ক্ষুধার কান্না
| “একটু খাবার কি এত কঠিন?”
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
শহরের বড় রাস্তার দুপাশের দোকানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। ব্যস্ত রাস্তাটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছিল।
কিন্তু একটা ছোট্ট কুকুর তখনও রাস্তার পাশে বসে ছিল।
তার নাম কেউ জানত না।
লোকেরা তাকে শুধু বলত—
“ওই কুকুরটা।”
কেউ আদর করে ডাকত না।
কেউ নাম দেয়নি।
কেউ জানত না, তারও একটা গল্প আছে।
কুকুরটা রাস্তার পাশে একটা বন্ধ চায়ের দোকানের সামনে বসে ছিল। চোখ দুটো বারবার দোকানের ভেতরের দিকে যাচ্ছিল।
সন্ধ্যার পর থেকে সে কিছু খায়নি।
সকালেও সামান্য কিছু পেয়েছিল।
দুপুরে একটা হোটেলের পেছনে গিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু সেদিন খাবারের উচ্ছিষ্টও কম ছিল।
ক্ষুধায় তার পেটটা মোচড় দিচ্ছিল।
তবুও সে রাস্তা ছেড়ে যাচ্ছিল না।
কারণ ওই দোকানের মালিক প্রতিদিন রাতে দোকান বন্ধ করার আগে একটা রুটি ফেলে দিত।
আজও হয়তো দেবে।
কুকুরটা লেজ নাড়তে নাড়তে অপেক্ষা করছিল।
কিছুক্ষণ পর দোকানের মালিক বের হলো।
কুকুরটা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
চোখে যেন একটু আলো জ্বলে উঠল।
লোকটা হাতে থাকা একটা পলিথিনের ব্যাগ ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
কুকুরটা ছুটে গেল।
কিন্তু লোকটা বলল,
—“এই! দূর হ!”
কুকুরটা থেমে গেল।
লোকটা একটা পাথর তুলে ভয় দেখাল।
কুকুরটা কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
তারপরও চোখ সরাল না।
লোকটা চলে গেল।
কুকুরটা ধীরে ধীরে ডাস্টবিনের কাছে গেল।
পলিথিনের ভেতর খাবারের গন্ধ ছিল।
সে দাঁত দিয়ে পলিথিনটা টানল।
ভেতরে ছিল কয়েক টুকরো শুকনো রুটি।
কুকুরটা রুটির একটা টুকরো মুখে নিতেই—
পেছন থেকে একটা ছেলে এসে লাথি মেরে তাকে সরিয়ে দিল।
রুটিটা রাস্তায় পড়ে গেল।
কুকুরটা ভয় পেয়ে দৌড়ে দূরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এল।
রুটিটা তখনও পড়ে ছিল।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে রুটিটা মুখে নিল।
তারপর রাস্তার এক কোণে গিয়ে বসে পড়ল।
রুটিটা এত শক্ত ছিল যে চিবাতে কষ্ট হচ্ছিল।
তবুও সে খাচ্ছিল।
কারণ ক্ষুধা শক্ত রুটিকেও নরম মনে করায়।
পরদিন সকাল।
শহর আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল।
মানুষ অফিসে যাচ্ছে।
কেউ স্কুলে যাচ্ছে।
কেউ রিকশায়।
কেউ গাড়িতে।
কুকুরটা ফুটপাতে বসে ছিল।
তার চোখ রাস্তার ওপারে।
সেখানে একটা ছোট ছেলে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে বিস্কুট খেত।
ছেলেটার নাম ছিল রাফি।
রাফি প্রতিদিন তার বিস্কুটের একটা অংশ কুকুরটাকে দিত।
আজও রাফি স্কুলের পোশাক পরে বাবার হাত ধরে রাস্তার পাশে দাঁড়াল।
কুকুরটা তাকে দেখেই লেজ নাড়তে শুরু করল।
রাফি হেসে বলল,
—“আব্বু! ওই যে আমার কুকুরটা!”
তার বাবা বললেন,
—“ও তোমার কুকুর না। রাস্তার কুকুর।”
রাফি মুচকি হেসে বলল,
—“তবুও ও আমার বন্ধু।”
রাফি ব্যাগ থেকে একটা বিস্কুট বের করল।
অর্ধেক নিজে খেল।
বাকি অর্ধেক কুকুরটার দিকে বাড়িয়ে দিল।
কুকুরটা প্রথমে একটু ভয় পেল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিস্কুটটা মুখে নিল।
রাফি হাসল।
—“কাল আবার দেব।”
কুকুরটা যেন কথাটা বুঝল।
লেজটা আরও জোরে নড়তে লাগল।
কিন্তু সেদিনই ঘটল একটা ঘটনা।
দুপুরের দিকে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল।
রাস্তা পানিতে ভেসে গেল।
কুকুরটা একটা দোকানের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিল।
সারাদিন তার পেটে কিছু পড়েনি।
বৃষ্টি থামার পর সে খাবারের সন্ধানে বের হলো।
একটা হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ভেতর থেকে খাবারের গন্ধ আসছিল।
সে দরজার কাছে গিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
একজন কর্মচারী তাকে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
—“যা! যা এখান থেকে!”
কুকুরটা উঠল না।
লোকটা একটা ঝাড়ু নিয়ে এগিয়ে এল।
কুকুরটা ভয় পেয়ে দৌড়ে রাস্তার দিকে চলে গেল।
রাস্তা পার হওয়ার সময়—
একটা গাড়ি দ্রুত তার পাশ দিয়ে চলে গেল।
কুকুরটা ছিটকে ফুটপাতে পড়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে নড়ল না।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
সে আহত হয়েছিল।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল ক্ষুধায়।
সে আবার হাঁটতে শুরু করল।
সন্ধ্যা হয়ে গেল।
রাফি আজ স্কুল থেকে ফেরেনি।
কুকুরটা রাফিদের বাড়ির সামনে গিয়ে বসে থাকল।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
তিন ঘণ্টা।
কুকুরটা অপেক্ষা করতেই থাকল।
রাত আটটার দিকে একটা গাড়ি এসে থামল।
রাফির বাবা গাড়ি থেকে নামলেন।
কুকুরটা ছুটে গেল তার কাছে।
তারপর থেমে গেল।
রাফি নেই।
কুকুরটা গাড়ির ভেতরে তাকাল।
খালি।
রাফি কোথায়?
রাফির বাবা দরজা বন্ধ করতে করতে কুকুরটার দিকে তাকালেন।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কুকুরটা যেন বুঝতে পারল—
আজও রাফি আসবে না।
সে বাড়ির দরজার সামনে বসে পড়ল।
রাত বাড়তে লাগল।
একসময় বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এল।
কুকুরটা মাথা তুলে তাকাল।
মানুষগুলো কাঁদছে।
কিন্তু কেন?
সে জানত না।
সে শুধু দরজার সামনে বসে রইল।
রাত প্রায় বারোটা।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল।
রাফির বাবা বাইরে এলেন।
তার হাতে একটা বিস্কুটের প্যাকেট।
তিনি কুকুরটার সামনে প্যাকেটটা রেখে নিচু হয়ে বসে পড়লেন।
চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
—“তুই ওর জন্য অপেক্ষা করছিস, তাই না?”
কুকুরটা চুপ করে তাকিয়ে রইল।
লোকটা কাঁপা গলায় বললেন,
—“রাফি আর আসবে না বাবা…”
কুকুরটা কিছুই বুঝল না।
সে শুধু বিস্কুটের প্যাকেটটার দিকে তাকাল।
লোকটা প্যাকেট খুলে কয়েকটা বিস্কুট তার সামনে রাখলেন।
কুকুরটা খেতে শুরু করল।
অনেকদিন পর যেন পেট ভরে খাবার পেল।
কিন্তু খেতে খেতে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
যেন রাফি এখনই বের হয়ে এসে বলবে—
“আমার বন্ধু, তুই আবার সব খেয়ে ফেললি?”
কুকুরটা খাওয়া থামিয়ে দিল।
দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর একটা ছোট্ট শব্দ করল।
“কুঁই… কুঁই…”
রাফির বাবা মুখ ফিরিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
পরদিন সকালেও কুকুরটা সেই দরজার সামনে ছিল।
তারপরও পরদিন।
তারপরও।
প্রতিদিন রাফির বাবা তাকে খাবার দিতেন।
কুকুরটা খাবার খেত।
কিন্তু একটা বিস্কুট সবসময় আলাদা করে রেখে দিত।
যেন রাফি এলে সেটা তাকে দেবে।
একদিন রাফির বাবা বললেন,
—“তুই এখনও ওকে ভুলিসনি?”
কুকুরটা চুপ করে তাকিয়ে রইল।
মানুষ হয়তো অনেক কিছু ভুলে যায়।
কিন্তু একটা ক্ষুধার্ত প্রাণীও ভালোবাসা ভুলে না।
কয়েক মাস পর।
এক শীতের রাতে কুকুরটা আবার সেই পুরোনো চায়ের দোকানের সামনে বসে ছিল।
তার শরীর দুর্বল হয়ে গেছে।
চোখের নিচে ক্লান্তি।
পেট খালি।
সেদিন রাফির বাবা কাজে বাইরে ছিলেন।
কেউ তাকে খাবার দেয়নি।
কুকুরটা অনেকক্ষণ ডাস্টবিনের পাশে খুঁজল।
কিছু পেল না।
শেষে ফুটপাতের এক কোণে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
ঠান্ডায় তার শরীর কাঁপছিল।
ঠিক তখন একটা ছোট মেয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
মেয়েটার হাতে একটা রুটি।
সে রুটিটা কুকুরটার সামনে রেখে বলল,
—“তুমি ক্ষুধার্ত?”
কুকুরটা মাথা তুলল।
মেয়েটা বলল,
—“আমার আম্মু বলে, ক্ষুধার্ত কাউকে খালি পেটে ঘুমাতে দিতে নেই।”
কুকুরটা ধীরে ধীরে রুটিটা খেল।
মেয়েটা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
সেই মুহূর্তে কুকুরটার চোখ থেকে একটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল,
—“তুমি কাঁদছ?”
কুকুরটা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু মেয়েটার হাতের দিকে মাথা ঠেকিয়ে রইল।
কারণ সে জানত না মানুষকে কীভাবে বলতে হয়—
“আমি শুধু খাবারের জন্য কাঁদি না।”
“আমি কাঁদি যখন কেউ আমাকে তাড়িয়ে দেয়।”
“আমি কাঁদি যখন সারাদিন না খেয়ে থাকি।”
“আমি কাঁদি যখন সবাই আমাকে ‘রাস্তার কুকুর’ বলে, কিন্তু কেউ একবারও জিজ্ঞেস করে না—আমি কোথা থেকে এসেছি।”
আর সবচেয়ে বেশি—
“আমি কাঁদি, কারণ যে ছেলেটা আমাকে প্রতিদিন একটা বিস্কুট দিত… সে আর কোনোদিন ফিরবে না।”
সেদিন রাতেও কুকুরটা মেয়েটার দেওয়া রুটির অর্ধেক খেল।
বাকি অর্ধেক পাশে রেখে দিল।
অভ্যাসটা সে ছাড়তে পারেনি।
হয়তো তার মনে হয়েছিল—
কেউ একজন আসবে।
হয়তো রাফি।
হয়তো অন্য কোনো ক্ষুধার্ত প্রাণী।
অথবা হয়তো…
কেউ একজন, যে শুধু একবার তাকে বলবে—
“ভয় পেয়ো না। তুমি একা নও।”
শহরের হাজার হাজার আলো জ্বলছিল।
মানুষেরা নিজেদের ঘরে ফিরে যাচ্ছিল।
আর ফুটপাতের অন্ধকারে একটা ছোট কুকুর চুপচাপ শুয়ে ছিল।
তার সামনে অর্ধেক রুটি।
চোখে পানি।
আর বুকের ভেতর—
একটা ছোট্ট আশা।
হয়তো আগামীকাল কেউ তাকে আবার খাবার দেবে।
হয়তো আগামীকাল কেউ তাকে তাড়াবে না।
হয়তো আগামীকাল… কেউ তাকে একটা নাম দেবে।
আর সেই রাতের নীরবতায় কুকুরটার ক্ষীণ কান্না যেন শহরের দেয়ালে দেয়ালে ফিরে ফিরে বাজছিল—
“একটু খাবার… আর একটু ভালোবাসা… এতটুকুও কি আমার প্রাপ্য নয়?”
সমাপ্ত।