🌧️ টোকাই
পর্ব–১
যার কোনো ঠিকানা ছিল না
শহরের মানুষ তাকে নাম ধরে ডাকত না।
কেউ বলত—
“এই টোকাই!”
কেউ বলত—
“ওই ছেলেটা, সরে যা!”
কেউ আবার নাক সিটকে বলত—
— “এসব ছেলেদের জন্যই শহরটা নোংরা হয়ে যাচ্ছে।”
ছেলেটা কিছু বলত না।
শুধু মাথা নিচু করে হাঁটত।
তার বয়স খুব বেশি হলে বারো কি তেরো।
গায়ে ময়লা হয়ে যাওয়া একটা টি-শার্ট।
হাফপ্যান্টটা এত পুরোনো যে কোথাও কোথাও সেলাই উঠে গেছে।
পায়ে জুতা নেই।
হাতে একটা বড় বস্তা।
আর কাঁধে এমন একটা বাঁশের লাঠি, যেটার সাহায্যে সে রাস্তায় পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, কাগজ, কার্টন আর লোহার টুকরো তুলে বস্তায় ভরত।
মানুষ তাকে চিনত একটাই নামে—
টোকাই।
কিন্তু তার একটা আসল নামও ছিল।
সজীব।
এই নামটা তাকে দিয়েছিলেন তার মা।
১
সজীবের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল একটা ছোট্ট নীল রঙের কাপড়ের ব্যাগ।
ব্যাগটার ভেতরে ছিল তিনটা জিনিস।
একটা পুরোনো ছবি।
একটা ভাঙা চিরুনি।
আর একটা ছোট্ট কাগজ।
কাগজটায় কাঁপা হাতে লেখা—
“সজীব, মানুষ হবি। গরিব হবি, তবু খারাপ মানুষ হবি না।”
এটা তার মায়ের লেখা।
সজীব পড়তে খুব একটা জানত না।
তবুও সে কাগজটা প্রতিদিন বের করে দেখত।
অক্ষরগুলোর মানে পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও সে জানত—
এই কাগজের ভেতর তার মায়ের ভালোবাসা আছে।
আর তাই সে এটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস মনে করত।
২
সজীব থাকত শহরের এক পুরোনো রেললাইনের পাশে, টিন আর পলিথিন দিয়ে বানানো একটা ছোট্ট ঘরে।
ঘর বললেও আসলে সেটা ছিল চারটা বাঁশের খুঁটি, ওপরে ছেঁড়া ত্রিপল আর পাশে কিছু টিন।
বৃষ্টি হলে পানি পড়ত।
শীতকালে বাতাস ঢুকত।
গরমে ভেতরে থাকা কঠিন হয়ে যেত।
তবুও সজীবের কাছে সেটাই ছিল তার বাড়ি।
কারণ সেখানে তার মায়ের স্মৃতি ছিল।
মা মারা যাওয়ার পর থেকে সে একাই থাকে।
কখনো পাশের দোকানের সামনে ঘুমায়।
কখনো রেললাইনের ধারে।
কখনো কোনো মসজিদের বারান্দায়।
কেউ তাড়িয়ে দিলে অন্য জায়গায় চলে যায়।
তার কোনো বিছানা নেই।
কোনো আলমারি নেই।
কোনো পড়ার টেবিল নেই।
শুধু একটা পুরোনো বস্তা আছে।
আর একটা নীল কাপড়ের ব্যাগ।
৩
সজীব প্রতিদিন ভোরে উঠে পড়ত।
শহরের মানুষ তখনও ঘুমিয়ে।
রাস্তা তখন প্রায় ফাঁকা।
সে বস্তাটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত।
প্রথমে বাজার।
তারপর বাসস্ট্যান্ড।
তারপর বড় বড় দোকানের পেছনের গলি।
সেখানে পড়ে থাকা বোতল আর কার্টন সংগ্রহ করত।
একদিন এক দোকানদার তাকে বলল,
— “এই! এখানে আর আসবি না।”
সজীব থেমে গেল।
— “কেন চাচা?”
— “তুই এখানে ময়লা করিস।”
সজীব নিচের দিকে তাকাল।
— “আমি তো ময়লা তুলতে আসি।”
দোকানদার একটু থেমে গেল।
কিন্তু কিছু বলল না।
সজীব বস্তাটা কাঁধে তুলে চলে গেল।
তার মুখে কোনো রাগ ছিল না।
কারণ সে ছোটবেলা থেকেই শিখেছে—
গরিব মানুষের রাগ দেখানোর অধিকারও অনেক সময় মানুষ মানতে চায় না।
৪
দুপুরে সজীব একটা হোটেলের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকত।
হোটেলের বাবুর্চি তাকে মাঝে মাঝে বেঁচে যাওয়া ভাত দিত।
সেদিনও একটা প্লেটে ভাত দিল।
— “নে, খেয়ে নে।”
সজীব প্লেটটা হাতে নিয়ে বলল,
— “চাচা, আজ একটু বেশি দেবেন?”
— “কেন?”
সজীব হেসে বলল,
— “একটু রেখে দেব।”
— “কেন? রাতে খাবি?”
সজীব মাথা নাড়ল।
— “না।”
— “তাহলে?”
সজীব রাস্তার ওপারে তাকাল।
সেখানে একটা ছোট্ট মেয়ে বসে ছিল।
তার বয়স হয়তো পাঁচ বছর।
মেয়েটা সারাদিন ধরে একটা ভাঙা পুতুল নিয়ে বসে ছিল।
সজীব বলল,
— “ও খায়নি।”
বাবুর্চি মেয়েটার দিকে তাকাল।
তারপর সজীবের প্লেটে আরও কিছু ভাত দিল।
সজীব নিজের ভাগ থেকে অর্ধেক মেয়েটাকে দিয়ে দিল।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করল,
— “ভাইয়া, তুমি খাবে না?”
সজীব হেসে বলল,
— “আমি তো খেয়েছি।”
আসলে সে তখনও এক লোকমাও মুখে দেয়নি।
৫
রাতে সে যখন নিজের জায়গায় ফিরে এল, পেটটা খুব ক্ষুধার্ত।
বস্তাটা পাশে রেখে নীল ব্যাগটা বের করল।
মায়ের ছবিটা হাতে নিল।
ছবিতে মা হাসছেন।
সজীব ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
— “মা, আজকে আমি একটা মেয়েকে ভাত খাইয়েছি।”
কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলল,
— “তুমি থাকলে খুশি হতে?”
অন্ধকার ঘরে কোনো উত্তর এল না।
তবুও সজীব হেসে ফেলল।
— “আমি জানি, তুমি খুশি হতে।”
তারপর মায়ের লেখা কাগজটা বের করল।
কাগজটা অনেক পুরোনো হয়ে গেছে।
বৃষ্টিতে ভিজেছে।
কোণগুলো ছিঁড়ে গেছে।
তবুও সজীব যত্ন করে সেটা ভাঁজ করে রাখে।
সে আঙুল দিয়ে লেখাগুলো ছুঁয়ে বলল,
— “আমি খারাপ মানুষ হইনি মা।”
৬
পরদিন সকালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
সজীব একটা বড় আবর্জনার স্তূপের পাশে প্লাস্টিক তুলছিল।
হঠাৎ তার লাঠি একটা পুরোনো ব্যাগে আটকে গেল।
ব্যাগটা বেশ ভারী।
সে চারপাশে তাকাল।
তারপর ব্যাগটা তুলে খুলল।
ভেতরে ছিল অনেকগুলো কাগজ।
আর ছিল কিছু টাকা।
সজীব টাকা দেখে অবাক হয়ে গেল।
এত টাকা সে জীবনে একসঙ্গে দেখেনি।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর একটা একটা করে নোট গুনল।
তারপর আবার ব্যাগের ভেতর রেখে দিল।
নিজের কাছে রাখল না।
কারণ তার মায়ের কথাটা মনে পড়ল—
“গরিব হবি, তবু খারাপ মানুষ হবি না।”
সজীব ব্যাগটা নিয়ে কাছের পুলিশ বক্সে গেল।
একজন পুলিশ তাকে দেখে বলল,
— “কী হয়েছে?”
সজীব ব্যাগটা এগিয়ে দিল।
— “এটা পেয়েছি।”
পুলিশ ব্যাগ খুলে অবাক।
— “তুই এটা নিয়ে পালাসনি?”
সজীব মাথা নাড়ল।
— “না।”
— “কেন?”
সজীব খুব সহজভাবে বলল,
— “ওটা আমার না।”
পুলিশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
— “তোর নাম কী?”
সজীব বলল,
— “সজীব।”
— “বাড়ি কোথায়?”
সজীব একটু থেমে বলল,
— “আমার বাড়ি নেই।”
পুলিশ আবার জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা-মা?”
সজীব নিচের দিকে তাকাল।
— “মা নেই।”
— “বাবা?”
সজীব চুপ।
অনেকক্ষণ পর বলল,
— “জানি না।”
৭
সেদিন পুলিশ বক্সে একজন মধ্যবয়সী লোক এলেন।
ব্যাগটা তাঁর ছিল।
তিনি ব্যাগ হাতে নিয়ে সজীবের দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন,
— “বাবা, তুই এটা পেয়েও আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিস?”
সজীব মাথা নেড়ে বলল,
— “জি।”
লোকটি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করলেন।
— “নে।”
সজীব পিছিয়ে গেল।
— “না।”
— “কেন?”
— “আমার না।”
লোকটি অবাক হয়ে তাকালেন।
— “তুই টাকা নেবি না?”
সজীব মাথা নাড়ল।
— “আমার মা বলছে, অন্যের জিনিস নিতে নেই।”
লোকটির চোখে পানি চলে এল।
তিনি সজীবের মাথায় হাত রাখলেন।
— “তোর মা তোকে ভালো মানুষ বানিয়ে গেছে।”
সজীব কিছু বলল না।
শুধু মায়ের ছবিটা বের করে বুকের কাছে চেপে ধরল।
৮
সেই দিন থেকে লোকটি প্রায়ই সজীবকে খুঁজতেন।
তার নাম ছিল আরিফ সাহেব।
তিনি একটি ছোট ব্যবসা করতেন।
একদিন সজীবকে বললেন,
— “তুই কি পড়তে চাস?”
সজীব থমকে গেল।
— “আমি?”
— “হ্যাঁ।”
— “আমার মতো ছেলেকে কে পড়াবে?”
আরিফ সাহেব বললেন,
— “আমি পড়াব।”
সজীবের চোখ বড় হয়ে গেল।
— “কিন্তু আমি তো টোকাই।”
আরিফ সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
— “টোকাই হওয়া কোনো পরিচয় না।”
সজীব চুপ করে রইল।
আরিফ সাহেব বললেন,
— “তোর নাম কী?”
— “সজীব।”
— “তাহলে তোকে সজীব বলেই ডাকব।”
সেদিন অনেকদিন পর সজীব নিজের নামটা শুনে বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি পেল।
কেউ তাকে “এই টোকাই” বলেনি।
কেউ তাকে তাড়িয়ে দেয়নি।
কেউ তাকে ছোট করেনি।
কেউ শুধু বলেছে—
“সজীব।”
৯
কিন্তু গল্পটা এত সহজ ছিল না।
কারণ শহরের সবাই আরিফ সাহেবের মতো ছিল না।
কয়েকদিন পর সজীব যখন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, কয়েকজন ছেলে তাকে দেখে হাসতে লাগল।
— “ওই দেখ, টোকাই স্কুলে পড়তে এসেছে!”
আরেকজন বলল,
— “তুই কি পড়তে পারবি?”
সজীব মাথা নিচু করল।
তার হাত শক্ত হয়ে গেল।
সে চলে যেতে চাইছিল।
ঠিক তখন একজন শিক্ষক বাইরে এসে বললেন,
— “কী হয়েছে?”
ছেলেরা চুপ হয়ে গেল।
শিক্ষক সজীবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুমি কি পড়তে চাও?”
সজীব আস্তে করে বলল,
— “জি।”
— “তাহলে এসো।”
সজীব স্কুলের ভেতরে ঢুকল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার পিছনে তাকাল।
তার পুরোনো বস্তাটা বাইরে পড়ে আছে।
সজীব দৌড়ে গিয়ে বস্তাটা তুলে একটা নিরাপদ জায়গায় রাখল।
তারপর স্কুলে ঢুকল।
সেদিন রাতে সজীব মায়ের ছবির সামনে বসে বলল,
— “মা, আজ আমি স্কুলে গেছি।”
তার চোখে পানি।
— “তুমি বলেছিলে না, মানুষ হতে?”
সে মায়ের ছবিটা বুকে চেপে ধরল।
— “আমি চেষ্টা করব মা।”
কিন্তু সে জানত না—
তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তখনও শুরুই হয়নি।
কারণ কয়েকদিন পর আরিফ সাহেব এমন একটি খবর জানতে পারবেন, যা সজীবের পুরো অতীতকে বদলে দেবে।
আর সেই পুরোনো নীল ব্যাগের ভেতরে থাকা একটি কাগজ খুললেই সামনে আসবে এমন এক সত্য—
যে সত্য সজীবের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে:
“তার বাবা আসলে কে?”
চলবে...