় একেক কাজ করি। মাঝেমধ্যে এখানে থাকি, আবার মাঝেমধ্যে এখানে থাকি না। কখনো চলে যাই দূরের কোন এক নদীর প্রান্তে, আবার কখনো গিয়ে গোরস্থানে একটা গাছের ডালে বসে নির্জনতা উপভোগ করি। অবশ্য এই বাসাটা এতো ভালো লাগার অন্যতম কারণও হচ্ছে এই নির্জনতা। আমি অনেকদিন ধরেই এখানে আছি। আমার ভালোই লাগে এখানে থাকতে। যদিও আমি কারোর ক্ষতি-টতি করি না খুব একটা। যদি না আমাকে কেউ খুব বিরক্ত করে।”

আর ঠিক তখনই শিমুলের মেরুদন্ড বেয়ে একটা খুব শীতল স্রোত বয়ে যায়। কোনভাবেই বুঝতে সে বুঝতে পারছে না যে—এখন কি করা উচিত তার। অথচ তা সত্ত্বেও, সে নিজেকে পুরো দমে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। “আমাকে মাফ করবেন জালাল সাহেব। আসলে আমার একটা ভুল হয়ে গেছে।”

“ভুল?”, অত্যন্ত কৌতুকোলি কন্ঠে, “আরে ভুল কিসের?”

“না মানে…ব্যাপারটা হচ্ছে যে, আমি জানতাম না যে আপনি এখানে থাকেন”, কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠে শিমুল, “আসলে আমি আর আমার ভাই সাফায়েত কিছুদিন হলো এখানে এসেছি। সেও জানতো না আপনি এখানে থাকেন। আমরা যদি জানতাম তাহলে আপনাকে বিরক্ত করতাম না কখনো। তিনি অবশ্য বাইরে গেছেন এখন। বাসায় আসলে আমি তাকে বলে দেবো—অন্য জায়গায় যাবার বিষয়টা নিয়ে ভাবতে। আপনার কথা কিছুই বলবো না। তবে এই বাসাটা আমরা ফাঁকা করে দেবো খুব তাড়াতাড়ি।”

কিছু সেকেন্ড নীরবতার পর আবারও একটা হাসি ভেসে আসলো। “আরে এগুলো কি যে বলেন আপনি? বাসা ফাকা করতে হবে কেন? বাসা ফাকা করতে হবে না। আমি তো আগেই বলেছি। আমি কারোর ক্ষতি করি না বিশেষ একটা। আপনারা এখানেই থাকবেন। আমিও এখানে থাকবো। আমি এই ঘরেতেই থাকি। তবে আপনার কোন অসুবিধা নেই। আজকে অবশ্য আপনি এই ঘরে থাকেন। আমি না হয় রান্না ঘরে রাতটা কাটিয়ে দেবো। কেমন?”

“জ…জ্বী…” কিছুটা জোর করেই উচ্চারণ করল শিমুল।

“আরেকটা কথা”, উত্তর এলো সামনে থেকে, “আমি এরপর থেকে এই ঘরে থাকবো। আমার থাকার জায়গা হবে ওই পর্দার পেছনে। ওই জায়গাটা একটু বেশিই শীতল। আশা করি আপনার তাতে কোন অসুবিধা হবে না?”

“জ্বী না, অবশ্যই না। অসুবিধা কিসের? আপনি আপনার সুবিধামত থাকবেন।”

“বেশ বেশ। তাহলে তো আরো ভালো হয়। আসলে আমি এখানে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। সবারই স্বাচ্ছন্দের একটা বিষয় থাকে। আপনি যদি বিরক্ত না হন তাহলে কয়েকটা কথা বলে রাখি। এই কাজগুলো আপনি আমার জন্য করে রাখবেন।”

“কী কাজ?” কিছুটা ভিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে শিমুল।

তবে এবারও স্বাভাবিক কন্ঠেই উত্তর আসে, “আহামরি কিছু না। আমার জন্য আপাতত তিনটা কাজ করলেই চলবে।”

“কী কাজ?”

“খুবই সাধারণ কাজ। প্রথমত, কখনোই গভীর রাতে আমার এই ঘরে আসার চেষ্টা করবেন না। আমি এখানে তখন কিছু ব্যক্তিগত কাজ করব। আমি চাইনা আমাকে তখন কেউ বিরক্ত করুক। আর দ্বিতীয়ত, ওই যে পর্দা টা দেখছেন, ওইখানটা একটু পরিষ্কার করে দেবেন। আমি না থাকায় ওই জায়গাটা নোংরা হয়ে গেছে। প্রচন্ড মশার উপদ্রক। তার উপর মাকড়সার জাল আর ময়লা জমে আছে খুব। আমার থাকতে কিছুটা অসুবিধা হবে। আজকের রাতটা আমি তো রান্না করে কাটাচ্ছি। আপনি আগামীকালের মধ্যে ওইটা পরিষ্কার করে দিয়েন। কেমন?”

“জ্বী…অবশ্যই।”

“আর তৃতীয় কাজটা হল, আমার মাঝে মধ্যে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানোর বাতিক কাছে। সেজন্য কখনো যদি আমাকে আপনার দরজার সামনে কিংবা অন্য কোথাও দেখতে পান, তাহলে অনুগ্রহ করে ভয় পাবেন না। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কেমন?”

“জ্বী।”

“আশা করি আপনার এখানে কোন অসুবিধা হবে না?”

“জ্বী না।”

আর ঠিক এভাবেই আরো কয়েক মিনিট নীরবতা নেমে এলো। শিমুল এখনো কাঠের মত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে কোন চিন্তা কাজ করছে না। কোন ধরনের যুক্তি দাঁড় করাতেও পারছে না। সে আপাতত মুক্তি চাইছে এগুলো থেকে।

“আচ্ছা একটা কথা বলুন তো”, আবারো প্রশ্ন হল সামনে থেকে।

“কী প্রশ্ন?” বলল শিমুল।

“এই যে আমি আপনার সামনে তিনটা শর্ত রাখলাম, আপনি কি তাতে বিরক্ত হয়েছেন?”

“না না, বিরক্ত কেন হব? এটা তো আপনারই বাড়ি। আপনি নিজের মতো থাকবেন। তাতে অসুবিধা কোথায়?”

“তাও ঠিক। তবে আমি তো কাউকে বিরক্ত করি না। আশা করি আপনি বিরক্ত হবেন না। আপনি চাইলে আমার সঙ্গে গভীর রাতে নদীর ধারে আসতে পারেন। আপনার ভাইকেও নিয়ে আসতে পারেন। আমরা তিনজন সেই ঘরের মধ্যে নীরবতা অনুভব করব। অথবা আপনাদের দুজনের সঙ্গে রাতভর আড্ডা দেবো। যদিও আমি কখনো কারো সঙ্গে খুব একটা আড্ডা দেই না। একটা সময় ছিল যখন আমি প্রচুর আড্ডা দিতাম। কিন্তু আপনাদের মত মানুষেরা এখন আমাকে দেখলেই পালিয়ে যায়। কেন যায় আমি জানিনা।”

“আচ্ছা।”

“অবশ্য আপনাদের কোন ভয় নাই, এবং আমার বিশ্বাস আমি আপনাদের সঙ্গে একটা খুব সুন্দর সময় কাটাতে পারব।”

“জ্বী জ্বী।”

আর বেশি কিছু বুঝে ওঠার আগেই জালাল সাহেব মিলিয়ে গেলেন শূন্যে। শিমুল অবাক হয়ে চোখদুটো বড়-বড় করে কেবল তাকিয়ে রইল সেদিকে। ওদিকে দরজায় টোকা পড়েছে; খুব সম্ভবত শিমুলের ভাই এসেছে। কিন্তু কোনভাবেই শিমুল নড়তে পারছে না জায়গা থেকে, শরীরটা যেন ছেড়ে দিয়েছে তার; আর কেবল ডাক আসছে দরজার ওপাশ থেকে, “শিমুল… এই শিমুল এই।”

Comments

    Please login to post comment. Login