বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ঘিরে একের পর এক রহস্য ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে আসছে। বন্ধু দীপের দাবি, কিছু লোকের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন, আর তিনি নিজে পালিয়ে আসেন। পিবিআইয়ের ধারণা, ধাওয়াকারীরা মাদক কারবারি হতে পারে। অন্যদিকে তাহসিফের বাবা বলছেন, তাঁর ছেলে সাঁতার জানতেন, বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণেও সুইমিংয়ের সনদ অর্জন করেছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সাঁতার জানা একজন প্রশিক্ষিত সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা কী পরিস্থিতিতে নদীতে ডুবে মারা গেলেন?
এর মধ্যে মাহমুদুর রহমানের আমার দেশ পত্রিকা তাঁকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করে। আবার পুরোনো সরকারি নথিতে কর্মস্থলে অ্যাডাল্টারি বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগে তাঁকে ও তাঁর পার্টনারকে চাকরিচ্যুত করার তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাঁর মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করে না।
চাকরি কেন গেছে, ব্যক্তিগত জীবনে কী করেছেন, কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল -এসবের সঙ্গে মৃত্যুরহস্যকে গুলিয়ে ফেলা বিপজ্জনক। একইভাবে সাঁতার জানতেন বলে তিনি ডুবতে পারেন না, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, দীপের বক্তব্যের অসংগতি, ধাওয়াকারীদের পরিচয়, মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট না থাকা, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, ময়নাতদন্ত ও বিষতাত্ত্বিক পরীক্ষার ফল নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা।
তাহসিফ আত্মহত্যা করেছেন, দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, নাকি তাঁকে হত্যা করা হয়েছে -কোনোটিই এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। একজন মানুষের অতীত, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে তাঁর মৃত্যুর বিচার করা যায় না।
তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি ফৌজদারি কোনো অপরাধে অপরাধী হয়ে থাকতেন তার জেলে থাকবার কথা কিংবা জামিনে থাকবার কথা -সেসব কিছুই জানা যাচ্ছে না।
খতিয়ে দেখা উচিত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং তথা 'র' এর এজেন্ট বানানোর সাথে তার এই অপমৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কিনা? তার আইডি থেকে প্রচারিত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে প্রস্থান করবার ভিড্যু ভাইরাল হয়েছিল। ওতে কার লাভ, কার ক্ষতি হয়েছিল? তাহসিফ কি এমন কোনো গুরুতর তথ্য আগলে রাখছিলেন -যেটি ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল? এটাও কি ওসমান হাদির মতো কোনো কেইস?
আমরা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো টেনে লম্বা করা কোনো পৌনঃপুনিক বয়ান চাই না, চাই স্বল্পতম সময়ে অনুপুঙ্খ প্রমাণ। কোনো আলগা অপপ্রচার নয়, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত। তিনি যদি দাগী অপরাধীও হয়ে থাকতেন তার স্বজনদের জানবার অধিকার আছে -কোন প্রেক্ষিতে কী অবস্থায় তাহসিফ সাউরি মারা গেলেন? রাষ্ট্রযন্ত্র চাইলে ঘটনার চরম অমাবস্যাতেও যথার্থ দিবালোক এনে দিতে পারে।
আমাদের মেমোরি গোল্ডফিশের চেয়েও সুপারসনিক। শাহজালাল রুমিকে এক নিমিষেই ভুলিয়ে দিয়েছে কে এম তাহসিফ সাউরি। মিস্টার সাউরিও মাত্র কয়েকটা দিন ফেসবুক ফিডে থাকবে। তারপর হাওয়া।
▪️
লেখক: সাংবাদিক
৩০ অক্টোবর ২০২৬