Article

৪০ এ প্রথম বই (Sherwood Anderson) পর্ব_৪

September 22, 2026

8
View

Biography

নিজেকে এখনো লেখক বলতে পারি না। অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে। আমার প্রথম এবং একমাত্র বই প্রকাশিত হয় আমার ৪০ বছর বয়সে। তাই খুব জানতে ইচ্ছে করছিল যে ৪০ বছর বয়সে থ্রিলার লেখকরা কেমন ছিলেন। পড়েছি, জেনেছি এবং জানাতে চাচ্ছি। ১০ জন লেখক এলোমেলো ভাবে বাছাই করেছি। তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী চেষ্টা করবো তুলে ধরতে।

সিরিজের নাম দিলাম “৪০ এ প্রথম বই”…

#পর্ব_৪

*******

শেরউড অ্যান্ডারসন: ছোট শহরের অন্ধকারের কথাশিল্পী

Sherwood Anderson (1876–1941)

আমেরিকান সাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কোনো নতুন দেশ বা কল্পিত রাজ্য নয়, বরং মানুষের ভেতরের অদৃশ্য পৃথিবী। শেরউড অ্যান্ডারসন ছিলেন তেমনই একজন লেখক। তিনি বড় যুদ্ধের মহাকাব্য লেখেননি, রাজপ্রাসাদের কাহিনি লেখেননি; বরং ছোট শহরের দোকানদার, শিক্ষক, শ্রমিক, একাকী নারী, ব্যর্থ পুরুষ, অপূর্ণ প্রেম আর সমাজের চোখে অদ্ভুত হয়ে ওঠা মানুষদের নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল তার নিজের ভেতর। এই কারণেই Winesburg, Ohio শুধু একটি ছোট শহরের গল্প নয়; এটি নিঃসঙ্গতা, আকাঙ্ক্ষা, দমিত যৌনতা, ভালোবাসা, ব্যর্থতা এবং মানুষের না-বলা কথার এক গভীর মানচিত্র।

শেরউড অ্যান্ডারসনের জন্ম ১৮৭৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের Camden নামের ছোট শহরে। তাঁর বাবা Irwin McClain Anderson ছিলেন নানা ধরনের কাজ করা এক সংগ্রামী মানুষ; মা Emma Jane Smith পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে বাড়তি কাজ করতেন। তাঁরা ছিলেন সাত সন্তানের পরিবার, আর শৈশবের বড় অংশ Anderson কাটিয়েছেন Ohio-র Clyde শহরে। পরিবারটি স্বচ্ছল ছিল না। অল্প বয়সেই Anderson বুঝে যান, জীবন মানে শুধু স্বপ্ন দেখা নয়, টিকে থাকার জন্য কাজ করাও।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কল্পনাপ্রবণ এবং মানুষের প্রতি কৌতূহলী। তাঁর মা তাঁর কল্পনাশক্তিকে উৎসাহ দিতেন এবং মানুষের বাইরের আচরণের নিচে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো দেখতে শেখাতেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন তাঁকে প্রায় ১৪ বছর বয়সেই স্কুল ছাড়তে বাধ্য করে। তিনি newsboy, stable boy, house painterসহ নানা কাজ করেছেন। ফলে তাঁর শিক্ষা শুধু স্কুলের বই থেকে আসেনি; রাস্তা, কারখানা, দোকান, ছোট শহর এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনই হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।

১৮৯৫ সালে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। পরের বছর তিনি Chicago-তে চলে যান। দিনে কাজ করতেন, রাতে business course করতেন। ১৮৯৮ সালে Spanish-American War-এর সময় তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন এবং Cuba-তে যান, যদিও তাঁর ইউনিট যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে সেখানে পৌঁছেছিল। Ohio-তে ফিরে এসে তিনি Wittenberg Academy-তে পড়াশোনা শেষ করেন।

তারপর শুরু হয় তাঁর ব্যবসায়ী জীবন। Chicago-তে advertising copywriter হিসেবে কাজ করার পর তিনি Ohio-তে ফিরে গিয়ে নিজের ব্যবসা গড়ে তোলেন। একসময় তিনি যথেষ্ট সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, Sherwood Anderson তাঁর ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি বুঝতে থাকেন, এই জীবন তাঁর জন্য নয়।

১৯০৪ সালে তিনি Cornelia Pratt Lane-কে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন সন্তান ছিল—Robert Lane, John Sherwood এবং Marion। পরিবার, ব্যবসা ও সামাজিক দায়িত্বের মাঝখানে Anderson-এর ভেতরের লেখক ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছিলেন। তিনি রাতে fiction লিখতে শুরু করেছিলেন।

১৯১২ সালের নভেম্বর মাসে সেই দ্বন্দ্ব ভয়াবহ রূপ নেয়। Cleveland-এ নিজের অফিস থেকে তিনি হঠাৎ বেরিয়ে যান এবং কয়েক দিন এক ধরনের বিভ্রান্ত অবস্থায় শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। পরে হাসপাতালে তাঁকে নেওয়া হয়। ঘটনাটিকে জীবনীকারেরা nervous breakdown হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৯১৩ সালে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের ছেড়ে Chicago-তে ফিরে যান। এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং বেদনাময় সিদ্ধান্তগুলোর একটি, কিন্তু একই সঙ্গে এটিই ছিল তাঁর সাহিত্যিক পুনর্জন্ম।

Chicago-তে এসে তিনি Theodore Dreiser, Floyd Dell, Carl Sandburg এবং অন্যান্য লেখকের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯১৬ সালে Cornelia-র সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় এবং চার দিন পর তিনি Tennessee Claflin Mitchell-কে বিয়ে করেন। এই সময়েই তাঁর প্রথম উপন্যাস Windy McPherson's Son প্রকাশিত হয়। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত এই বইটি তাঁকে কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত করে।

১৯১৯ সালে প্রকাশিত Winesburg, Ohio-ই তাঁর জীবনের প্রকৃত সাহিত্যিক বিস্ফোরণ। এটি প্রচলিত অর্থে একটি উপন্যাস নয়; একটি ছোট শহরকে কেন্দ্র করে পরস্পর-সম্পর্কিত গল্পের সমষ্টি। কেন্দ্রীয় চরিত্র George Willard, একজন তরুণ সংবাদকর্মী, যার চোখ দিয়ে Winesburg-এর মানুষের গোপন জীবন পাঠকের সামনে আসে। Doctor Reefy, Elizabeth Willard, Wing Biddlebaum, Alice Hindman এবং আরও অনেক চরিত্র একই শহরের আলাদা জানালার মতো।

Winesburg, Ohio-র শক্তিশালী ধারণাগুলোর একটি হলো ‘grotesque’। Anderson-এর কাছে grotesque মানে শুধু ভয়ংকর চেহারা নয়। এমন একজন মানুষ, যে কোনো একটি সত্য, বিশ্বাস বা আকাঙ্ক্ষাকে এত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে যে সেই সত্যই তার জীবনকে বিকৃত করে দেয়। তাঁর চরিত্ররা ভালোবাসতে চায়, কিন্তু পারে না; কথা বলতে চায়, কিন্তু ভাষা খুঁজে পায় না; অন্যের কাছে যেতে চায়, কিন্তু ভয় ও লজ্জায় আটকে যায়।

১৯২১ সালের The Triumph of the Egg এবং Horses and Men তাঁকে শক্তিশালী ছোটগল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর গল্পে বড় ঘটনা অনেক সময় ঘটে না। কিন্তু একটি ছোট ঘটনা, একটি ভুল কথা, একটি অপূর্ণ প্রেম অথবা বহুদিনের চাপা স্মৃতি হঠাৎ একজন মানুষের জীবনকে অন্য আলোয় দেখিয়ে দেয়।

১৯২৫ সালের Dark Laughter ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সাফল্য এবং জীবদ্দশায় তাঁর একমাত্র bestseller। উপন্যাসটিতে New Orleans-এর জীবন, সম্পর্ক, যৌনতা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিয়মের বাইরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বইটিতে James Joyce-এর প্রভাবও লক্ষ করা যায়। তবে এর পর Anderson-এর সাহিত্যিক খ্যাতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং পরবর্তী প্রজন্মের Hemingway ও Fitzgerald সামনে চলে আসেন।

থ্রিলার লেখক হিসেবে Sherwood Anderson-কে শ্রেণিবদ্ধ করা ঠিক হবে না। তাঁর মূল ক্ষেত্র ছিল psychological fiction, realism এবং ছোটগল্প। কিন্তু thriller লেখকের জন্য তাঁর কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দেয়। Anderson দেখিয়েছেন, suspense সবসময় খুন, ধাওয়া বা রহস্যের ওপর নির্ভর করে না। একজন মানুষ কী লুকাচ্ছে, কেন সে কাউকে কিছু বলতে পারছে না, তার অতীত কী, তার ভেতরে কোন আকাঙ্ক্ষা চাপা আছে—এসবও ভয়ংকর suspense তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে Winesburg, Ohio-র গল্পগুলোতে পাঠক ঘটনার চেয়ে চরিত্রের গোপন সত্যের কাছে এগিয়ে যায়। প্রশ্ন হয়: এই মানুষটি আসলে কী চায়? কেন সে এমন আচরণ করছে? তার অতীত কী? এই psychological curiosity অনেকটা thriller-এর suspense-এর মতো কাজ করে। এখানে ‘কী ঘটবে’ অপেক্ষার চেয়ে ‘মানুষটির ভেতরে আসলে কী ঘটছে’ প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Death in the Woods নামের গল্পটি তাঁর অন্ধকার ও রহস্যময় আবহের কাজগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একটি মৃত নারীর স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গল্পটি ধীরে ধীরে এমন এক বিষণ্ন ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মৃত্যু শুধু একটি ঘটনা নয়, বহু মানুষের স্মৃতি ও কল্পনার অংশ হয়ে ওঠে। এটি conventional murder mystery নয়, কিন্তু atmosphere, fragmented memory এবং মৃত্যুকে ঘিরে অস্বস্তি psychological mystery-এর কাছাকাছি অনুভূতি তৈরি করে।

১৯২৪ সালে Tennessee Mitchell-এর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি Elizabeth Prall-কে বিয়ে করেন। তাঁদের সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত টেকেনি এবং ১৯৩২ সালে বিচ্ছেদ হয়। ১৯৩৩ সালে তিনি Eleanor Copenhaver-কে বিয়ে করেন। Eleanor সামাজিক ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর সঙ্গে Anderson দক্ষিণাঞ্চলের factory towns, শ্রমিকদের জীবন এবং Great Depression-এর সামাজিক বাস্তবতা কাছ থেকে দেখতে শুরু করেন।

১৯২৬ সালে তিনি Virginia-র southwestern অঞ্চলে Ripshin নামে একটি বাড়ি ও খামার গড়ে তোলেন। পরে সেই অঞ্চল তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হয়ে ওঠে। তিনি স্থানীয় দুটি সংবাদপত্রও কিনেছিলেন এবং কিছু সময় সংবাদপত্রের কাজ করেন। তাঁর পরবর্তী লেখায় সাধারণ মানুষের জীবন, রাজনীতি ও শ্রমিকদের সমস্যার প্রভাব স্পষ্ট।

১৯৪১ সালে Anderson Eleanor-এর সঙ্গে South America-র উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে শ্রমিকদের জীবন ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যাত্রাপথে তিনি দুর্ঘটনাক্রমে একটি toothpick গিলে ফেলেন। সেটি তাঁর অন্ত্রে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং peritonitis হয়। ১৯৪১ সালের ৮ মার্চ Panama-র Colón শহরে ৬৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে Virginia-র Marion-এর Round Hill Cemetery-তে সমাহিত করা হয়।

শেরউড অ্যান্ডারসনের জীবন তাই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প। তিনি একসময় সফল ব্যবসায়ী হতে চেয়েছিলেন, ব্যবসাও করেছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যবসার অফিস ছেড়ে হয়ে উঠলেন মানুষের মনের গল্পকার। তাঁর সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় তুলনামূলকভাবে দেরিতে, কিন্তু সেই দেরি তাঁর জন্য বাধা হয়নি। বরং জীবনের প্রথম চার দশকের ব্যবসা, পরিবার, ব্যর্থতা, মানসিক সংকট এবং সামাজিক অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখার কাঁচামাল হয়ে ওঠে।

তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার এই শিক্ষা: মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য অনেক সময় বাইরে নয়, ভেতরে। একজন মানুষ হাসছে, অথচ তার ভেতরে গভীর একাকীত্ব থাকতে পারে। একজন সফল ব্যবসায়ী নিজের জীবনকে ঘৃণা করতে পারেন। একটি সাধারণ ছোট শহরের মানুষ এমন একটি গোপন স্বপ্ন বয়ে বেড়াতে পারেন, যা কেউ জানে না। Anderson সেই অদৃশ্য জায়গাটিকেই সাহিত্যের আলোয় এনেছেন। আর এখানেই তাঁর সঙ্গে thriller সাহিত্যের সবচেয়ে গভীর যোগ—রহস্যকে তিনি মানুষের ভেতরে খুঁজেছিলেন।

 

সম্পাদনা-নোট: Windy McPherson's Son ১৯১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস। Winesburg, Ohio ১৯১৯ সালে প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজগুলোর একটি। Anderson প্রচলিত thriller writer ছিলেন না; তাঁর বিশেষ শক্তি ছিল psychological realism, atmosphere এবং মানুষের গোপন মানসিক টানাপোড়েনকে suspense-এর মতো ব্যবহার করা।

Note: Info collected from digitalsc-lib-vt-edu

Comments

    Please login to post comment. Login