Story

ঝগড়াইট্টা পরিবার

October 8, 2026

30 views

ঝগড়াইট্টা পরিবার

পর্ব–১: যে বাড়িতে শান্তি নিষিদ্ধ

শহরের এক গলির শেষ মাথায় একটা দোতলা বাড়ি ছিল।

বাড়িটার নাম কেউ জানত না।

তবে আশেপাশের সবাই একটা নামেই চিনত—

“ঝগড়াইট্টা পরিবার।”

কারণ ওই বাড়িতে এমন কোনো দিন ছিল না, যেদিন ঝগড়া হয়নি।

সকাল শুরু হতো ঝগড়া দিয়ে।

দুপুরে ঝগড়া।

বিকেলে ঝগড়া।

আর রাতে সবাই ঘুমানোর আগে—

শেষ ঝগড়াটা কে করবে, সেটা নিয়েও ঝগড়া!

বাড়ির কর্তা হাশেম সাহেব।

বয়স প্রায় ষাট।

তিনি নিজেকে খুব শান্ত মানুষ মনে করতেন।

কিন্তু পরিবারের সবাই বলত—

“আব্বা শান্ত মানুষ, শুধু কেউ তার কথা না শুনলেই রেগে যান।”

তার স্ত্রী রওশন আরা।

তিনি ছিলেন সংসারের প্রধানমন্ত্রী।

কে কখন ঘুমাবে, কে কখন খাবে, কে কতক্ষণ মোবাইল চালাবে—সব তার জানা।

তাদের বড় ছেলে রাকিব।

বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।

তার স্ত্রী মিতু।

মিতু এই বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই বুঝে গিয়েছিল—

এই বাড়িতে বউ হওয়া মানে শুধু সংসার করা নয়।

প্রতিদিন একটা করে যুদ্ধ করা।

আর ছিল ছোট ছেলে সজীব।

সে ছিল বাড়ির সবচেয়ে বড় দুষ্টু।

ঝগড়া হলে সে কখনো কারও পক্ষ নিত না।

কারণ তার মতে—

“দুই পক্ষই ভুল। তাই আমি দূরে বসে মজা দেখি।”


সকাল সাতটা।

রওশন আরা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করলেন—

—“মিতুউউউ!”

মিতু ঘর থেকে বের হলো।

—“জি আম্মু?”

—“তুই ডিম কয়টা ভাজছিস?”

—“চারটা।”

—“চারটা কেন?”

—“আম্মু, মানুষ তো চারজন…”

—“আমি কি মানুষ না?”

মিতু থমকে গেল।

—“আপনি তো পাঁচজনের মতো খেতে পারেন…”

পুরো বাড়ি নীরব।

সজীব পাশের ঘর থেকে মুখ বের করল।

—“ভাবি, আপনি আজকে বাঁচবেন না।”

রওশন আরা চিৎকার করে বললেন—

—“কী বললি?”

মিতু তাড়াতাড়ি বলল,

—“আমি বলতে চেয়েছি… আপনি পাঁচজনের মতো কাজ করেন!”

সজীব মুখ চেপে হাসতে লাগল।

রওশন আরা বললেন,

—“আমাকে শেখাতে হবে না। যাও, আরেকটা ডিম ভাজ।”

মিতু রান্নাঘরে চলে গেল।

সজীব ফিসফিস করে বলল,

—“একটা ডিমের জন্য আজকে তিনজনের চরিত্র প্রকাশ পেল।”


এই বাড়ির সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—

খাবার।

কার রান্না ভালো হয়েছে, কে বেশি খেয়েছে, কার প্লেটে মাংসের টুকরা বড়—এসব নিয়ে প্রতিদিন নতুন মামলা।

একদিন দুপুরে রাকিব দেখল তার প্লেটে মাংস নেই।

সে বলল,

—“আম্মু, আমার মাংস কোথায়?”

রওশন আরা বললেন,

—“তোর বউকে জিজ্ঞেস কর।”

রাকিব মিতুর দিকে তাকাল।

মিতু বলল,

—“আমি জানি না।”

সজীব বলল,

—“আমি জানি।”

সবাই তার দিকে তাকাল।

সজীব গম্ভীর মুখে বলল,

—“মাংসটা আমি খেয়েছি।”

রাকিব উঠে দাঁড়াল।

—“তুই?!”

সজীব দৌড়!

পুরো বাড়িতে শুরু হলো মাংসের জন্য ধাওয়া।

রওশন আরা চিৎকার করছেন—

—“সজীব! দাঁড়া!”

হাশেম সাহেব বারান্দা থেকে বলছেন—

—“ওকে ধরো!”

সজীব নিচতলায় দৌড়াতে দৌড়াতে বলছে—

—“মাংসের টুকরো ছোট ছিল! এত বড় বিচার কেন?”

মিতু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

কিন্তু তার হাসি বেশিক্ষণ থাকল না।

কারণ রওশন আরা হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বললেন—

—“তুমিও হাসছ?”

মিতু সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে ফেলল।

—“না আম্মু।”

সজীব দূর থেকে বলল—

—“ভাবি, এই বাড়িতে হাসাও অপরাধ।”


তবে সবসময় হাসির ছিল না।

কিছু কিছু দিন এই বাড়ির পরিবেশ এত খারাপ হয়ে যেত যে মিতু নিজের ঘরে বসে চুপচাপ কাঁদত।

রওশন আরা প্রায়ই বলতেন—

—“আমার ছেলে বিয়ের আগে কত শান্ত ছিল।”

মিতু একদিন সাহস করে বলল—

—“আম্মু, রাকিব ভাই তো বিয়ের আগেও অনেক ঝগড়া করতেন।”

রাকিব পাশ থেকে বলল—

—“এই কথাটা ঠিক।”

রওশন আরা সঙ্গে সঙ্গে বললেন—

—“তুই চুপ কর! তোর বউয়ের পক্ষ নিচ্ছিস?”

রাকিব আবার চুপ।

এই ছিল তাদের সংসার।

কেউ কারও কথা শেষ করতে পারত না।


একদিন রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

হাশেম সাহেবের ঘরে রাখা একটা পুরোনো কাঠের বাক্স খুঁজে পাওয়া গেল না।

বাক্সটা ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তার ভেতরে কিছু পুরোনো কাগজপত্র, জমির দলিল আর কিছু টাকা ছিল।

হাশেম সাহেব বাক্সটা না পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন—

—“আমার বাক্স কোথায়?!”

রওশন আরা বললেন—

—“আমি জানি না।”

—“মিতু!”

মিতু দৌড়ে এল।

—“জি?”

—“তুমি নিয়েছ?”

মিতু অবাক।

—“আমি কেন নেব?”

রাকিব বলল—

—“আব্বা, মিতু নেবে কেন?”

হাশেম সাহেব বললেন—

—“তাহলে কে নিয়েছে?”

ঘরে নীরবতা।

সজীব তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

হাশেম সাহেব তার দিকে তাকালেন।

—“তুই?”

সজীব চোখ বড় করে বলল—

—“আমি টাকা চুরি করলে এতক্ষণে এই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতাম।”

রাকিব বলল—

—“তা ঠিক।”

রওশন আরা বললেন—

—“চুপ কর!”


বাক্সটা পুরো বাড়িতে খোঁজা হলো।

আলমারি।

খাটের নিচে।

স্টোররুম।

রান্নাঘর।

কোথাও নেই।

শেষে হাশেম সাহেব বললেন—

—“বাক্সটা কেউ নিয়েছে।”

মিতুর বুক ধক করে উঠল।

কারণ সে বুঝতে পারছিল—

পরিবারের সন্দেহটা ধীরে ধীরে তার দিকেই যাচ্ছে।

রওশন আরা বললেন—

—“এই বাড়িতে নতুন মানুষ আসার পর থেকেই একের পর এক জিনিস হারাচ্ছে।”

মিতু কেঁপে উঠল।

—“আম্মু, আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?”

—“আমি কিছু বলিনি।”

—“কিন্তু কথাটা আমাকে শুনিয়েই বললেন।”

রাকিব বলল—

—“আম্মু, প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষ দেবেন না।”

রওশন আরা রেগে গেলেন।

—“তুই এখন পুরোপুরি বউয়ের হয়ে গেছিস!”

আবার ঝগড়া শুরু।

হাশেম সাহেব চিৎকার করছেন।

রওশন আরা চিৎকার করছেন।

রাকিব চিৎকার করছে।

মিতু কাঁদছে।

আর সজীব?

সে চুপচাপ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিন্তু তার চোখ অন্য জায়গায়।

হঠাৎ সে মেঝের দিকে তাকাল।

একটা ছোট্ট কাদামাখা জুতার দাগ।

বাড়ির ভেতরে।

কিন্তু পরিবারের কারও জুতা কাদামাখা ছিল না।

সজীব দাগটা অনুসরণ করতে লাগল।

দাগ গিয়ে শেষ হয়েছে—

স্টোররুমের দরজার সামনে।

স্টোররুমটা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ।

সজীব অবাক হয়ে গেল।

সে দরজার নিচে ঝুঁকে দেখল।

ভেতরে অন্ধকার।

কিন্তু…

একটা খুব ক্ষীণ শব্দ আসছে।

টুপ…

কিছু একটা পড়ল।

তারপর—

টুপ…

সজীব দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ ভেতর থেকে খুব আস্তে একটা শব্দ এল—

“বাঁচাও…”

সজীবের মুখের হাসি এক মুহূর্তে চলে গেল।

সে পিছিয়ে গেল।

তারপর দৌড়ে সবাইকে ডাকতে গেল।

—“আব্বা!”

সবাই ছুটে এল।

—“কী হয়েছে?”

সজীব কাঁপা গলায় বলল—

—“স্টোররুমের ভেতর কেউ আছে।”

হাশেম সাহেব বললেন—

—“অসম্ভব! চাবি তো আমার কাছে।”

তিনি চাবি বের করে তালা খুললেন।

দরজা খুলতেই—

সবাই থমকে গেল।

ঘর খালি।

কেউ নেই।

কিন্তু মেঝের মাঝখানে পড়ে আছে—

হাশেম সাহেবের সেই কাঠের বাক্স।

রওশন আরা চিৎকার করে বললেন—

—“এটা এখানে এল কীভাবে?”

হাশেম সাহেব বাক্সটা খুললেন।

টাকা আছে।

কাগজপত্রও আছে।

কিন্তু একটা জিনিস নেই।

একটা পুরোনো ছবি।

ছবিতে ছিল তাদের পরিবারের প্রায় বিশ বছর আগের ছবি।

হাশেম সাহেব ছবিটা খুঁজতে লাগলেন।

হঠাৎ মিতু বলল—

—“ছবিটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ?”

হাশেম সাহেব উত্তর দিলেন না।

তার মুখের রং বদলে গেছে।

সজীব জিজ্ঞেস করল—

—“আব্বা, ছবিতে কে ছিল?”

হাশেম সাহেব ধীরে ধীরে বললেন—

—“যে মানুষটার কথা এই বাড়িতে কেউ কোনোদিন বলবে না…”

সবাই চুপ।

রওশন আরা হঠাৎ বললেন—

—“ও কথা এখন বলার দরকার নেই।”

সজীব বলল—

—“কিন্তু ছবিটা কে নিল?”

কেউ উত্তর দিল না।

ঠিক তখন—

উপরতলা থেকে একটা শব্দ হলো।

ধাম!

সবাই উপরের দিকে তাকাল।

তারপর আরেকটা শব্দ—

ঠক… ঠক… ঠক…

যেন কেউ ধীরে ধীরে দরজায় আঘাত করছে।

রাকিব বলল—

—“উপরে কে?”

কোনো উত্তর নেই।

হাশেম সাহেব হাতে টর্চ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলেন।

সবাই তার পেছনে।

সিঁড়ির শেষ ধাপে উঠতেই দেখা গেল—

করিডোরের একদম শেষে একটা দরজা খোলা।

সেই ঘরটা বছরের পর বছর বন্ধ।

হাশেম সাহেব থেমে গেলেন।

রওশন আরা তার হাত ধরে বললেন—

—“ও ঘরে যেও না।”

হাশেম সাহেব ফিসফিস করে বললেন—

—“কেউ ওখানে ঢুকেছে…”

তারা ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।

ভেতরে অন্ধকার।

টর্চের আলো ফেলতেই—

দেয়ালের সামনে একটা চেয়ার।

চেয়ারের ওপর—

হারিয়ে যাওয়া ছবিটা।

আর ছবির ওপর একটা হাতে লেখা কাগজ।

সজীব কাগজটা তুলে পড়ল।

মাত্র একটা বাক্য—

“তোমরা ঝগড়া করতে থাকো… আসল চোর তো তোমাদের মাঝেই আছে।”

সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।

ঠিক তখনই—

নিচতলা থেকে রওশন আরার চিৎকার ভেসে এল—

“আমার আলমারি খোলা! গয়নাগুলো নেই!”

হাশেম সাহেব ছুটে নিচে নামলেন।

মিতু তার পেছনে।

রাকিব তার পেছনে।

সজীবও দৌড়াল।

কিন্তু সজীব সিঁড়ির মাঝখানে থেমে গেল।

কারণ সে শুনতে পেল—

তার একদম কানের পাশে কেউ ফিসফিস করে বলছে—

“চোরকে খুঁজতে যেও না…”

সজীব ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল।

কেউ নেই।

তারপর সেই কণ্ঠ আবার বলল—

“চোর তোমাদের ঘরেই আছে।”

২ আসছে........

চলবে… 😨🏠

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login