১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বিপ্লব সম্পর্কে বলা হয়—‘সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহী-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা। ৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি’। জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। এদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহী-জনতা আলিঙ্গন করেছে একে অপরকে। নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ধ্বনিতে ফেটে পড়ে তারা। সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবে ভণ্ডুল হয়ে যায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী সব ষড়যন্ত্র। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন রাজপথে। সাধারণ মানুষ ট্যাংকের গলায় পরিয়ে দেয় ফুলের মালা। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব শহর-নগর-গ্রামেও পৌঁছে যায়।’
সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান দিবসটিকে এভাবে মুল্যায়ন করেছেন-
১৫ আগস্ট (১৯৭৫) জাতীয় ইতিহাসের মসিলিপ্ত এক মহাকলঙ্কিত দিন। সেদিন মধ্যরাতে এক হৃদয়বিদারক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রক্তমাখা হাতে তাঁরই দলের এক শীর্ষ নেতা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নেন আকস্মিক ও অতর্কিতে। সামরিক শাসন জারি হয়। জারি করেন কোনো সামরিক ব্যক্তিত্ব নয়, সোজাসাপ্টা কথায় ক্ষমতালিপ্সু ষড়যন্ত্রকারী দলীয় রাজনৈতিক চক্র। গভীর এক অনিশ্চয়তা, এক মহাঅস্থিরতা নেমে আসে সারা দেশে। স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীতেও এর অভিঘাতের ঢেউ আছড়ে পড়ে।
আমরা দেখেছি ১৯৭৫-এর নভেম্বরের শুরুর দিনগুলোয় দেশে এক চরম নৈরাজ্য, নৈরাশ্য, এক সীমাহীন হতাশা। অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা গোটা জাতিকে সংকটাপন্ন করে তোলে। একটা ভয়ঙ্কর ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। দেশ তখন সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন। কোনো সরকার নেই। প্রশাসন নেই। কোনো যোগাযোগ নেই। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে কোথায় যেন ছিটকে পড়েছে। হারিয়ে গেছে। এরই পটভূমিকায় ৭ নভেম্বরে গোটা দেশজুড়ে ঘটে সৈনিক-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান। জাতির ভাগ্যাকাশে এ ছিল কঠিন যুগসন্ধিক্ষণ— এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কবিতার ভাষায়—
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।
... না নৌকাডুবি হয়নি। জিয়া অদম্য সাহসের সঙ্গে বজ্রকঠিন শক্ত হাতে সেই উত্তাল সমুদ্রে নোঙরবিচ্ছিন্ন ডুবুডুবু তরীটির হাল ধরেন।
১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীতে পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পট পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। বিএনপি দিনটিকে 'জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস' হিসেবে পালন করে। অন্যরা ভিন্ন নামে পালন করে।
৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এইদিন তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ফিরে আসেন এবং নিজেকে রাষ্ট্রক্ষমতার ভরকেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
ঐতিহাসিক দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন প্রথম আলোকে বলেছেন, সেদিন বন্দী তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সিপাহি-জনতা ও সর্বস্তরের মানুষ এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্ত করে এনেছিলেন। দেশের মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও আবেগ ধারণ করে জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশে ঐক্য, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
দুঃখজনক হলেও সত্যি জাতীয় ইস্যুতে বরাবর বিভাজিত দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অন্য ইতিহাসের মতোই ঐতিহাসিক এই দিনটি নিয়েও একমত হতে পারেনি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা দিনটিকে 'সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস' হিসেবে পালন করে। বর্তমান জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দিনটিকে 'জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস' এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) 'সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান' হিসেবে পালন করছে। অপরদিকে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও গণরোষে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগসহ তাদের সমমনা কয়েকটি দল দিনটিকে 'মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস' হিসেবে পালন করেছিল।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা বাণী দিয়ে ভবিষ্যতে কেউ যাতে দেশ ও জনগণের অধিকার হরণ এবং দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই এবারের ৭ নভেম্বরের অঙ্গীকার হওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন। এ উপলক্ষে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ৭ দিনের কর্মসূচিতে থাকছে আলোচনা সভা, পোস্টার সাঁটানো ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ।
৭ নভেম্বরের পটভূমি এবং আদ্যোপান্ত বুঝবার জন্য মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী-র লেখা বই এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক (১৯৭১-১৯৮১) পাঠ করা যেতে পারে।
অভ্যুত্থানে বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে জিয়াউর রহমান নিজের সাহসিকতা দিয়ে দ্রুত নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে যেটি তাঁকে রাজনৈতিক পাদপ্রদীপে নিয়ে আসে।
ইতিহাসের সিলেকটিভ পাঠ আলাদা কোনো মাহাত্ম্য তৈরি করে না। বরং অতীতে ঘটে যাওয়া সামগ্রিক ঘটনার নির্মোহ বিশ্লেষণের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে বর্তমানের চিন্তকদের শেখাটা পরিপূর্ণ হয়। আপনি ৭ নভেম্বরের মহিমা বাতিল বলে গণ্য করে অপরপক্ষকে ৩ নভেম্বরের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে বলতে পারবেন না। আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও -এই আপ্তবাক্য রপ্ত না করলে বিভাজন দূর হবে না। আমি আমার প্রতি অপর মানুষের আচরণ যেমন দেখতে চাই -ঠিক তেমন আচরণটাই পরের জন্য কেন করব না?
বাংলাদেশে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ছিল। তেমনি এই দেশে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট এসেছে। এসেছে একাশির ৩০ মে। এই দেশের ৭ নভেম্বর ও ৫ আগস্টও আছে। প্রত্যেকটি ঘটনার আলাদা তাৎপর্যের এক ঐকতান নিয়েই বাংলাদেশ। বহুত্ববাদী সেই বাংলাদেশে ৫১ বছরের মতো আজও ৭ নভেম্বর এসেছে।
▪️
ফারদিন ফেরদৌস
৭ নভেম্বর ২০২৬
Comments
Be this story’s first reader
+20 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.