আত্মাদের ট্রেন
পর্ব–২: শেষ স্টেশন
— শেষ পর্ব —
ট্রেনটা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে।
জানালার বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না।
না শহরের আলো।
না কোনো বাড়ি।
না কোনো রাস্তা।
শুধু কালো অন্ধকার।
আর মাঝে মাঝে—
টিং...
টিং...
রিকশার ঘণ্টার মতো শব্দ।
কিন্তু এটা তো ট্রেন।
তাহলে ঘণ্টার শব্দ আসছে কোথা থেকে?
আরিয়ান সিট নম্বর ১৭-তে বসে আছে।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা এখনও তার দিকে তাকিয়ে।
কেউ কথা বলছে না।
কেউ নড়ছে না।
শুধু ছোট ছেলেটা মাঝে মাঝে জানালার দিকে তাকাচ্ছে।
আরিয়ানের মাথার ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরছে।
১৭ বছর আগে সে এখানে এসেছিল কেন?
তার বাবা কেন এই ট্রেনে উঠেছিলেন?
আর সেই রাতে কী হয়েছিল?
সবচেয়ে বড় কথা—
এই ট্রেনটা আসলে কোথায় যাচ্ছে?
হঠাৎ ট্রেনের স্পিকার থেকে একটা ভাঙা শব্দ ভেসে এল।
“পরবর্তী স্টেশন...”
শব্দটা থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
“যারা নামতে চান, তারা প্রস্তুত হোন।”
আরিয়ানের বুক ধক করে উঠল।
সে উঠে দাঁড়াল।
“কোন স্টেশন?”
কেউ উত্তর দিল না।
সে কন্ডাক্টরের কাছে গেল।
“পরের স্টেশন কোথায়?”
কন্ডাক্টর তার দিকে তাকাল।
“আপনি নামবেন?”
“হ্যাঁ!”
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
কন্ডাক্টর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন।”
“কী?”
“দরজা খোলার পর বাইরে যে মানুষটাকে প্রথম দেখবেন...”
সে একটু থামল।
“তার সঙ্গে যাবেন না।”
আরিয়ান অবাক।
“কেন?”
কন্ডাক্টর উত্তর দিল না।
শুধু বলল—
“কারণ সে আপনাকে আপনার সবচেয়ে প্রিয় জায়গায় নিয়ে যাবে।”
“তাতে সমস্যা কী?”
কন্ডাক্টর খুব ধীরে বলল—
“সেখানে আপনি আর ফিরতে চাইবেন না।”
ট্রেনের গতি কমতে শুরু করল।
চাকার শব্দ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে গেল।
তারপর ট্রেন থামল।
ধাম।
দরজা খুলে গেল।
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।
একটা স্টেশন।
কিন্তু সেটা কোনো সাধারণ স্টেশন নয়।
প্ল্যাটফর্মের ওপর কোনো আলো নেই।
শুধু দূরে একটা লাল বাতি জ্বলছে।
স্টেশনের নামের বোর্ডে লেখা—
“ফিরে যাওয়ার স্টেশন”
আরিয়ানের গা শিউরে উঠল।
সে দরজার কাছে গেল।
প্ল্যাটফর্মে পা রাখার আগেই—
একটা কণ্ঠ শুনল।
“আরিয়ান।”
সে থেমে গেল।
কণ্ঠটা খুব পরিচিত।
তার মায়ের কণ্ঠ।
“বাবা...”
আরিয়ান দরজার বাইরে তাকাল।
প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ মাথায় একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।
মুখটা অন্ধকারে ঢাকা।
কিন্তু কণ্ঠ—
তার মায়ের মতোই।
“এদিকে আয়।”
আরিয়ানের চোখে পানি এসে গেল।
তার মা তো জীবিত।
তাহলে—
এটা কে?
মহিলাটা আবার বলল,
“তুই আমাকে চিনতে পারছিস না?”
আরিয়ান এক পা এগোল।
ঠিক তখন কন্ডাক্টর চিৎকার করে বলল—
“থামুন!”
আরিয়ান থেমে গেল।
মহিলাটা হঠাৎ মাথা কাত করল।
তারপর বলল,
“ওর কথা শুনিস না।”
কন্ডাক্টর দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করল।
কিন্তু মহিলা হঠাৎ প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
আরিয়ান এবার তার মুখটা দেখতে পেল।
মুখটা তার মায়ের নয়।
একজন অচেনা মহিলার মুখ।
সে হাসছে।
“তুমি এখনও আমাকে চিনতে পারছ না?”
আরিয়ান পিছিয়ে গেল।
মহিলা বলল—
“সতেরো বছর আগে আমিও এই ট্রেনে উঠেছিলাম।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
আরিয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে সিটে বসে পড়ল।
কন্ডাক্টর তার সামনে এসে দাঁড়াল।
“এখন বুঝলেন?”
আরিয়ান বলল,
“এই ট্রেনে আসলে কী হচ্ছে?”
কন্ডাক্টর বলল,
“আপনি সত্যিটা জানতে চান?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে ভয় পাবেন না।”
আরিয়ান তাকিয়ে রইল।
কন্ডাক্টর ধীরে ধীরে বলল—
“এই ট্রেন কোনো জায়গায় যায় না।”
“মানে?”
“এটা শুধু তাদের নিয়ে চলে যারা কোনো একটা কারণে নিজেদের শেষ যাত্রা শেষ করতে পারেনি।”
“মৃত মানুষ?”
“শুধু মৃত মানুষ নয়।”
কন্ডাক্টর জানালার বাইরে তাকাল।
“যারা কাউকে ছেড়ে যেতে পারেনি।”
“যারা কোনো কথা শেষ করতে পারেনি।”
“যারা কোনো সত্যি লুকিয়ে রেখে গেছে।”
“আর কখনো কখনো...”
সে আরিয়ানের দিকে তাকাল।
“জীবিত মানুষও এই ট্রেনে উঠে পড়ে।”
আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল,
“আমার বাবা?”
কন্ডাক্টর চুপ।
“আমার বাবা কি এই ট্রেনে ছিলেন?”
কন্ডাক্টর মাথা নেড়ে বলল,
“ছিলেন।”
“কত বছর?”
“সতেরো।”
আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল।
“কিন্তু তিনি তো আট বছর আগে মারা গেছেন!”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে?”
“শরীরটা আট বছর আগে মারা গেছে।”
কন্ডাক্টর বলল,
“কিন্তু তার যাত্রা শেষ হয়নি।”
আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।
তার বাবার মুখ মনে পড়ল।
শৈশবের সেই স্মৃতি—
বাবা তাকে কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন।
বাবা তাকে রেললাইন দেখাচ্ছেন।
বাবা বলছেন—
“রেললাইন কখনো একা হয় না। কোথাও না কোথাও একটা ট্রেন আসবেই।”
তখন সে বুঝতে পারেনি কথাটার মানে।
এখন বুঝতে পারছে।
ট্রেন আবার অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে গেল।
এবার জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাতে শুরু করল।
আরিয়ান নিজের পুরোনো বাড়ি দেখতে পেল।
তারপর স্কুল।
তারপর সেই মাঠ যেখানে সে ছোটবেলায় খেলত।
তারপর—
তার বাবার দোকান।
সবকিছু যেন আগের মতো।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—
সে আবার ছোট হয়ে গেছে।
কিন্তু পাশে বসা ছোট ছেলেটা বলল,
“ওগুলোর দিকে তাকিও না।”
আরিয়ান ছেলেটার দিকে তাকাল।
“তুমি কে?”
ছেলেটা চুপ।
“তোমার নাম কী?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
“নাম বললে কী হবে?”
“জানি না।”
“তাহলে বলো না।”
আরিয়ান অবাক।
“তুমি কতদিন ধরে এই ট্রেনে?”
ছেলেটা জানালার বাইরে তাকাল।
“আমি জানি না।”
“তুমি নামতে চাও না?”
“চাই।”
“তাহলে নামো না কেন?”
ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমার মা এখনও আমাকে নিতে আসেনি।”
আরিয়ান থেমে গেল।
“তোমার মা কোথায়?”
ছেলেটা সামনে তাকাল।
“এই ট্রেনেই।”
আরিয়ান চারপাশে তাকাল।
“কোথায়?”
ছেলেটা একটা সিটের দিকে ইশারা করল।
সেখানে একজন মহিলা বসে ছিলেন।
চোখ বন্ধ।
মুখ শান্ত।
আরিয়ানের বুকটা কেঁপে উঠল।
সে মহিলার কাছে গেল।
ছোট ছেলেটা ফিসফিস করে বলল—
“মা...”
মহিলাটি চোখ খুললেন।
তারপর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
কিন্তু তিনি কোনো কথা বললেন না।
শুধু হাত বাড়িয়ে দিলেন।
ছেলেটা মায়ের পাশে গিয়ে বসে পড়ল।
তারপর দুজন একসঙ্গে জানালার বাইরে তাকাতে লাগল।
আরিয়ান বুঝল—
এই ট্রেনে প্রত্যেকের একটা অসমাপ্ত গল্প আছে।
কেউ কাউকে খুঁজছে।
কেউ ক্ষমা চাইতে চায়।
কেউ বিদায় বলতে চায়।
আর কেউ—
শুধু অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।
অন্ধকার।
একদম অন্ধকার।
তারপর স্পিকার থেকে একটা কণ্ঠ—
“শেষ স্টেশন সামনে।”
সব যাত্রী উঠে দাঁড়াল।
একসঙ্গে।
কোনো শব্দ নেই।
কন্ডাক্টর দরজার দিকে হাঁটল।
আরিয়ানও উঠে দাঁড়াল।
“শেষ স্টেশন কোথায়?”
কন্ডাক্টর বলল,
“যেখানে প্রত্যেক যাত্রীকে তার সত্যের সামনে দাঁড়াতে হয়।”
“আর তারপর?”
“তারপর যার যাত্রা শেষ হয়েছে, সে চলে যায়।”
“আর যার শেষ হয়নি?”
কন্ডাক্টর তাকাল তার দিকে।
“সে ট্রেনে থেকে যায়।”
ট্রেন থামল।
দরজা খুলল।
বাইরে বিশাল একটা প্ল্যাটফর্ম।
কিন্তু এই প্ল্যাটফর্ম দেখে আরিয়ান বুঝতে পারল—
এটা সে আগে দেখেছে।
চাঁদপুরা স্টেশন।
সেই স্টেশন।
কিন্তু ১৭ বছর আগের চাঁদপুরা।
দেয়াল নতুন।
বাতিগুলো ঠিকঠাক।
স্টেশনের সামনে একটা ছোট চায়ের দোকান।
আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে—
একজন মানুষ।
সাদা শার্ট।
হাতে ছোট ব্যাগ।
আরিয়ান তাকে দেখেই চিনে ফেলল।
তার বাবা।
“বাবা!”
সে দৌড়ে গেল।
বাবা হাত বাড়িয়ে তাকে থামালেন।
“আর সামনে আসিস না।”
“তুমি এখানে কেন?”
“তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
“১৭ বছর?”
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ।”
আরিয়ান কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুমি আমাকে কেন কিছু বলোনি?”
বাবা বললেন,
“কারণ তুই বেঁচে থাকবি—এই প্রতিশ্রুতি আমাকে রাখতে হয়েছিল।”
“কী হয়েছিল সেদিন?”
বাবা চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
“সেদিন রাতে আমরা দুজন এই ট্রেনে উঠেছিলাম।”
“আমি আর তুমি?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“তুই তখন খুব অসুস্থ ছিলি। তোকে হাসপাতালে নিতে হবে ভেবেছিলাম।”
“তারপর?”
“এই ট্রেন এসেছিল।”
বাবা গভীর শ্বাস নিলেন।
“আমি বুঝিনি এটা সাধারণ ট্রেন নয়।”
“তারপর?”
“ট্রেন যখন স্টেশনে থামল, আমি দেখলাম তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস।”
“আমি তো ট্রেনে ছিলাম!”
“হ্যাঁ।”
বাবা বললেন,
“কিন্তু কিছুক্ষণ পর ট্রেনের ভেতর এমন একটা ঘটনা ঘটল, যেটা আমি আজও ভুলতে পারিনি।”
“কী?”
বাবা বললেন,
“সব যাত্রী একসঙ্গে আমাদের দিকে তাকাল।”
“তারপর?”
“তারা বলল—একজনকে রেখে একজন যেতে পারবে।”
আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল।
“মানে?”
বাবা তার দিকে তাকালেন।
“তখন বুঝলাম, ট্রেনটা তোকে চায়।”
“কেন?”
“জানি না।”
“তাহলে তুমি?”
বাবা হাসলেন।
“আমি তোকে নামিয়ে দিয়েছিলাম।”
“আর তুমি?”
“আমি ফিরে উঠেছিলাম।”
আরিয়ান কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“কেন?”
বাবা তার মাথায় হাত রাখলেন।
“কারণ একজন বাবার কাজ হলো নিজের সন্তানকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া।”
আরিয়ান বাবাকে জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে গেল।
কিন্তু বাবা পিছিয়ে গেলেন।
“না।”
“কেন?”
“এখন তোর যাওয়ার সময়।”
“আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”
বাবা মৃদু হাসলেন।
“তুই আমাকে ১৭ বছর ধরে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিস।”
“কীভাবে?”
“তোর স্মৃতিতে।”
“তাহলে আজ?”
“আজ আমাকে যেতে দে।”
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
“না।”
বাবা বললেন,
“তুই যদি আমাকে ধরে রাখিস, আমি এই ট্রেন থেকে কখনো নামতে পারব না।”
আরিয়ান ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে ফেলল।
তার বাবা হাসলেন।
তারপর বললেন—
“একটা কথা মনে রাখিস।”
“কী?”
“সব মৃত মানুষ ভয়ংকর নয়।”
তিনি ট্রেনের দিকে তাকালেন।
“কিছু মৃত মানুষ শুধু অপেক্ষা করে।”
“কিসের জন্য?”
বাবা বললেন—
“কেউ একজন যেন তাদের ভুলে না যায়।”
হঠাৎ পুরো স্টেশন কেঁপে উঠল।
ট্রেনের হর্ন বেজে উঠল।
কু-উ-উ-উ-উ...
কন্ডাক্টর চিৎকার করল—
“আরিয়ান! এখনই!”
আরিয়ান বাবার দিকে তাকাল।
বাবা বললেন,
“যা!”
আরিয়ান দৌড়ে ট্রেন থেকে নেমে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
তার বাবা জানালার পাশে দাঁড়ালেন।
আরিয়ান হাত নাড়ল।
বাবাও হাত নাড়লেন।
ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
তারপর দ্রুত।
আরও দ্রুত।
শেষে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
স্টেশন আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।
আরিয়ান একা দাঁড়িয়ে।
তারপর—
সবকিছু অন্ধকার।
সকাল ৬টা ২০ মিনিট।
চাঁদপুরা স্টেশনের একজন কর্মচারী প্ল্যাটফর্মে এসে দেখল—
একজন যুবক বেঞ্চের ওপর ঘুমিয়ে আছে।
তার হাতে শক্ত করে ধরা একটা পুরোনো ট্রেনের টিকিট।
লোকটা তাকে ডাকল।
“ভাই?”
আরিয়ান চোখ খুলল।
সে চারপাশে তাকাল।
সকালের আলো।
মানুষজন।
চায়ের দোকান খোলা।
ট্রেন আসছে যাচ্ছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
“আমি... এখানে কীভাবে?”
স্টেশন কর্মচারী বলল,
“আপনি রাতে এখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন মনে হয়।”
আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।
“কতক্ষণ?”
“জানি না। আমি ভোরে দেখেছি।”
আরিয়ান নিজের পকেট দেখল।
একটা জিনিস আছে।
পুরোনো একটা ছবি।
সে ছবিটা বের করল।
ছবিতে—
ছোট্ট আরিয়ান।
তার পাশে তার বাবা।
দুজনেই রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে।
আর ছবির পেছনে নতুন করে একটা লেখা।
“এবার আমার যাত্রা শেষ।”
আরিয়ান ছবিটা বুকে চেপে ধরল।
তার চোখ দিয়ে পানি চলে এল।
সেদিনের পর আরিয়ান আর কখনো সেই ট্রেন দেখেনি।
চাঁদপুরা স্টেশনের লোকজনও বলল—
“এই সময়ে কোনো ট্রেন আসে না।”
আরিয়ান অনেকদিন ভেবেছিল—
সবকিছু হয়তো স্বপ্ন ছিল।
হয়তো ক্লান্তির কারণে সে অদ্ভুত কিছু দেখেছিল।
হয়তো বাবাকে খুব মনে পড়ছিল বলেই এমন হয়েছিল।
কিন্তু প্রায় এক বছর পর...
এক রাতে সে নিজের ঘরে বসে কাজ করছিল।
ঘড়িতে সময়—
১টা ১৩ মিনিট।
হঠাৎ বাইরে থেকে একটা শব্দ এল।
কু-উ-উ-উ...
আরিয়ান থেমে গেল।
তারপর—
টিং...
সে জানালার কাছে গেল।
বাইরে কোনো রেললাইন নেই।
কোনো ট্রেনও নেই।
শুধু রাস্তা।
সে আবার কাজে ফিরে এল।
ঠিক তখন তার ফোনে একটা মেসেজ এল।
UNKNOWN
মেসেজে শুধু লেখা—
“ভয় পেয়ো না। ট্রেনটা আর তোমার জন্য নয়।”
আরিয়ানের বুক ধক করে উঠল।
তারপর আরেকটা মেসেজ এল।
“এবার অন্য একজনের পালা।”
আরিয়ান জানালার দিকে তাকাল।
দূরে একটা ছোট ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে।
তার হাতে একটা পুরোনো ট্রেনের টিকিট।
ছেলেটা জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
আরিয়ানের ফোনে শেষ মেসেজটা এল—
“শেষ ট্রেন কখনো শেষ হয় না।”
তারপর ফোনের স্ক্রিন নিজে থেকেই নিভে গেল।
আর দূরে কোথাও—
কু-উ-উ-উ...
তারপর—
টিং...
টিং...
টিং...
আরিয়ান বুঝতে পারল—
কিছু যাত্রা শেষ হয়।
কিছু মানুষ বিদায় নেয়।
কিন্তু কিছু গল্প...
রেললাইনের মতোই—
এক স্টেশনে শেষ হয়ে অন্য স্টেশনে আবার শুরু হয়।