Article

রবীন্দ্র বিরোধিতা: অসারের তর্জন গর্জন সার

October 10, 2026

37 views

খুব হাসি পাচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননজগতের প্রধান স্থপতি, বাঙালি বিদ্বৎসমাজকে যুগের পর যুগ যিনি আলোকিত করে চলেছেন -সেই মানুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য গ্রাফিতি নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিয়েছে গুটিকয়েক অজ্ঞ, অপড়ুয়া ও ইতিহাসবিস্মৃত তারুণ্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -Tagore নামে যাকে বিশ্ব চেনে; তিনি নিজেই শেষ বয়সে তাঁর বেশ কয়েকটি আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন কালো ও ধূসর রঙে। ​কালো রঙকে তিনি শুধু এক ধরণের রঞ্জক হিসেবে দেখেননি, বরং তা ছিল ভেতরের গভীর গাম্ভীর্য ও রহস্যকে ফুটিয়ে তোলার একটি ভাষা। কালো কালির বোল্ড রেখা ও ছায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ মুখে এক তীব্র নাটকীয় আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করতেন। গাঢ় কালোর মাঝখান থেকে যখন তাঁর উজ্জ্বল চোখ দুটি বের হয়ে আসত, তা এক ধরনের অন্তর্ভেদী ও প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি তৈরি করত। ওই দৃষ্টি দিয়ে তিনি নিন্দুকের জবাব দিতেন এভাবে-

যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।

অজ্ঞানের অন্ধকারে

আড়ালে ঢাকিছ যারে

তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

কালো দিয়ে আলোর ভুবন গড়া মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখে কিছু অর্বাচীনের চুনকালিতে তাই কিছুই এসে যায় না। বিশ্ব যারে সযতনে বুকের ঘরে রেখে দিয়েছে কতিপয় নালায়েকের ঘৃণা তারে এতটুকু ছোঁয় না।

তর্জন গর্জনে আষাঢ়ের কালো মেঘ ঢেকে দেয় সর্বব্যাপি সূর্যকে। এটা ক্ষণকাল। সূর্য তার যথাস্থানে থেকে বলে, সরে যাও গণ্ডমূর্খ -আমাকে পরিমাপ করবার বাটখারা কখনোই তোমার করায়ত্ত হবে না। আমার দীপ্তি তোমরা চিনবেই না। রবিঠাকুর বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বাঙালিয়ানা ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির প্রখর সূর্য। যাকে কিয়ৎকাল মেঘ হয়ে ঢাকা দেয়া যায় হয়ত -কিন্তু অস্বীকার করবার দুর্মর দুঃসাহস দেখানো যায় না।

১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। তাদের মুখপত্র শিখা ছিল বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্তের এক বৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন -যার মূল সুর ছিল 'বুদ্ধির মুক্তি'। ওই সাহিত্য সমাজের মূলমন্ত্র ছিল -'জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।'

ওই সাহিত্য সমাজের গর্বিত সভ্য কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন, কাজী মোতাহের হোসেন, আবুল ফজল, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীদের মতো প্রগতিশীল মুসলিম চিন্তাবিদরা সরাসরি ঘোষণা করেছিলেন -রবীন্দ্রনাথ কেবল হিন্দুদের নন, তিনি সকল বাঙালির।

সেসময়ের রক্ষণশীল সমাজ রবীন্দ্রনাথকে ‘বিজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে বর্জনের ডাক দিচ্ছিল, তখন শিখা গোষ্ঠী বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছিল যে, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, উদারতা ও নিরাকার ভাবনা ইসলামের শাশ্বত উদার চেতনার পরিপন্থী নয়। এই ঘোষণার সাথে পরবর্তীতে কলকাতা থেকে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সওগাত সম্পাদক মো. নাসিরুদ্দীন, মোজাফফর আহম্মদ, আবু সাঈদ আইয়ুব প্রমুখ। প্যারিস থেকে চিঠি লিখে, নিবন্ধ লিখে সমর্থন করেছিলেন বহু ভাষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াস। যার বিরুদ্ধে গেল আড়াইবছরে বিভিন্ন কৃত্রিম ইস্যুতে মব সৃষ্টির বহু অভিযোগ গ্রন্থিত রয়েছে। এরা কেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলছে? ওদের সাথে কোনো পরিপ্রেক্ষিতেই কি রবিঠাকুরের নাম যায়?

গণমাধ্যমকর্মী অমিতাভ দেউরী তাঁর লেখা 'ব্র্যান্ড রবীন্দ্রনাথ: ঘৃণা, বিরোধিতা ও শব্দের রাজনীতি শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের কাজ, চিন্তা, দর্শন, আন্দোলন, অভিব্যক্তি, জীবন ও তৎপরতা নিয়ে অন্যদের লিখিত, সম্পাদিত বা সংকলিত এবং ছাপা হওয়া প্রবন্ধ, নিবন্ধ, অভিসন্দর্ভ, গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যা লক্ষাধিক। পিএইচডি হয়েছে হাজারে হাজার। আর তাঁর নিজের কাজ, পর্বত সমান। অনূদিত হয়েছে অন্তত ৪০টি ভাষায়।

স্মরণকালের ইতিহাসে বাংলার সবথেকে বড় পলিম্যাথ রবীন্দ্রনাথ। তাঁর রচিত কবিতা ও ছড়া ৩,০০০-এর বেশি। গান ২,২৩২টি (স্বরবিতান অনুযায়ী)। ছোটগল্প ৯৫টি (গল্পগুচ্ছের অন্তর্ভুক্ত)। ১২টি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস এবং কিছু দীর্ঘ গল্প বা বড় গল্প (যেমন 'চতুরঙ্গ')। নাটক ৩৮টি (এর মধ্যে কাব্যনাট্য ও প্রহসন অন্তর্ভুক্ত)। গীতি নাট্য ৩টি (বাল্মীকি-প্রতিভা, কালমৃগয়া, মায়ার খেলা)। নৃত্য নাট্য ৩টি (চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, শ্যামা)। প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০। পরবর্তীতে মুদ্রিত চিঠিপত্র ৫,০০০-এর বেশি (যা ছিন্নপত্র, চিঠিপত্র সহ বিভিন্ন খণ্ডে সংকলিত)। শিশুতোষ রচনা প্রায় ২০টির মতো স্বতন্ত্র গ্রন্থ (যেমন সহজ পাঠ, ছড়া, শিশু ভোলানাথ ইত্যাদি)। এ শুধু তাঁর মৌলিক লেখা, এর বাইরে দান্তে, গ্যেটে, ভিক্টর হুগো, শেলী, ব্রাউনিং এবং হাইনের বেশ কিছু কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। নিজের লেখা গোটা দশেক গল্প, উপন্যাস নাটক ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন। সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন।

৭০ বছর বয়সে ছবি আঁকতে শুরু করে হাজার দেড়েক ছবি এঁকেছেন। প্যারিসে, বার্লিনে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। গানে পাশ্চাত্য ও ধ্রুপদী সুরের মিশেলে এক নতুন ধারা (রবীন্দ্রসংগীত) তৈরি করেছেন। এছাড়া মণিপুরী ও কত্থক নৃত্যের সমন্বয়ে তিনি 'রবীন্দ্রনৃত্য' নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ঘরানা শান্তিনিকেতনে প্রবর্তন করেছেন। একটি আস্ত বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন। ধর্মীয় কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লিখেছেন, অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। কৃষির উন্নয়নে, সমবায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মাত্র ৩% সরল সুদে ঋণ দিতে কৃষকের জন্য তৈরি করেছেন কৃষি ব্যাংক। একটা সিনেমা নির্মাণে বেশ খানিকটা এগিয়ে বয়সের কারণে ক্ষান্ত দিয়েছেন।

বিশ শতকের যেসব নোবেল লরিয়েট সাহিত্যিকদের নামে বাংলার রবীন্দ্রবিদ্বেষী বুদ্ধিজীবীরা আছাড় খায়, যেমন, ডাব্লিউ বি ইয়েটস বা এজরা পাউন্ড রবীন্দ্রনাথের বিশ্বব্যাপী পরিচিতির পেছনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফরাসি মনীষী ও নোবেল বিজয়ী রোমাঁ রোলাঁ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের আত্মার আত্মীয়। জর্জ বার্নার্ড শ, আলবেয়ার কামু, আঁদ্রে জিদ ছিলেন রবীন্দ্র প্রতিভার গভীর গুণমুগ্ধ। কবি পাবলো নেরুদা তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'Twenty Love Poems and a Song of Despair'-এর ১৬ নম্বর কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের 'গার্ডেনার' (ক্ষণিকা) কাব্যের ৩০ নম্বর কবিতার ভাবানুসরণে লিখেছিলেন, এবং তিনি প্রকাশ্যেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন। কবি ওক্তাবিও পাস তাঁর 'In Light of India' বইতে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এর সবগুলোই ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ওঠাবসা। পাশ্চাত্য তাঁকে গ্রহণ করেছে সুফি-সন্ত-মরমী কবি হিসেবে। পৃথিবীর অন্তত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ শহরে তাঁর নামে সড়ক, প্রতিকৃতি বা প্রাঙ্গণ আছে।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ‘প্রফেশনাল বেস্টসেলার’ শরৎচন্দ্র, যিনি রয়্যালটির টাকায় আমেরিকান ব্র্যান্ডের দামি স্টুডিবেকার গাড়ি চালাতেন, সাউথ ক্যালকাটায় বাড়ি বানিয়েছিলেন, ১৯৩১ সালে তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে (যা পরে তাঁর ‘স্বদেশ ও সাহিত্য’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে) লিখছেন: 'রবীন্দ্রনাথের দান শুধু যে আমাদের বাংলাভাষা ও সাহিত্যের সম্পদ বাড়িয়ে দিয়েছে তা নয়, তিনি আমাদের দৃষ্টিকেও প্রসারিত করেছেন। আমরা যারা সাধারণ লেখক, তারা সাধারণ পাঠকের মনের কথা লিখি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যা লেখেন তা আমাদের মতো লেখকদের কাছেও বিস্ময় এবং শিক্ষার বিষয়।'

লেখক মোজাফ্ফর হোসেন তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লিখেছেন, 'আমাদের রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য বা ম্যুরাল সিওল, লন্ডন, বেইজিং, ডাবলিন, মস্কো, বেলজিয়াম, হাঙগেরিসহ পৃথিবীর অনেক দেশ ও শহরে আছে। রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, তুরস্ক প্রভৃতি শহরে তার নামে প্রতিষ্ঠান ও সড়কের নাম আছে।

শেকসপিয়ারের জন্মস্থানের বাগানে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য আছে। সেই ভাস্কর্যে শেকসপিয়ারকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা একটা কবিতা বাংলা ও ইংরেজিতে খোদাই করা আছে।

আর কোনো বাঙালি তো দূরে থাক, ভারতীয় উপমহাদেশের আর কেউ রবীন্দ্রনাথের জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। তলস্তয় শেকসপিয়ার যেমন আমাদেরও সম্পদ, রবীন্দ্রনাথও তেমন গোটা বিশ্বের। world intellectual heritage তিনি।

আর ওরা আমাদের নিজেদের রবীন্দ্রনাথকে মুছে দেবে! কতটা মূর্খ হলে এইটা চিন্তা করতে পারে!!!

এইবার বলি, বাঙালিকে বিশ্ব চিনেছে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। এরপর সত্যজিৎ রায়। এরা বিশ্ব বাঙালির সাংস্কৃতিক আইকন। তাঁরা এই উপমহাদেশের কালেক্টিভ সম্পদ।'...

১৯৪১ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একাত্তরে জন্মলাভ করা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিলেন! তাই চুনকালি মাখতে হবে। আর গণহত্যা, স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধিতার প্রতীক গোলাম আজম দলবলসহ সর্বান্তকরণে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন তাই তাদের পক্ষে থাকতে হবে। ওরে আমার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী জেনজিরে? তোমরা কার জন্ম নির্নয় না জানি।

তোমাদেরকে একটা বুদ্ধি দেই। রবীন্দ্রনাথকে তোমরা বাংলাদেশ থেকে একদম শিফ্ট ডিলিট করে দিতে পারবে। কেমনে? বাংলা ভাষাটা তুলে দিয়ে সর্বস্তরে আরবি, উর্দু বা তোমাদের মনমর্জি মতো হাবিজাবি একটা কিছু বসিয়ে নাও।

যতদিন বাংলা ভাষা পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব ধরে রাখবে -তোমাদের বাপ দাদা চৌদ্দপুরুষের সাধ্য নাই রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলে। তুমি যতক্ষণ বাংলা ভাষায় কথা বলবে -মনে রাখবে ঠিক ততক্ষণ ধরেই প্রতিটা হরফে হরফে রবিঠাকুর আর বিদ্যাসাগরের নাম নিতে থাকবে।

বাংলাদেশের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগর, সত্যজিৎ রায় সসম্মানে থাকবেন। না থাকলেই বা কী? অক্ষমতার অবসেশনে ভোগা অসার প্রতিক্রিয়াশীলদের ভুয়া দরবারে মানবসভ্যতার বাঁক বদলে দেয়া জ্ঞানীগুণীরা আসতে যাবেন কোন দুঃখে?

লেখক: সাংবাদিক

১০ অক্টোবর ২০২৬

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login