রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোট করে দেখার জন্য তাঁর বিরোধিতা করার প্রয়োজন নেই; বরং নিজের চিন্তাকে বড় করে তোলার জন্য তাঁর সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের প্রয়োজন আছে।
রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখার মধ্যেই এমন অনেক ভাষ্য ও ভাবনা আছে, যেখানে তিনি নিজের অহংকার ভেঙে দিতে, নিজেকে আড়াল করতে, মাথা নত করতে এবং ব্যক্তিগত গৌরবের ঊর্ধ্বে উঠতে চেয়েছেন। গীতাঞ্জলিতে কবি তাইতো লিখেছেন-
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে,
তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও প্রশ্নহীন আনুগত্যের পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যতম শক্তি ছিল প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, নিজের চিন্তাকে পরিমার্জন করা এবং মানুষের মুক্তবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখা।
তাই তাঁকে শ্রদ্ধা করার সর্বোত্তম উপায় তাঁর চারপাশে অন্ধ ভক্তির প্রাচীর না তুলে -তাঁর চিন্তার সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করা। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাঁর কাছ থেকে শেখা যায়। এমনকি তাঁর কোনো ধারণাকে অতিক্রম করাও সম্ভব -যদি সেই অতিক্রমের পেছনে যুক্তি, জ্ঞান ও নতুন সৃষ্টির শক্তি থাকে।
রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করতে তাঁর সমকক্ষ হওয়ার শর্ত নেই; কিন্তু তাঁকে সামগ্রিকভাবে খারিজ করতে গেলে তাঁর বিপুল সৃষ্টিকর্ম ও চিন্তার জগতের মুখোমুখি হওয়ার দায় এড়ানো যায় না।
রবীন্দ্রবিরোধিতার চেয়ে রবীন্দ্রচর্চা অনেক বেশি জরুরি; রবীন্দ্রনাথকে গালমন্দ করার চেয়ে তাঁর সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। কারণ নিন্দা করে একজন মনীষীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা বুঝে নতুন চিন্তা নির্মাণ করা যায়।
রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার আগে রবীন্দ্রনাথকে ভালোভাবে জানতে হবে। তাঁর নিন্দা করে তাঁর উচ্চতা কমানো যাবে না; বরং নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যই প্রকাশ পেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ প্রজ্ঞা অর্জন না করলেও যে কেউ তাঁর সমালোচনা করতে পারেন। সমালোচনার অধিকার অর্জনের জন্য রবীন্দ্রনাথের সমান জ্ঞানী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, সমালোচনাটি কতটা তথ্যনিষ্ঠ, যুক্তিনির্ভর, প্রাসঙ্গিক ও গভীর। একজন সাধারণ পাঠকের আপত্তিও মূল্যবান হতে পারে, যদি তা যুক্তিসংগত হয়। আবার একজন পণ্ডিতের সমালোচনাও দুর্বল হতে পারে, যদি তা বিদ্বেষ কিংবা পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়ায়।
ভারতীয় রাষ্ট্রের কোনো নীতি বা আধিপত্যবাদী আচরণের সমালোচনা করা যায়। কিন্তু তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে এক করে দেখা যুক্তির বিচারে দুর্বল অবস্থান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভারতীয় কবি আখ্যা দিয়ে যারা তাঁর সাহিত্যকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান, কিংবা দেয়াল থেকে তাঁর গ্রাফিতি মুছে দিয়ে কথিত রাবীন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন, তাঁদের কাছে আমাদের কয়েকটি প্রশ্ন আছে।
রবীন্দ্রনাথকে মুছে দিয়ে কি রবীন্দ্রনাথকে পরাজিত করা যায়? দেয়াল থেকে তাঁর মুখ মুছে ফেলা যাবে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার থেকে তাঁকে মুছে ফেলা কীভাবে সম্ভব? আর যদি তাঁর চিন্তার মধ্যে সত্যিই কোনো আধিপত্যবাদী প্রবণতা থাকে, তবে সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে আপনাদের যুক্তি কোথায়, বিকল্প চিন্তা কোথায়, নতুন সৃষ্টির শক্তি কোথায়?
রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা হতেই পারে। তিনি কোনো প্রশ্নাতীত দেবতা নন। তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের বিচার করা কিংবা তাঁর সাহিত্যিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক করাও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ। কিন্তু সমালোচনা আর বিদ্বেষ এক নয়; প্রশ্ন তোলা আর মুছে ফেলা এক নয়। একজন কবির চিন্তাকে পরাজিত করতে হলে তাঁর চেয়ে শক্তিশালী চিন্তা নিয়ে আসতে হয়। তাঁর সাহিত্যকে অতিক্রম করতে হলে তার চেয়ে গভীর সাহিত্য সৃষ্টি করতে হয়। কেবল তাঁর নাম মুছে দিয়ে নিজের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা যায় না।
রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ ভারতের মানুষ ছিলেন, তাঁর জন্ম বর্তমান ভারতের ভূখণ্ডে। এই ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে কেবল ভারতীয় জাতীয়তার খোপে বন্দি করা ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রবহমানতাকে অস্বীকার করারই শামিল।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তাঁরই রচনা। এই গান আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করার অর্থ ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি গ্রহণ করা নয়; যেমন ভারতীয় রাষ্ট্রের কোনো আধিপত্যবাদী আচরণের বিরোধিতা করার অর্থ রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যাখ্যান করা নয়। রাষ্ট্র আর সাহিত্য এক বস্তু নয়, ভূরাজনীতি আর সৃষ্টিশীলতার পরিসরও এক নয়।
আমাদের বক্তব্য খুব সরল। রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু তাঁকে অপছন্দ করার অধিকার যেমন আছে, তেমনি তাঁর সাহিত্যকে বোঝার বুদ্ধিবৃত্তিক দায়ও রয়েছে। কেউ তাঁর সমালোচনা করলে আমরা তাঁর যুক্তি শুনতে চাই। কেউ তাঁকে অতিক্রম করার দাবি করলে আমরা তাঁর নতুন সৃষ্টি দেখতে চাই। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন, একটি দেয়াল থেকে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মুছে দিয়েই তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ওপর বিজয় অর্জন করেছেন, তাহলে তাঁর কাছে আমাদের বিনীত প্রশ্ন- রবীন্দ্রনাথকে মুছে দেওয়ার আগে আপনি তাঁর সমকক্ষ কোনো চিন্তা নির্মাণ করেছেন কি? তাঁকে অতিক্রম করার মতো কোনো সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন কি? নাকি নিজের অক্ষমতাকেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে উদ্যাপন করছেন?
রবীন্দ্রনাথকে মুছে নয়- তাঁর সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করুন। রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলার আগে তাঁকে অতিক্রম করার যোগ্যতা অর্জন করুন। দেয়াল থেকে একজন কবির মুখ মুছে ফেলা যায়, কিন্তু তাঁর সমকক্ষ চিন্তা নির্মাণের অক্ষমতা কোনো গ্রাফিতি দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।
আমরা রবীন্দ্রনাথকে কোনো অবস্থাতেই রক্ষা করতে চাইছি না -চাইছি শুধু একটা বৌদ্ধিক মানদণ্ড দাঁড় করাতে। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ৮ দশকের সাধনা, ব্রতচারিতা ও কৃতকর্মই তাঁর একমাত্র রক্ষাকর্তা।
কাউকে অপছন্দ করা যায়, তাঁর সমালোচনা করা যায়, এমনকি তাঁকে অতিক্রম করার স্বপ্নও দেখা যায় -কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রমাণ দিতে হয় নিজের চিন্তা ও নবতর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে আরো ভালো করে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সেবা করে দেখান -আপনাকে আমরা সবাই সমভিব্যাহারে কেন কুর্ণিশ করব না?
লেখক: সাংবাদিক
১১ অক্টোবর ২০২৬