শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও রাষ্ট্র মানিক পশারীকে অন্তিম গার্ড অব অনার দিয়েছে। এতে তিনি যে গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা সেটি আরেকবার প্রমাণিত হলো। এখন বলেন যে মাটিতে একজন স্বীকৃত কোলাবোরেটর ও আদালতে দণ্ডিত মানবতাবিরোধী অপরাধীর মরদেহ সসম্মানে বহাল আছে সেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার কবর কেন হতে দেয়া যাবে না?
মৃত্যুর পর মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুর উপজেলা চত্বরে নেয়া হয় গার্ড অব অনারের জন্য। সেখানে মব ভায়োলেন্সের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় ৫ ঘন্টা অপেক্ষার পর পুলিশ লাইন্সের ভিতরে গোপনে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতাধর পাবলিক নুইসেন্সকে না চেতিয়ে এই কাজটুকু করেছে -এটাই রাষ্ট্রের সার্থকতা। কাঠামোবদ্ধ রাষ্ট্র তার মুক্তির পক্ষে কাজ করা একজন নাগরিককে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়িয়ে যথোচিত সম্মান দিয়েছে।
কিন্তু কবর দিতে বাধা দিয়েছে এমন একটি গোষ্ঠী যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আমলনামা এই রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে বাতিল করেনি।
আদালতের দণ্ডাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি বলা আইনগতভাবে যথার্থ। তাঁর মৃত্যুতে কারাবাসের অবসান ঘটেছে; কিন্তু মৃত্যু নিজে থেকে দণ্ডাদেশ বাতিল করে না। আদালত যদি পরবর্তীকালে উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ায় সেই দণ্ডাদেশ বাতিল করত, তাহলে তাঁর আইনি অবস্থার মূল্যায়ন ভিন্ন হতো। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েও বলা হয়েছে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ায় বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তা কার্যকর থাকে।
সাঈদীর মতো কাউকে তাঁর অপরাধের জন্য দায়ী বলা যায়, কিন্তু সেই দায়কে ব্যবহার করে তাঁর মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত নয়।একইভাবে, মানবিক মর্যাদা রক্ষার নামে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত অপরাধের ইতিহাস মুছে ফেলাও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই দুইয়ের ভারসাম্যই আইন ও নীতিবিদ্যার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইমানুয়েল কান্টের নীতিদর্শনে মানুষকে নিছক কোনো উদ্দেশ্য পূরণের উপকরণ হিসেবে দেখা যায় না; প্রত্যেক মানুষকে স্বতন্ত্র মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একজন দণ্ডিত ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তাঁর মর্যাদা স্বীকার করার অর্থ তাঁর অপরাধকে অস্বীকার করা বা অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের কষ্টকে তুচ্ছ করা নয়।
অর্থাৎ, মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং তার অপরাধের নৈতিক নিন্দা করা -দুটিই একসঙ্গে সম্ভব।
ক্ষমা ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয় হতে পারে। কিন্তু কাউকে ক্ষমা করা বাধ্যতামূলক নয়, আর ক্ষমা করলেই ঐতিহাসিক সত্য মুছে যায় না।
বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর ঘটনায় ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার ও সমাজের স্মৃতি এবং ন্যায়বিচারের দাবি বিবেচনায় নিতে হয়।
সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ৮৭ বছর বয়সে মারা গেলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি একরকম আত্মগোপনে থেকে জীবন থেকে বিদায় নিলেন। কাউকে তার কবরের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি সাঈদীর অনুসারীরা। পশারীর বাড়ির তিন নারী সদস্য গভীর রাতে মোবাইলের টিমটিমে আলোয় প্লেট দিয়ে কবর খুঁড়ে তাদের স্বজনকে সমাধিস্থ করেছেন। একজন মুসলিমের জানাজা এবং কবরস্থ করবার যে ধর্মীয় রিচুয়াল এবং বাধ্যবাধকতা -সেসব কোনোটাই করতে দেয়নি ক্ষমতাধর লোকজন।
এতে আলটিমেটলি কী হলো? ক্ষমতা তো চিরকাল থাকে না। মৃত্যু ও পতন অনিবার্য সত্য। মিস্টার সাঈদীর কবরকে ভবিষ্যতে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়া ছাড়া আর কি উপকার সাঈদীর অনুসারীদের হলো -আমরা জানি না। মৃতের প্রতি আক্রোশ দেখানো সভ্য মানুষের কাজ নয়। পশারীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া স্বাভাবিক ছন্দে চলতে দিয়ে জামায়াত কি মহানুভবতা দেখাতে পারত? না পারত না। একাত্তর দেখিয়েছে তাদের রাজনৈতিক হিংস্রতা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং প্রতিক্রিয়া ঠিক কী ধরণের হতে পারে। বরং মানিক পশারীর পরিবার এই বলে সান্ত্বনা পেতে পারে যে, তাদের স্বজনের মরদেহ চৌরাস্তার মোড়ে ছুঁড়ে ফেলে সবার সামনে উদ্দাম নৃত্য করতে করতে জ্বালিয়ে দেয়নি।
প্রতিহিংসায় রাজনৈতিক ফায়দা বয়ে আনে না। বাহাত্তরের সংবিধান সমুন্নত না রাখতে পেরে বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে বড় খেসারত দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একাত্তরের সত্যিকারের চেতনায় অটল থাকলে তো এই দেশ এমন উগ্র ডানপন্থীদের উর্বর ভূমি হয়ে উঠতে পারত না। এভাবে সহজিয়া ও সুফিধারার মুসলিমরা কোণঠাসা হয়ে যেত না। লালন -রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হতো না। সুতরাং আজকের মানিক পশারী ও তার পরিবারের এমন বিয়োগান্তক পরিণতির বড় দায় আওয়ামী লীগ, মুজিব ও শেখ হাসিনারও। ৫ আগস্টের পর ধর্মবিপ্লবী নেতারা প্রায় সবাই ছাত্রলীগের পকেট থেকেই বের হয়েছে। কে জানে অনেক প্রায়শ্চিত্ত শেষে আবার আওয়ামী লীগ ফিরলে এই বিপ্লবীরাই হয়ত হয়ে যাবে সেদিনের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দণ্ডমুণ্ডের প্রধান কর্তা।
মুক্তিযোদ্ধার কবর নিয়ে জামায়াত যা করল -সরকার এটা হয়ত দেখেও না দেখার ভাণ করেছে। এটা তাদের রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি। সাঈদীর অনুসারীরা আরো আগে আগে কী কী করতে পারে তার একটা নজির তৈরি হয়ে গেল। এর ফল কাকে কোনদিকে ডোবায় -তা বলবে ভবিষ্যত।
তবে আজকে রাতের আঁধারে মোবাইলের আলোয় প্লেট দিয়ে তিন নারী যে কবর খুঁড়লেন -একদিন হয়ত অমন তিন নারীই ফিনিক্স পাখি হয়ে আরেকটা কবর খুঁড়ে চন্দ্রাবলী উৎসব পালন করবেন। সূর্য হাতে ধ্বংস করে দেবেন ইকারুসের কৃত্রিম মোমের ডানা। এবং এই এনার্কিজম ও কেওয়াজ বাংলাদেশে চলতেই থাকবে। এটা পরম্পরা, এটাই কর্মা!
ইসলামিজমে মানুষকে স্রষ্টার দূত উল্লেখ করে মৃতের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা মায়িদার ৩১ আয়াতে কাবিল ও হাবিলের কাহিনিতে এ সম্মানের গুরুত্ব ফুটে ওঠে। কাবিল তাঁর ভাই হাবিলকে হত্যার পর তাঁর দেহ কীভাবে সৎকার করতে হবে, তা জানতেন না। আল্লাহ তখন একটি কাক পাঠান, যে মাটি খুঁড়ে আরেকটি কাককে কবর দেয়। আল্লাহ এভাবেই কাবিলকে শিখিয়ে দেন, কীভাবে তাঁর ভাইয়ের দেহ সমাহিত করতে হবে।
ইসলামি আইনে মৃতদেহের সৎকার একটি সম্মিলিত দায়িত্ব (ফরজে কিফায়া), যার অর্থ মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য এ দায়িত্ব পালন করলে সবাই এর দায় থেকে মুক্ত হন। যদি কেউই এ দায়িত্ব পালন না করে এবং তা সমাজের জ্ঞান বা সামর্থ্যের বাইরে না হয়, তবে সবাই এর জন্য দায়ী থাকবে। জানি না মাওলানা সাঈদীর অনুসারীরা প্রতিশোধস্পৃহাকে বেপরোয়া গতিতে বাড়তে দিয়ে কোন ধর্ম পালন করলেন? মৃতের মরদেহ কিংবা তার কবর নিয়ে রাজনীতিতে বর্বরতা ছাড়া -মানবিক কোনো নৈতিকতা নাই।
গ্রিক ট্রাজেডি অনেকেরই জানা আছে। সাড়ে তিন হাজার বছর আগের গ্রিক পুরাণেরই যেন পুনর্মঞ্চায়ন হলো আমাদের আজকের বাংলাদেশের! সোফোক্লিসের ধ্রুপদি গ্রিক ট্র্যাজেডি 'আন্তিগোনে'তে রাজা ক্রেয়নের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভাই পলিনিসেসের মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে এগিয়ে যান আন্তিগোনে। তাঁর কাছে রাজার আদেশের চেয়ে বড় ছিল দেবতাদের অলিখিত, চিরন্তন বিধান; মৃতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, জীবিত মানুষের এক অনিবার্য নৈতিক দায়। ক্ষমতার রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়েও তাই তিনি মৃতের মর্যাদা রক্ষার অধিকার থেকে সরে আসেননি।
পুরাণ তো আসলে জীবনেরই আয়না -যুগ বদলায়, ভূগোল বদলায়, অথচ ক্ষমতা ও বিবেকের সংঘাত, রাষ্ট্রের নিষেধ আর মানুষের নৈতিক দায়ের প্রশ্নগুলো একই থেকে যায়। বাংলাদেশের গল্পেও আজ সেই প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির ছায়া যেন নতুন করে দীর্ঘ হচ্ছে। সময়ের বুকে এই চিহ্নটুকু রাখা থাক -হয়তো ভবিষ্যত একদিন এর প্রকৃত ভাষা ঠিকঠাক খুঁজে নেবে।
লেখক: সাংবাদিক
২৬ অক্টোবর ২০২৬