ষসামর্থ্য ও সুযোগ থাকলে সন্তানকে সাহিত্য, গান, নাচ, থিয়েটার, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও শরীরচর্চা শেখান। তাকে দিয়ে বাগান করান, কৃষিকাজ, গৃহকর্ম ও রান্নাবান্নায় হাতেখড়ি দিন। চ্যালেঞ্জ -আপনার সন্তান টিকটকার হবে না। মাদকাসক্ত হবে না, কিশোরগ্যাংয়েও নাম লেখাবে না। যারা লেখাপড়ার বাইরে এক্সট্রা কারিকুলাম ও অ্যাকটিভিটিজে বিজি থাকে তাদের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা কমে ৯০ ভাগ।
আপনার কাছে কাড়ি কাড়ি অর্থ আছে বলেই চাহিবাপত্র সন্তানকে আইফোন, পালসার কিংবা রয়েল এনফিল্ড বাইক কিনে দেবেন না। সন্তানকে অর্থের কষ্ট অনুভব করতে দিন। গুড প্যারেন্টিং নিজে শিখুন, সন্তানকেই তদানুযায়ী ট্রিটমেন্ট দিন।
কোমলমতি শিশুরা চাওয়ার আগেই বিলাসিতার সুযোগ পেয়ে গেলে উদ্ভট কিছু বন্ধু তাকে বিপথে টেনে নেয়ার মওকা পাবে। মনে রাখবেন আপনি অন্যকে যত দেখাবেন, অন্যের কাছে যতবেশি নিজেদেরকে এক্সপোজ করবেন -পাল্লা দিয়ে চারিধারে ততোধিক শত্রু আপনি নিজেই পয়দা করলেন।
সেই শত্রুর বিষাক্ত ছোঁয়াচ থেকে রাষ্ট্র আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। নাগরিকের খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বরাবরই রাষ্ট্রের অন্তরালকে ভয়ানকভাবে নড়বড়ে করে তোলে।
মানুষ নৈতিকতা শেখে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা ও সিনিয়রদের দেখানো সরল পথের উপলব্ধি থেকে। এর অন্যবিধ বিকল্প নেই। মুসলিমদের জন্য সুরা ফাতেহার পঞ্চম আয়াতের সরল পথের দিশা (ইহদিনাছ ছিরাতল মুস্তাকিম) খোঁজা -শ্রেষ্ঠতম ঐশ্বরিক প্রার্থনা।
অপরদিকে হিন্দু শাস্ত্রে সরলপথ ও আলোর দিশা পাওয়ার জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদের অসত্য, অনিত্য বা ভুল পথ থেকে আমাকে সত্য ও সরলপথে নিয়ে যাও (ওঁ অসতো মা সদ্গময়) হলো সর্বোচ্চ আরাধনা।
খ্রিস্টসমাজ বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন নিয়মহিতোপদেশ ৩:৫-৬ এর ওপর ভরসা করতে পারেন -যেখানে উৎকীর্ণ আছে, তোমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে সদাপ্রভুর [ঈশ্বরের] উপরে ভরসা কর, তোমার নিজের বিবেচনায় নির্ভর করোও না; তোমার সমস্ত পথে তাঁকে স্বীকার কর; তাতে তিনি তোমার পথ সকল সরল করবেন।
গৌতম বুদ্ধের মতে, চরম ভোগবিলাস কিংবা কঠোর শরীর-পীড়নকারী তপস্যা -কোনোটিই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না। তাই তিনি এই দুই চরম পন্থার মাঝখানে একটি সরল, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পথ নির্দেশ করেছেন, যা মানুষকে দুঃখের হাত থেকে চিরতরে মুক্তি দেয়। ত্রিপিটক অনুযায়ী মানুষের জীবন থেকে দুঃখ মুক্তি এবং নির্বাণ লাভের জন্য যে সরল ও সঠিক পথের কথা বলা হয়েছে, তাকে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ (Noble Eightfold Path) বা মধ্যম পন্থা (Middle Way) বলা হয়। এটিই বৌদ্ধসমাজের সাধনার বড় মার্গ হতে পারে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ধর্মের সরল আদর্শ প্রবন্ধে বলেছেন, 'যে দার্শনিক দর্শনকে সহজ করিয়া দেখাইতে পারেন, তিনিই যথার্থ ক্ষমতাশালী, ধীশক্তিমান; যে সভ্যতা আপনার সমস্ত ব্যবস্থাকে সরলতার দ্বারা সুশৃঙ্খল ও সর্বত্র সুগম করিয়া আনিতে পারে, সেই সভ্যতাই যথার্থ উন্নততর। বাহিরে দেখিতে যেমনই হউক, জটিলতাই দুর্বলতা, তাহা অকৃতার্থতা -পূর্ণতাই সরলতা। ধর্ম সেই পরিপূর্ণতার, সুতরাং সরলতার, একমাত্র চরমতম আদর্শ।'
'তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি' -গানে কবি বলেছেন, ফুল, মালা, ধূপ-দীপ আর আচারের বাহ্যিক আড়ম্বরে মানুষ আসল ঈশ্বরকে ভুলে যায়। অন্তরের সহজ এবং নিভৃত ভক্তিই ঈশ্বরের আসল আসন। ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাভরণ এবং অহংকারহীন করার এক চরম প্রার্থনাই হলো এই গানের সারাৎসার। পিলু রাগে দাদরা তালের এই গানটির শেষে কবি তাইতো বলেন-
কাজ কী আমার মন্দিরেতে আনাগোনায়--
পাতব আসন আপন মনের একটি কোণায়,
সরল প্রাণে নীরব হয়ে তোমায় ডাকি॥
প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মিস্টিক কবি মহাত্মা লালন ফকির একতারা বাজিয়ে কী দারুণভাবে এই পূণ্যভূমির মাঠেপ্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে গেয়ে চলেন-
সহজ মানুষ ভজে দেখনারে
মন দিব্যজ্ঞানে
পাবিরে অমূল্য নিধি বর্তমানে॥
জীবনকে লালনপালনের পরম সত্য নিহিত রয়েছে সহজ-সরলতার নিখাদ ভাবধারায়। কায়িক সাধনা, শিল্প-সংস্কৃতি এবং কষ্টসহিষ্ণুতার সংস্পর্শে সন্তানের আত্মাকে স্পর্শ করাতে পারলে পার্থিব পঙ্কিলতা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। বিশ্বজনীন ধর্মভাবনা, রবীন্দ্রদর্শন কিংবা লালনের মরমী চেতনার মূল সুর একটাই -বাহ্যিক আড়ম্বর, অহংকার ও অতি-উপভোগের জটিলতা ছেড়ে অন্তরের বিশুদ্ধ সরলতায় পরম সত্যের সন্ধান পাওয়া। বড়ত্বের রূপক, দেখনদারিত্ব ও বস্তুচেতনার অসারতা ভুলিয়ে সন্তানকে সেই সহজ মানুষ ও ঋজু পথের অভিযাত্রী করে তোলাই অভিভাবকত্বের শ্রেষ্ঠ সাধনা হোক। লালন ফকিরের দাস্যভাব আমাদের সবার মনে সসম্মানে জায়গা করুক।
লেখক: সাংবাদিক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬